ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

র‍্যাগিংয়ের নামে কী নির্মম মানসিক অত্যাচার, ছিঃ!

ফেসবুকের নিউজফিডে একটা পোষ্টে চোখ আটকে গেল। কয়েকটি ভিডিও সংযুক্ত এই পোষ্ট পড়ে যখন ভিডিওগুলো দেখলাম, রাগে শরীর কাঁপতে শুরু করল। এই ২০১৯ সালে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা এখনো ঘটে! ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন সিনিয়র দুইজন জুনিয়রকে রুমের মধ্যে ‘র‍্যাগ’ দিচ্ছে। তারা যা বলছে, জুনিয়রগুলো বিনাপ্রতিবাদে সেটা করে যাচ্ছে।

শাহরিয়ার রুদ্র নামক একজন ফেসবুকে এই ভিডিওগুলো প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেন যে, “অতীতে আমরা সামনা সামনি, মুভিতে,অথবা নাটকে অনেক রকমের “র‍্যাগিং” দেখেছি।সিনিয়র দের দেখলে সালাম দেওয়া,অতিরিক্ত সম্মান দেখানো,অনেক সময় কাপড় ধুইয়ে দেওয়া আথবা অনেক সময় অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দাওয়া। কিন্তু আমি এই ভিডিওতে যা দেখলাম তা এখনো আমার বোধগম্য হচ্ছে না, ‘এটা কি ছিলো’!”

শাহরিয়ার রুদ্রর পোষ্ট থেকে জানা যায়, এই ঘটনাগুলো ঘটেছে গোপালগঞ্জে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুইজন ছাত্রের একজনকে তথাকথিত সিনিয়রা আদেশ দেয়, তাদের কথামতো মাথা উপরে নিচে, ডানে বামে ঘুরাতে। যখন ডানে বামে ঘুরাবে তখন যেন মাথা কাঁধ স্পর্শ করে। হাতে সিগারেট নিয়ে আদেশ দিচ্ছিল ওরা। আর দ্বিতীয় ছেলেটাকে প্রশ্ন করা হয়, তুই ক্যাম্পাসে *গি **বার আইসোস? নেতাগিরি করতে আইসোস? ছেলেটা জবাব দেয়, না ভাই পড়ালেখা করতে আসছি৷ সেই কুলাঙ্গার বিকৃতমস্তিষ্কের সিনিয়রগুলো উত্তর দেয়, এখানে কেউ পড়ালেখা করে না। এই ভার্সিটিতে *গি ** সবাই৷

বঙ্গবন্ধুর নামে যে বিশ্ববিদ্যালয়, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি কেউ পড়ালেখা করতে আসেনা, পতিতাদের সাথে সম্পর্ক করতে আসে। এরা কিসের সিনিয়র? কোন যোগ্যতায় এরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে? আমাদের এলাকার সিটি পল্লি বস্তি কিংবা কমলাপুর রেইলওয়ের পাশের বস্তিগুলাতে দশ বারো বছর বয়সী পোলাপান যেসব ভাষায় কথা বলে, যেরকম আচরণ করে ‘শিক্ষা’র অভাবে, এই কুলাঙ্গার সিনিয়রগুলো সেই বস্তিত ছেলেদের চাইতেও অধম। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ডুবানোর জন্য এমন কিছু কুলাঙ্গারই যথেষ্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটার ভার যাদের বুঝার সামর্থ্য হয় নাই, সর্বোপরি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে মর্যাদা দেয়ার বদলে জুনিয়রদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে হেয় মন্তব্য যারা করে এরা ছাত্র না। এরা ছাত্ররুপী অমানুষ।

দ্বিতীয় ছেলেটাকে তারা আদেশ দেয় নিজের গালে যেন নিজে জোরে থাপ্পড় মারতে থাকে। ছেলেটা যতই নিজেকে মারে, কিছুতেই এই কুলাঙ্গার সিনিয়রগুলো সন্তুষ্ট হয় না। তারপর আরেকটা ভিডিওতে দেখা যায়, ছেলেটাকে প্রশ্ন করতে করতে উত্তেজিত হয়ে মারতে উদ্ধত হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সবগুলো সিনিয়র মিলে। সবচেয়ে অশ্লীল কাজ তারা যা করে, সেটি দেখা যায় চতুর্থ ভিডিওতে। যা একদম অকথ্য, অবর্ণনীয়, অশ্লীল যে লিখে বুঝানো সম্ভব না। একপর্যায়ে সেই দ্বিতীয় ছেলেটা মানসিকভাবে এতটাই শকড হয় যে, সে আর সইতে পারছিল না হয়ত। মাথা ঘুরে পড়ে যায়।

র‍্যাগিং, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞানওপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

‘র‍্যাগিং’ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়। এর আগে গণমাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাগিং নিয়ে অনেকবার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, র‍্যাগিংকে অনেকে সমর্থন করে। এতে নাকি সিনিয়র জুনিয়র সম্পর্ক ভাল হয়। এই যুক্তিকে ঢাল বানিয়ে এই প্রথাটাকে অনেকে সমর্থন দেয়। কিন্তু, র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়ে যারা মানসিক সমস্যায় ভুগে, ডিপ্রেশনে চলে যায় তাদের ব্যাপারে তাহলে আপনি কি বলবেন? র‍্যাগিং অনেকের কাছে সামান্য মজা হয়ত, কিন্তু কিছু কুলাঙ্গার সিনিয়র এটাকে সামান্য মজার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। তারা নিজেদের বোধহয় ওই কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ভাবে। একেকজন হিটলারের মতো কদর্য চেহারা ধারণ করে। আদেশ দেয়ার সুখে, আদেশ দিতে দিতে নির্যাতন শুরু করে। মানুষকে পুতুল বানিয়ে যা খুশি তা করাকেই র‍্যাগিং বলে?

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর মেরুদণ্ড এমনিতে অবশ্য দুর্বল। তাই তারা এই ধরণের ব্যাপারগুলো শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে পারে না। তারা জানে কি হচ্ছে, না হচ্ছে তবুও তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলে মুখস্থ উত্তর রেডি থাকে, ‘আমাদের কাছে অভিযোগ আসেনি।’ যে ছেলেটাকে পুতুল বানিয়ে মজার বস্তু বানানো হয়, যে ভয়ে কুকড়ে যায় সে এসে অভিযোগ জানাবে এতটা আশা করা দুরহ। প্রশাসন অভিযোগ আমলে না নিলে, ছেলেটা প্রমাণ করতে না পারলে সেই ছেলেটার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনই বরবাদ হয়ে যাবে না তার গ্যারান্টি কি? সিনিয়ররা তখন তাকে আরো বেশি মানসিক নির্যাতন করবে।

এইভাবে চলতে পারে না৷ এই কুলাঙ্গারদের বিচার হওয়া উচিত, ছাত্রত্ব বাতিল করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‍্যাগিংয়ের নামে এমন পাশবিকতা বন্ধ করা উচিত। প্রশাসনের কাজ ছাত্রদের নিরাপত্তা দেওয়া, ছাত্রদের পাশে থাকা। তারা যেন সেই কাজটাই ঠিকমতো করেন, তারা পুতুল না হয়ে নিয়মে চললে, ছাত্রদেরও কেউ পুতুল বানাতে পারে না। তাদের দায়ও কম নেই। আর আপাতত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের উপর দাগ বসিয়ে জুনিয়রদের নির্যাতনকারী এই একদল কুলাঙ্গারদের যথোপযুক্ত বিচার চাই। ভিডিও দেখে তাদের শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button