ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

টাইলার থেকে তারাগঞ্জ: দূরত্বটা মানসিকতার!

বাংলাদেশে ধর্মের নামে যে অত্যাচার হচ্ছে আর হয়, সেখানে আপনি আমি কিছু বলে লাভ নাই।
রামু, নাসিরনগর, তারাগঞ্জ; না, আমি বলে কিছু লাভ নেই, আপনি বলেও নেই। যারা ফেসবুক স্ট্যাটাসের গুজবে বাড়িঘর পোড়ায়, মানুষ মারে, তারা আপনার আমার ফেসবুক তো পড়ে না। আমি বরং আপনাদের টাইলার, টেক্সাসের গল্প শোনাই।

ডালাস থেকে টাইলার দুই ঘন্টা দূরের একটা শহর। টেক্সাস স্টেটটাই পড়ে আমেরিকার ‘বাইবেল বেল্টে’, তার মানে হচ্ছে খুবই জেনারেল টার্মে যদি ধরি, এখানকার অনেক মানুষই কট্টর ক্রিশ্চান, এবং অনেকেই চায় পুরো দেশটাই ক্রিশ্চান থাকুক, নাহলে পরকালে বিশাল পাপ হয়ে যাবে (মুখ ফুটে বলে না এরা রাষ্ট্রধর্ম চায়, কিন্তু ঐ নামে না ডাকলেও মনের চাওয়াটা সেটাই)। এই স্টেটের বড় বড় শহরে নানা বর্ণের নানা ধর্মের মানুষ, আর যত বেশি ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, সাধারণত মেলামেশার জের ধরে মানুষের মনও উদার হতে শুরু করে। ছোট শহরে একটু আধটু সমস্যা থাকেই, বিভিন্ন সংখ্যালঘু গ্রূপ (সেটা ধর্মে হোক, বা বর্ণে, বা জেন্ডারের ভিত্তিতে) বিভিন্ন রকম সমস্যাতে পড়ে। কিছু এমন অবচেতনে হয়, যে অনেক সময় টের পাওয়াও হয়তো মুশকিল হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠরা যদি “আমারটাই ঠিক, এমনটাই হতে হবে” ভাব নিয়ে চলে, তখন সেখানে বাকিদের প্রাণভরে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকাটা একটু মুশকিল হয়ে যায় বৈকি।

ডালাস বড় শহর, টাইলার ছোট শহর। ছয় বছর আগে আমার একবার বেজায় মন খারাপ ছিলো, ছিলো তো ছিলোই, যাচ্ছিলোই না, আমি ভাবলাম আমার শহর ছেড়ে একটু দূরে কোথাও বেরিয়ে আসি, মন ভালো হবে। কিন্তু তখন পকেটে তেমন পয়সা নাই, – প্লেনের টিকেট, হোটেল খরচ, এতো কই পাই? আমি দেখলাম কাছেপিঠে কি আছে; গুগল বললো টাইলারে একটা গোলাপ বাগান আছে, আর চিড়িয়াখানা আছে, আর গাড়ি নিয়েই দিনে দিনে চলে যাওয়া যাবে। আমি স্ক্রু-ঢিলা মানুষ, আমি ব্যাগ প্যাক করে এক রাতের জন্য একা একা এক ছুটির উইকএন্ডে সেখানে চলে যাই।

এই গল্পটা কোন ভয়াবহ গল্প না; ছোট শহরে বাদামি চামড়ার হিজাবি নারীর কোন দুঃস্বপ্নের কথন না। আমেরিকার অনেক সমস্যা আছে, ভয়াবহ রকমের রেসিজমও হয়, কিন্তু আমার ফেসবুকের কোন লেখা দেখে আমার বাড়িঘর পোড়াতে আসবে, এই ধাঁচের কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম; হলেও, পুলিশকে কল করে দেবো, কোন পুলিশ নিজে রেসিস্ট হলেও দেশীয় আইনের খাতিরে সে আমার পাশেই দাঁড়াবে (পুলিশেরও সমস্যা আছে কিছু, কিন্তু সেসব অন্যদিনের গল্প, আগে এটা শেষ করি)। – তো যাহোক, আমি গেলাম, ঘুরে আসলাম, খয়েরী রঙের মানুষ কম দেখলাম, হিজাব পরা আর কাউকেই দেখলাম না (হয়তো ছিলো, আমি দেখি নাই, ডালাসে যেমন দেখি); বাঘ দেখলাম, জিরাফ দেখলাম, লাল কমলা গোলাপ দেখলাম, – আমার ঘোরাঘুরি শেষ করে বাড়িও ফিরে আসলাম ঠিকঠাক। (হওয়ার মধ্যে যা হলো, মানুষজন কিছুদিন ধরে ক্ষেপালো – এইরকম উদ্ভট ভ্যাকেশন নাকি আর কেউ আগে শোনে নাই)!

