সিনেমা হলের গলি

ফ্রম নোবডি টু নেটফ্লিক্স কুইন- গল্পটা রাধিকা আপ্তের

২০১৫ সাল, রাধিকা আপ্তে তখনও বলিউডের পিচ্ছিল জমিনে পায়ের নীচে শক্ত মাটি খুঁজে ফিরছেন। অহল্যা নামের একটা বাংলা শর্টফিল্মে কাজ করে খানিকটা আলোচনায় এলেন, সেই শর্টফিল্মের পরিচালক ছিলেন সুজয় ঘোষ। ভারতের কয়েকটা সংবাদমাধ্যম তখন তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল, একটা শিরোনাম ছিল এরকম- ‘ছয়টি আলাদা ভাষার সিনেমায় কাজ করে ফেলা রাধিকাই কি হতে যাচ্ছেন বলিউডের নেক্সট বিগ থিং?’

উত্তরটা এখন সবাই জানেন। না, বলিউডি সুপারস্টার বলতে যা বোঝায়, রাধিকা আপ্তে সেটা পুরোপুরি হয়ে উঠতে পারেননি এখনও। তবে তিনি যেটা করেছেন, যে উচ্চতায় তিনি নিয়ে গেছেন নিজেকে, কিংবা অদূর ভবিষ্যতে আরও যেখানে যেখানে তাঁকে দেখা যাবে, সেই জায়গাটা যে কোন অভিনেত্রীর জন্যেই পরম আকাঙ্খার। সম্পূর্ণ ভারতীয় গল্পে, হিন্দি ভাষায় নেটফ্লিক্স পা রেখেছে ভারতে, নেটফ্লিক্স অরিজিনালের ব্যানারে নির্মিত হচ্ছে একটার পর একটা সিরিজ, ইতিমধ্যেই ‘স্যাক্রেড গেমস’ আর ‘ঘোউল’ মুক্তি পেয়েছে, দারুণ প্রশংসিতও হয়েছে। আর এই দু’টো ওয়েব সিরিজের মধ্যে কমন ফ্যাক্টর ছিল একটাই, সেটা রাধিকা আপ্তে।

স্যাক্রেড গেমসের প্রথম সিজনে মূলত নওয়াজউদ্দীন আর সাইফ আলী খানই ছিলেন প্রধান চরিত্র, তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন রাধিকা। তবে হরর থ্রিলার ‘ঘোউলে’ তিনিই প্রধান আকর্ষণ। নেটফ্লিক্সের প্রোজেক্টগুলোতে অভিনয়ের সুযোগটা তাঁকে অন্যরকম একটা উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তথাকথিত নায়িকাসুলভ গ্ল্যামার নেই তার মধ্যে, মিডিয়া অ্যাট্রাকশনের কেন্দ্রবিন্দুতেও থাকেন না তিনি, মেইনস্ট্রিম বাণিজ্যিক সিনেমায় তার উপস্থিতিও খুব কম, যেটা আছে, সেটা হচ্ছে অভিনয়ের দুর্দান্ত প্রতিভা আর যেকোন চরিত্রের মধ্যে পুরোপুরি মিশে যাবার দারুণ একটা ক্ষমতা। আর সেটাই তার সাফল্যের মূলমন্ত্র।

অথচ অভিনেত্রী হবার কথাই ছিল না রাধিকা আপ্তের! বাবা ছিলেন পুনের সবচেয়ে বিখ্যাত নিউরোসার্জন। মেয়েকেও ডাক্তার বানাবেন, এরকম ইচ্ছে ছিল ড. চারুদত্ত আপ্তের। তবে মেয়ের ওপরে কখনও জোর খাটানোর চেষ্টা করেননি তিনি, রাধিকার যেটা করতে ইচ্ছে করবে, সে সেটাই করবে- এরকম স্বাধীনতা দেয়াই ছিল। স্কুলপড়ুয়া ছোট্ট রাধিকা তখন শাহরুখ খানের প্রেমে মশগুল, ভিসিআরে এক ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ দেখেন একশোবার, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ দেখে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেন। অভিনয়ের প্রতি ভালোলাগার বীজটা তখন থেকেই বোনা হয়ে গিয়েছিল মনের ভেতরে।

