খেলা ও ধুলা

দুনিয়ার সেরা ব্যাটসম্যানটাকে তিনি নিজের হাতে গড়েছিলেন!

থাপ্পড়টা খেয়ে হতভম্ব হয়ে গেল বছর বারো’র ছেলেটা৷ স্কুল টিমের খেলা দেখতে আসা কিশোরের অশ্রুসজল চোখের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন রমাকান্ত- “অন্যের জন্যে তালি বাজানোটা তোমার কাজ নয়। এমনভাবে প্র‍্যাকটিস করো, যেন তোমার খেলা দেখে হাজারটা মানুষ তালি দেয়…”

রমাকান্ত সংখ্যায় একটু ভুল করেছিলেন। তিনি জানতেন না, হাজার নয়, শতকোটি মানুষ একদিন এই ছেলের ব্যাটিং দেখে হাততালি দেবে, মাঠভর্তি দর্শক তার একেকটা শট দেখে চিৎকার করে গ্যালারি ফাটাবে, সোয়াশো কোটি মানুষের একটা দেশের আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে ছেলেটা, স্বীকৃতি পাবে ক্রিকেট ঈশ্বর হিসেবে, এসব কিছুই জানতেন না রমাকান্ত…

দুজনের সম্পর্কটা ছিল গুরু শিষ্যের। তবে সেটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখলে। কাছে এলেই বোঝা যেতো, রমাকান্তের কাছে শচীন ছিলেন নিজের ছেলের মতোই৷ শচীনও বাবার মতোই শ্রদ্ধা করতেন মানুষটাকে। এগারো বছর বয়সে রমাকান্তের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন শচীন। বোম্বের হাজারটা কিশোর তখন গাভাস্কার হতে চাইতো, চাইতেন শচীনও। বাকিরা হারিয়ে গেছেন সময়ের পালাবদলে, শচীন রয়ে গেছেন, নিজেকে তুলেছেন সর্বোচ্চ উচ্চতায়, যেখানে গাভাস্কারও পৌঁছাতে পারেননি কখনও। আর এতসবের পেছনে রমাকান্ত আচরেকারের অবদানটা সবচেয়ে বেশি, শচীনের বিশ্বাস ছিল এমনটাই!

এই জুটির গল্পটা জানে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, জানে বোম্বের শিবাজী পার্ক, জানে জিমখানা মাঠ। বাকী শিষ্যদের চেয়ে গুরুর কাছে খানিকটা আলাদা কদর পেতেন শচীন, সেটা তিনি স্বীকারও করেন অকপটে৷ কারণ তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বারুদটুকু চোখে পড়েছিল রমাকান্তের।

কিশোর শচীনকে নিয়ে বোম্বের ক্লাবগুলোতে ঢুঁ মারতেন রমাকান্ত, নিজের পরিচয়ের সুবাদে তার চেনাজানা ছিল সেসব জায়গায়। দলের সেরা বোলারটাকে লেলিয়ে দিতেন শচীনের পেছনে। সমবয়েসী অন্য সতীর্থরা যখন নিজেদের মধ্যে খেলছে, সেই সময়ে শচীন মোকাবেলা করেছেন বোম্বের সেরা বোলারদের ভয়াল ডেলিভারিগুলো। বাকীদের চেয়ে এগিয়ে থাকার শুরুটা তো তখন থেকেই হয়েছিল, গুরু রমাকান্তের হাত ধরে…

এমনিতেই সাইজে খাটো, দূর থেকে দেখলে লিলিপুটের মতো লাগে, সেই ছেলেটাকেই খাটিয়ে মারতেন রমাকান্ত। মাঠের চারপাশে দশটা রাউন্ড, সেটা শেষ হলেই একটানা একশোটা পুশ-আপ, ঘাম যখন গড়িয়ে পড়ছে পুরো শরীর থেকে, তখনও মায়াদয়া হয়নি রমাকান্তের। নিজেই শিষ্যের পায়ে প্যাড বেঁধে নামিয়ে দিয়েছেন নেটে, একটার পর একটা বল ছুটে আসছে একটানা, শচীনও ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন একমনে। বড় ইনিংসগুলো খেলার প্রত্যয় আর শারিরীক সামর্থ্য তো তখন থেকেই তার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন রমাকান্ত!

নেট প্র‍্যাকটিসে ব্যাটসম্যান হিসেবে বোলারদের কাছে শচীন ছিলেন ভীষণ বিরক্তিকর। একটানা, একমনে খেলে চলেছেন তো চলেছেনই, আউট হবার নামগন্ধও নেই! বোলারেরাও বিরক্ত হয়ে পড়তো একটা সময়ে, নেটে শচীনের জন্যে বল করতে হবে শুনলেই এটাসেটা অজুহাত দিয়ে পালাতো সবাই।

অবস্থা বেগতিক দেখে রমাকান্ত এক বুদ্ধি বের করেছিলেন। নেট প্র‍্যাকটিসে স্ট্যাম্পের ওপরে একটা এক পয়সার কয়েন রাখা থাকতো। শচীনকে যে বোল্ড করতে পারবে, কয়েনটা সেদিন সেই বোলার পাবে৷ আর আউট না হলে পাবেন শচীন। হিতে বিপরীত হলো তাতে। এতদিন তো শুধু ব্যাটিঙের মজায় উইকেটে টিকে থাকতে চাইতেন শচীন, এবার যোগ হলো পয়সার লোভ, শচীনকে আর কি কেউ আউট করতে পারে!

সাতাশি বছর বয়সে এ বছরের শুরুতেই চলে গেলেন রমাকান্ত আচরেকার, যিনি নিজ হাতে, ভীষণ যত্ন নিয়ে তৈরি করেছিলেন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা (অবশ্যই ডন ব্র‍্যাডম্যানের পরে) ব্যাটসম্যানকে। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বিদায়ী ম্যাচ খেলতে নেমেও যার কথা ভোলেননি তার শিষ্য, গ্যালারীর হাজারো দর্শকের ‘শচীন শচীন’ কোরাসের মাঝেও শচীন যে মানুষটার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেছিলেন।

কে জানে, একজন রমাকান্ত আচরেকারকে না পেলে হয়তো শচীনের শচীন হয়ে ওঠাটা হতো না কখনও… শচীন যদি ক্রিকেটের অর্জুন হয়ে থাকেন, তার দ্রোনাচার্য্য তো রমাকান্তই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button