#

তারপর টাইলারকে আমি ভুলেও গেলাম। ট্রাম্প ২০১৬তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো, এই বছর এসে হোয়াইট হাউসে বসলো; এবং এসেই শুরুতে ‘মুসলিম ব্যান’ ডেকে ফেললো। যে আমি নাচতে নাচতে দুই ঘন্টা দূরের শহরে গোলাপ বাগানে ছুটি কাটাতে যেতে পারি, সেই আমি নাচতে নাচতে ডালাসের বিমানবন্দরেও চলে গেলাম। অনাহুত এই ব্যানে অনেক নিরীহ মানুষ আটকা পড়েছে, তাই দুইদিন ধরে বিমানবন্দর ঘেরাও করা ছিলো তাদের ছাড়ার লক্ষ্যে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাজ হলো, – আর আমার ব্যক্তিগত ভাবে যা কিছু অর্জন হলো, তা মধ্যে একটি ছিলো আমার ততদিনে-ভুলে-যাওয়া সেই ছোট শহর “টাইলার” থেকে একটি টিভি ইন্টারভিউ।

হলো কি, টাইলার থেকে একটি মেয়ে এসেছিলো দ্বিতীয় দিন ফেসবুকে আমার পোস্ট পড়ে; আমি আবার তার এই দুই ঘন্টা থেকে চলে আসাতে মুগ্ধ হয়ে আরেকটি পোস্ট লিখলাম, সেটি পড়ে চমৎকৃত হলেন টাইলারের আরেক নারী। তাঁর স্বামী টিভি শো হোস্ট, তিনি স্বামীকে সেই পোস্ট দেখালেন, তিনি তখন আমার আর সেই মেয়েটির ইন্টারভিউ নিলেন। ঐ নারী, যিনি চমৎকৃত হয়েছিলেন, আমার লেখার গুণের চাইতে বেশি চমকেছিলেন আমি টাইলার থেকে আসা একটি শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চানের গল্প বলছি বলে। উনিও তেমন, “শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চান নারী”, কিন্তু সেই ছোট শহরে তার দমবন্ধ লাগে। তাঁর মতো করে ভাবা মানুষগুলো কম আছে বলেই তিনি জানেন; এরা সংখ্যালঘুদের তেমন চায় না, মাঝে মাঝে কেউ কেউ সীমা ছাড়ায়, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো অনেক ছোট ছোট ব্যাপারে ফুটে উঠে, যেগুলো অনেক সময় ভালোমানুষ যারা, তারা নিজেরাও টের পায় না।

আমার পোস্টটি তিনি যখন দেখেন, তার দুইদিন আগেই মুসলিম-মালিকানাধীন একটি দোকানের চত্বরে কেউ বা কারা আজেবাজে কথা ভরা পোস্টারে ভরে দিয়ে গেছে সমস্ত দেয়াল, সাথে প্রচ্ছন্ন হুমকি, এরা যেন আর দোকান না খুলে, খুললে খবর আছে! এই খবর পড়ে তাঁর মন যখন ক্লান্ত, তখনই দেখলেন, আরেহ, টাইলারে আরেকটি মেয়ে আছে যেন তাঁরই মতন, এইসব “হেইট ক্রাইমের” বিরুদ্ধে লড়াই করবার মানসিকতা যে রাখে। – এই বছর থেকে এই দুই নারীকেই আমি এখন চিনি, বিমানবন্দরের মেয়েটিকে কাছের বন্ধু বলি মানি, আর অন্যজনের সাথে ফেসবুকের সুবাদে প্রায়ই আলাপ হয়। বিমানবন্দরে আসা মেয়েটি একজন নার্স; সে আমাকে জানিয়েছে তার ইন্ডিয়ান আর ফিলিস্তিনি ডাক্তার বন্ধুরা তার কাছে বলেছে, কিছু রোগী আছে যারা তাদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিতে চায় না, তাদের ধর্মের কারণে। ঐ ডাক্তাররা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, কিন্তু এই আমেরিকান মেয়েটির রক্ত গরম হয়ে গেছে এটি শুনে, পারলে সে’ই রোগীদের গিয়ে সে দুইচার কথা শুনিয়ে দিয়ে আসে!