নাচের প্রতি আগ্রহ ছিল, মায়ের উৎসাহে নাচের ক্লাসেও ভর্তি হয়েছিলেন। নিজের শহর পুনেতে আট বছর ধরে কত্থক নাচের দীক্ষা নিয়েছিলেন, এরপর জড়িত হয়ে পড়লেন স্থানীয় থিয়েটার গ্রুপের সঙ্গেও। পরিবার থেকে শুরুতে বারণ করা হলেও, মেয়ের ভালোবাসার কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন বাবা মা। অন্যান্য কাজিনেরা যখন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ছেন, কেউ কেউ পড়াশোনা শেষ করে ভালো জায়গায় চাকুরীতে ঢুকে যাচ্ছেন, রাধিকা আপ্তে তখন থিয়েটারের স্টেজে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলছেন!

রাধিকা তখন কলেজের ছাত্রী, তার কাছে প্রস্তাব এলো সিনেমায় অভিনয় করার, খুবই ছোট্ট একটা একটা রোল যদিও। ‘দেখিই না কি হয়’ ভেবে রাজী হয়ে গেলেন রাধিকাও। ‘বাহ! লাইফ তো অ্যায়সি’ নামের সিনেমাটায় শহীদ কাপুরের বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি, মাত্র কয়েক মিনিটের স্ক্রীনটাইম পেয়েছিলেন সেখানে, যদিও সেটা নিয়ে রাধিকার আপত্তি ছিল না কখনও। সিরিয়াস টাইপের অভিনেত্রী হবার বাসনা তখনও তার ছিল না, আর অভিনয় করলেও সেটা মঞ্চেই করবেন, যেখানে অভিনয়ের স্বাধীনতাটা পাওয়া যাবে- সেরকম ভাবনাই ছিল তার মধ্যে।

রাধিকা আপ্তে, নেটফ্লিক্স, স্যাক্রেড গেমস, ঘোউল, অন্তহীন

এরপরে সিনেমার সাথে দীর্ঘ একটা বিরতি। হুট করে একদিন বাঙালী অভিনেতা রাহুল বোস তাঁকে প্রস্তাব দিলেন সিনেমায় অভিনয় করার। বোম্বে অ্যাটাক নামের একটা মঞ্চ নাটকে রাধিকার অভিনয় দেখে খুব মনে ধরেছিল তার, পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর কাছে রাধিকার নামটা সুপারিশ করেছিলেন তিনিই। রাধিকাও সহশিল্পীদের নাম শুনেই এক পায়ে রাজী হয়ে গিয়েছিলেন। অপর্ণা সেন বা শর্মিলা ঠাকুরের মতো কিংবদন্তীতুল্য অভিনয়শিল্পীদের সাথে স্ক্রীন শেয়ার করার সুযোগটা তো রোজ রোজ পাওয়া যায় না! অন্তহীনে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল রাধিকার অভিনয়, ২০০৯ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমার পুরস্কার পেয়েছিল সিনেমাটা।

কয়েকটা সিনেমা করে ফেলার পরে যে কোন অভিনেতা/অভিনেত্রীই ক্যারিয়ার গোছানোর দিকে মন দেন, এই দুনিয়ায় প্রতিযোগীতাটা যে বরাবরই ভীষণ তীব্র। শূন্যস্থান কখনোই শূন্য থাকে না এখানে। আর সেখানে চারটে সিনেমায় অভিনয় করে লণ্ডনে উড়াল দিয়েছিলেন রাধিকা, আধুনিক নৃত্যের ওপরে এক বছরের একটা কোর্স করার জন্যে। অর্থ-নাম-খ্যাতি-যশ ব্যাপারগুলো কখনোই খুব বড় কোন প্রভাবক হয়ে উঠতে পারেনি রাধিকার সামনে, পুনের অতি সাধারণ একটা মেয়ে হয়েই তিনি থাকতে চেয়েছেন সবসময়। অভিনয় করতে চেয়েছেন তিনি, তবে সেটা স্বাধীনভাবে, গৎবাঁধা কাজের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু করতে চেয়েছেন সবসময়। এজন্যেই তার ক্যারিয়ারে বাণিজ্যিক কাজের চেয়ে এক্সপেরিমেন্টাল প্রোজেক্টের সংখ্যা অনেক বেশি।

