অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি গার্ড তিনি, ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেয়ে সেখানেই হলেন ছাত্র!

এমন গল্প হরহামেশাই আপনি হয়ত শুনবেন না। জীবন কখনো কখনো যে গল্পের চেয়েও নাটকীয়। সেই ফরেস্ট গাম্প সিনেমার ডায়ালগের মতো করে বলতে হয়, জীবন মানে এক চকলেট বক্স, আপনি জানেন না, জীবন আপনার জন্যে কোন রকমের চকলেট উপহার হিসেবে রেখেছে।

রামজাল মীনা নাম লোকটির। তার জীবনে ঘুরে দাঁড়াবার গল্প অনেকের জন্যেই হতে পারে অনুপ্রেরণার। তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করতে এসেছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তিনি ছাত্র। সবার মতো ভর্তি পরীক্ষার লড়াইয়ে জিতে মেধার প্রমাণ দিয়েই তিনি অর্জন করে নিয়েছেন জায়গাটা। জীবন নামক চকলেট বক্স, মানুষকে কত অদ্ভুত স্বাদ যে এনে দিতে পারে শুধু একটু চেষ্টা করে গেলে তারই প্রমাণ এই রামজাল মীনা নামক মানুষটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ২০১৪ সালে এসেছিলেন রামজাল মীনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গার্ড হিসেবে চাকুরিটা তার জীবিকার যোগানদাতা হলো। তিনি নিজেও তখন ভাবেননি, কখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। অবচেতনে হয়ত স্বপ্ন পুষেছিলেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবেন। কিন্তু, সেই স্বপ্ন ফুলের মতো ফুটবে সেরকম অবস্থা ছিলো না তখন৷ একজন সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে সারাক্ষণ দিনমান কাজ করতে শুরু করলেন তাই।

রামজাল মীনা ও তার পরিবার।

রামজালের পিতা খেলতেন বাজি। খাস বাংলায় জুয়াও বলা যায়। এই করে কি সংসার চালানো যায়? এমন সংসারের সাবালক পুত্র হিসেবে তাই রামজালকে জীবিকার সন্ধ্যান করতে হলো অল্প বয়সেই। তার আগে রাজস্থানের এই সন্তান নিজ গ্রামে সরকারি স্কুলে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। কলেজে যাওয়া হয়নি। নিকটস্থ কলেজটিও প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। এতো দূরে গিয়ে পড়তে গেলে, সেটা পোষাবে না। অন্তত পিতার কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক সংগতি বিবেচনায় তো নয়ই। তাই কাজ খুঁজতে হলো রামজালকে।

এর মধ্যে কত সময় এলো গেলো। রামজাল বিয়েও করলেন। তিন কন্যার পিতাও হয়ে গেলেন। এর মধ্যে বলার মতো একটা কাজই করলেন। রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টেন্স লার্নিং প্রোগ্রাম থেকে পলিটিক্যাল সাইন্স, ইতিহাস, হিন্দি বিষয়ে পড়লেন। কিন্তু, সরাসরি আবার একজন ছাত্র হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদচারণা করে পড়ালেখা করবার যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সেটা হচ্ছিলো না। এই স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো হয়ত মনে মনে।

যখন ২০১৪ সালে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করতে শুরু করলেন, ক্যাম্পাসময় তারুণ্য এবং শিক্ষার একটা পরিবেশ দেখে হয়ত পুরানো স্বপ্ন আবারো ফিরে আসলো তার মধ্যে। এই স্বপ্নই তাকে সারাক্ষম হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষেও পড়তে আগ্রহী করে তুলতো। তিনি ডিউটি শেষ করে ভর্তি পরীক্ষার জন্যে পড়তে বসতেন। কখনো ডিউটির ফাঁকে একটু ফাঁকা সময়ে পেলেও কাজে লাগাতেন সেটাকে পড়ার কাজে।

রামজাল মীনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়

তিনি ফোনে এপস ব্যবহার করে রোজকার পত্রিকা পড়ে সাম্প্রতিক তথ্য সম্পর্কে জানতেন। লজ্জা করতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে জানতে চাইতেন কিভাবে কি করতে হবে। তাদের কাছ থেকেও সাহায্য নিতেন। পিডিএফ নোট সংগ্রহ করে ফোনেই সেসব পড়তেন।