রংপুর, তারাগঞ্জ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ

আর ঐ টিভি-হোস্টের স্ত্রী? তিনি সেদিন তাঁর মেয়ের হাইস্কুলে গেছেন কোন এক ভলান্টারি কাজে; স্কুল চলার সময়ে শুনলেন সেই স্কুলের প্রিন্সিপাল সবাই যেন বাইবেল পড়ে, সেইরকম কোন এক বাণী দিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের। আমার সেই ফ্রেন্ডটি বাড়ি ফিরে রেগেমেগে স্ট্যাটাস দিলেন, পাবলিক কোন স্কুলের কোন হেডমাস্টারের স্কুলের প্ল্যাটফর্মে এমন করাটা অন্যায়, যেহেতু সব ছাত্রছাত্রীরা ক্রিশ্চান নয়, সেটি কোন ধর্ম ক্লাসেও বলা হয়নি। “ক্রিশ্চানিটি একমাত্র বা সত্য ধর্ম”, এমন বিশ্বাস তাঁর থাকতেই পারে, কিন্তু স্কুল চলাকালীন সময়ে সেটির প্রচারণা কেন? সেটি তো ক্ষমতার অপব্যবহার, আর সেটি তো ভিন্ন-বিশ্বাসের শিক্ষার্থীদের সাথে অবিচার। – তিনি আশপাশের কিছু অভিভাবকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন এই ব্যাপারে, কিন্তু তারা তেমন গা করেনি; – তাই এই ভদ্রমহিলা এখন কি ধরণের একশন নিতে পারেন, সেটি বাকি বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়ে তাঁর এই স্ট্যাটাস, সাথে হতাশার প্রকাশ।

তিনি তাঁর মেয়েকে বিভিন্ন বিশ্বাসের সাথে পরিচিত করান, যেন ছোট শহরে থেকেও মেয়ের ভাবনার জগৎ প্রসারিত হয়। সেদিন দেখলাম মেয়েকে পাঠিয়েছেন সেখানকার মসজিদের একটি অনুষ্ঠানে (“আমাদের জানুন” ধাঁচের অনুষ্ঠান আমেরিকার অনেক সংখ্যালঘু উপসনালয়ে অহরহই হয়), মেয়ে তার বান্ধবীদের সাথে হিজাব পরে একটি ছবি তুলেছে, সেটি তিনি তার ফেসবুকে শেয়ার করে ক্যাপশন দিয়েছেন অনেকটা এরকম, “মেয়ে বড় হয়ে যা হবার হোক, কিন্তু সবসময় যেন এমন উদারমনের বন্ধুবৎসল মানুষ থাকে, তাঁর সেটুকুই প্রত্যাশা”। তাঁর সেই ক্যাপশনটি আমার বেশ লাগলো, আমি সেটিকে সাধুবাদ জানিয়ে একটি কমেন্ট করলাম; সাথে একজন “আমেরিকান মুসলমান” হিসেবে ধন্যবাদ জানালাম, মা মেয়ের এই চেষ্টাটুকুর জন্য, এই দিলখোলা আন্তরিকতার জন্য। আমি ডালাসে বেশ ভালো আছি, কিন্তু টাইলারের কোন সংখ্যালঘুর জন্য (যে ধর্মেরই হোক না কেন), এইটুকু দেখেও তো শান্তি!