বলিউডে রাধিকার কোন গডফাদার তৈরি হয়নি কখনও, কোন নির্দিষ্ট গ্রুপেও নাম লেখাননি। ওই যে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে চেয়েছেন, নিজেকে কোন গণ্ডিতে আবদ্ধ করার ইচ্ছে হয়নি তার। এজন্যেই শর্টফিল্মের অফার পেলেও গল্পটা শুনেছেন মন দিয়ে, ভালো লাগলে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ বলে দিয়েছেন। অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে যেমন কাজ করছেন, তেমনই করেছেন একতা কাপুরের সিনেমাও। নওয়াজের বিপরীতে ‘মাঝি দ্য মাউন্টেইন ম্যান’ সিনেমায় যেমন তাকে দেখা গেছে, তেমনই রজনীকান্তের বিপরীতে অভিনয় করেছেন ‘কাবালি’র মতো সিনেমাতেও! হিন্দি আর ইংরেজীর পাশাপাশি -বাংলা-মারাঠি-তামি-তেলুগু-মালয়লাম, সব ভাষাতেই অনর্গল কথা বলতে পারেন, কাজ করেছেন ছয়টি আলাদা ভাষার সিনেমাতে।

রাধিকা আপ্তে, নেটফ্লিক্স, স্যাক্রেড গেমস, ঘোউল, অন্তহীন

এরমধ্যেও মঞ্চকে ভুলে যাননি, সেটাই তো তার প্রথম ভালোবাসা। ইংল্যান্ডে পড়তে গিয়ে সেখানেও থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, অভিনয় করেছেন ইংরেজী ভাষায় নির্মিত কয়েকটি মঞ্চ নাটকেও। টিকে থাকার সংগ্রাম তিনি দীর্ঘ সময় ধরে করেছেন, এখনও করছেন। অনেকগুলো সিনেমা করে ফেলার পরেও তিনি ‘বলিউডি’ হতে পারেননি, প্রতিভা থাকার পরেও ‘গ্ল্যামারাস’ বা ‘তথাকথিত স্টার’ না হবার অপরাধে বছরের পর বছর ধরে ব্রাত্য হয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। তবে পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলটা পাচ্ছেন এখন। প্যাডম্যানের মতো মেইনস্ট্রিম সিনেমায় দেখা মিলছে তার, নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়া তো রাধিকাকে ঘিরেই তৈরি করছে গল্প।

ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ স্পষ্টবাদী তিনি। সম্পর্ক নিয়ে লুকোচুরি খেলাটা বলিউডি তারকাদের স্বভাব, সেখানে শুরু থেকেই নিজের রিলেশনশীপ স্ট্যাটাস নিয়ে বলতে দ্বিধা করেননি রাধিকা। তথাকথিত ‘সিঙ্গেল’ ট্যাগলাইন ঝুলিয়ে রাখেননি নিজের নামের পাশে। একটা দক্ষিণী সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে নায়ককে থাপ্পড় মেরে বসেছিলেন তিনি! সেই অভদ্র নায়ক নাকি তার সাথে দুর্ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। রাধিকার বক্তব্য ছিল, “সিনেমার নায়ক হয়ে তো সে আমার গায়ে হাত দেয়ার অধিকার পেয়ে যায়নি। আমি যেটা করেছি সেটা জেনে বুঝেই করেছি। লজ্জা থাকলে ওই লোক জীবনে আর আমার সামনে এসে দাড়ানোর কথা ভাববে না!”

রাধিকা আপ্তে এমনই, সহজ-সরল, স্বাধীনচেতা, আবার প্রয়োজনে ভীষণ প্রতিবাদীও। পেছনে ফিরে তাকালে রাধিকা হয়তো অবাকই হবেন, যে জার্নিটা তিনি করেছেন, যে বন্ধুর পথটা তিনি পেরিয়ে এসেছেন, বারবার প্রত্যাখ্যান সয়েও হাল ছেড়ে না দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো যেভাবে তিনি লিখেছেন দিনের পর দিন, সেটা মোটামুটি অবিশ্বাস্য। যে মেয়েটার অভিনেত্রী হবার কথা ছিল না, তিনিই এখন ভারতের ওয়েব সিরিজের জগতে রাজত্ব করছেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। ‘ফ্রম নোবডি টু নেটফ্লিক্স কুইন’- এই অসম্ভব গল্পটা হয়তো সম্ভব হয়েছে মানুষটা রাধিকা আপ্তে বলেই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button