অতঃপর ভর্তি পরীক্ষা হলো। তার স্বপ্ন ছিলো কোনো একটি ফরেইন ল্যাঙ্গুয়েজের উপর তিনি পড়াশুনা করবেন। তিনি শুনেছেন বিদেশী ভাষা নিয়ে যারা পড়ে, যাদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ ঘটে। তিনি বিশ্বকে ঘুরে দেখতে চান। একই সাথে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাতেও নিজের ভাগ্য পরখ করে দেখতে চান সুযোগ থাকলে। স্বপ্ন পূরণ হয়েছে রামজালের। এখন তার বয়স হয়েছে ৩৪। তাতে কি? এটাই তার জীবনের টাইমজোন। সময় এসেছে এখন তার। তিনি প্রমাণ করেছেন নিজেকে। তাই তো, জুলাই মাসে ভর্তি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে রামজাল এখন জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ ডিসিপ্লিনে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

এখন তাকে ভাবাচ্ছে, ডিউটি করে পড়াশুনার সমন্বয় কিভাবে করবেন এই বিষয়টি। তাই তিনি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন, নাইট শিফটে তাকে যেন ডিউটি দেয়া হয়। তিনি ক্লাস করতে চান। পড়ালেখা করতে চান। চাকরিটাও করতে চান। কারণ, তার পরিবার আছে। ১৫০০০ রুপি বেতনের এই চাকরিটার উপর যে নির্ভরশীল তার পরিবার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সিকিউরিটি অফিসার বলেছেন, তারা রামজালের জন্য গর্বিত। যদিও রেগুলার ক্লাস করে নাইট শিফটে কাজ করা কঠিন ব্যাপার। তবুও, তারা তাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সুবিধা রামজালকে দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা নিবেন। রামজাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। এখানে কেউ পদানুক্রম কিংবা সামাজিক অবস্থা দেখে মানুষকে বিচার করে না। রামজাল সিকিউরিটি গার্ড হয়েছে তো কি, তাকে সাহায্য পরামর্শ দিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র কারো গায়ে ফোস্কা পড়েনি। তারা বেশ সানন্দেই রামজালকে উৎসাহ দিয়ে গেছে। এখন তারা রামজালের কৃতিত্বে তাকে অভিনন্দনও জানাচ্ছে মন খুলে। কি দারুণ সাম্য…

রামজাল মীনা

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকে এখানে যদি রিলেট করি, আমাদের এখানে এখন বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারের বেশি দুইবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে ৩৪ বছর বয়সী কেউ স্বাভাবিকভাবে পড়তে চাইবে না, যদি না তার অনেক টাকা থাকে এবং সান্ধ্যকালীন কমার্শিয়াল ডিগ্রিগুলো নেয়ার সামর্থ্য থাকে। এখানে শ্রদ্ধাটাও আজকাল বেশ কমে যাচ্ছে। ভর্তি পরীক্ষার এক ঘন্টায় কেউ কেউ পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে, অনেকেই পারে না। যারা পারে না, তারা কি সবাই অমেধাবী? অথচ, আজকাল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বর্ণবাদের একটা বিস্তার আমাদের এখানটায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

জ্ঞানের জগত অবারিত, বিশাল এক সমুদ্র। আমরা তার ছিটেফোঁটাই আহরণ করতে পারি। তাতেই আমাদের গর্বে অহংকারে পা মাটিতে পড়তে চায় না। প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে। প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে মানুষ করে। স্বপ্ন দেখায়। রামজালের মতো মানুষদের স্বাভাবিক সময়ে আমরা যখন দেখি, তখন হয়ত ফিরেও তাকাবো না। মনে করতেই পারি, সে এক সিকিউরিটি গার্ড। আমার চেয়ে নিম্ন অবস্থানের। এখানেই শিক্ষার গুরুত্ব। শিক্ষিত হয়ে আপনি বড় চাকরি করলেন, অনেক ক্ষমতা পেলেন, সম্মান পেলেন কিন্তু সম্মান কিভাবে সকল শ্রেণীর মানুষকে করতে হয় সেটাই জানা হলো না, তাহলে শিক্ষা আপনাকে কি দিলো? কেবল সামাজিক অবস্থান?

রামজাল মীনা সিকিউরিটি গার্ডের পোশাক পড়ে আবারো ডিউটি করবে। কিন্তু এখন মানুষ জানবে, সে শুধুই নিরাপত্তা প্রহরী না। তার ভিতরে একটা স্বপ্ন আছে। সে সেই স্বপ্নকেও পাহারা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। অবশ্য যারা জানবে না, তারা সাদা চোখে তাকে স্রেফ সিকিউরিটি গার্ডের পোশাকটা দিয়ে বিচার করবে। তারা যে এখনো শিক্ষিত হয়নি…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button