#

না, টাইলার টেক্সাসের নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনের সাথে তারাগঞ্জের অন্যায় অবিচারের কোন তুলনা নেই। অপরাধীদের শাস্তি নেই, অপরাধের প্রতিরোধ নেই, তাই এমন বর্বরতাগুলো দিব্যি ডালপালা গজিয়ে শিকড় গেড়ে বসে থাকে বাংলাদেশে। ভাংচুর করা সেই অপরাধী আপনি বা আমি নই, আমাদের ফেসবুকেরও কেউ তারা নেই, ধরেই নিচ্ছি আমরা সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠি, মানবিকতার শিক্ষাটাও আমাদের আছে।

তবু দেখুন, মুসলমানের দোকান যেমন ভাঙবে না টাইলারের বেশিরভাগ নাগরিক, কিন্তু আবার মুসলমান ডাক্তারের কাছে অনেকেই যাবে না, আর, সেটিকে ভুল কিছু ভাববে না। কিংবা, “বাইবেল একমাত্র শান্তির আশ্রয়” বলে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে নিজের ধর্মবিশ্বাসটি জোর করে চাপিয়ে দেবে, বা তেমনটি হতে দেখলে সেটিতে কিছুতেই আপত্তিকর কিছু খুঁজে পাবে না, তেমনটাই কি অনেকেই সেখানে নেই? আমার নার্স বান্ধবী, আমার গৃহবধূ বান্ধবী, এরা কি সেই শহরে সংখ্যালঘু নয় তাঁদের ভাবনায়, – আর সেটি কি কিছুটা দুঃখজনক নয়? মাইনোরিটিরদের জন্য কি এই মানুষগুলোই আশ্রয়স্থল নয়?

উনারা আছেন বলেই টাইলারে একদিন আমূল পরিবর্তন আসবে। ডালাসের মতো মুক্তমন হবে, যে যার বিশ্বাসে সবাই মিলেই আনন্দে থাকবে। কোন মাইনোরিটির এই মানসিক চাপগুলো “স্বাভাবিক” ভাবে মেনে নিয়ে চলতে হবে না; আর শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা যত বেশি স্বাভাবিক হয়ে আসবে, হেইট ক্রাইমের সংখ্যাও একদিন সারা আমেরিকা জুড়েই কমে শূন্যতে এসে থামবে।

আপনি আমি ফেসবুক খবর দেখে কারো বাড়ি ঘর ভাঙবো না, কিন্তু আপনি আমি আমাদের মনের বাড়ি ঘর আরেকটু বেশি ঝাড়মোছ করতেই পারি। দেশের এই সময় বড় শহরে থাকাও অনেক হিন্দু পরিবারে নতুন করে ভয় জাগে: “কাল আমরা যদি বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছি বলে দাবী করা হয়, তখন আমাদের কি হবে?” আপনি আমি কি কথা ও কাজে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াই, সমব্যথী হই, সাহস যোগাই? আমাদের ধর্মবিশ্বাসে আমাদের সুখ ও শক্তি, কিন্তু সেটি ভাগ করার বেলায় কি স্থানকালপাত্র মাথায় রাখি, শ্রদ্ধাশীল মনোভাব বজায় রেখে চলি? আমরা কি খেয়াল রাখি সেইসব মানুষদের, যাদের কাছে এগুলোই হয়তো স্বাভাবিক হয়ে গেছে, নতুন করে আর গায়ে লাগে না; – আর এই “স্বাভাবিক”টাই যে অস্বাভাবিক, সেটি কি মনে রাখি আমরা?

আপনি আমি বাড়িঘর ভাঙবো না, আপনি আমি আইনের লোক নই, পুলিশ বা সরকার নই, যে রাতারাতি সুপারহিরো-স্ট্যাইলে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবো। কিন্তু আপনি আমি সেই টাইলার নারীদের মতো হতেই পারি; তাঁদের প্রতি আমি যে কৃতজ্ঞতা বোধ করি, আপনার প্রতি হতে পারে অন্য কারো এমন বোধ, এইটুকু চেষ্টায় রাতারাতি সমাজ পাল্টায় না, কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বীজ অবশ্যই রোপণ করে দিয়ে যায়- যায় না?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button