মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

অন্য হাতে প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং সেন্টারের সর্বনাশ?

১.

সুনীল ক্লাস টেন-এ পড়ে। তার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা, মা গৃহিণী। ছোট একটি বোন আছে তার। পরিবারের বড় সন্তান সুনীল। বাবার ইচ্ছা, ছেলে তার বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। বাবার পরিবার চালাতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হলেও, কখনও সুনীল’র পড়াশুনার জন্য কোন কার্পণ্য করে নি।

সুনীল এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষার আর মাত্র ৪ মাস বাকি রয়েছে। তাই সুনীলের পড়াশুনার চাপ একটু বেশি। অঙ্ক এবং ইংলিশ-এ একটু দুর্বল সুনীল। এই শেষ মুহূর্তে কিছু জিনিস ঠিকঠাক মতো না  বুঝলেই নয়। বাবা অবশ্য সুনীলকে বলেছিল কোন প্রাইভেট শিক্ষক নিতে। কিন্তু এখন যদি কোন ভালো প্রাইভেট শিক্ষক রাখে তাহলে দুটি সাবজেক্ট- এর জন্য তার বাবাকে মাসিক গুনতে হবে কমপক্ষে প্রায় ১০০০০ টাকা। পরে সুনীলই বাবাকে বোঝায় প্রাইভেট না পড়ে বরং কোচিং করলে তার বেশি লাভ হবে। একে তো খুব কম টাকায় তার পড়া টা হয়ে যাচ্ছে, তাছাড়া কোচিং-এ এই সময় ঘন ঘন মূল্যায়ন টেস্ট হয়, যা নিজেকে যাচাই করার জন্য খুবই দরকার।

কিন্তু হঠাৎ করে সুনীল শুনতে পাচ্ছে যে, সব কোচিং সেন্টার নাকি বন্ধ করে দিবে সরকার। সুনীল এও জানতে পেরেছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পিছনে নাকি কোচিং সেন্টারগুলার হাত রয়েছে। সুনীল আর হাসি থামিয়ে রাখতে পারে না। সে শুধু একটি প্রশ্নেরই জবাব পায় না, আর সেটি হল- “আচ্ছা পরীক্ষার প্রশ্ন কি কোচিং সেন্টারগুলো বানায় নাকি? বানায় তো শিক্ষা বোর্ড! তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁস এর কলঙ্ক কোচিং সেন্টার-এর গায়ে লাগছে কেন?”

সুনীল’র অনেক বন্ধু আছে, যারা কোচিং করে। কেননা- ক্লাসের পড়া অনেক সময় বুঝতে পারে না তারা। তাদের বেশিরভাগই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। সুনীল চিন্তা করে, কোচিং যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের মতো পরিবারের সন্তানরা কিভাবে পিছিয়ে পড়া সিলেবাসগুলো কভার করবে? সবার পক্ষে তো আর ওয়ান টু ওয়ান প্রাইভেট পড়া সম্ভব না।

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স

সুনীলের মতে, সরকারকে আরও বিচক্ষণতার সাথে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে পরে হিতে বিপরীত না হয়ে যায়।

২.

বিজয় এখন বুয়েটের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ২য় বর্ষের ছাত্র। তার বাবা কৃষিকাজ করে। মা গৃহিণী। আল্লাহর অশেষ রহমতে বিজয় এখন দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিগ্রি নিচ্ছে। এত দূর আসতে বিজয়ের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। পড়াশোনায় অতটা ভালো ছিল না বিজয়। সামান্য অঙ্ক দেখলেই ভয়ে পালিয়ে বেড়াত আর ফিজিক্স’র কথা তো না বলাই ভালো।

তার এই অগ্রগতির পিছনে যার সবচেয়ে বড় হাত রয়েছে তিনি হলেন, কমল ভাই। কমল ভাই হলেন একটু অন্য কিসিমের। খুবই ট্যালেন্টেড। বিজয়ের বাসার পাশেই কমল ভাইয়ের বাসা। কমল ভাই-ই প্রথম পড়াশোনার আনন্দটা বিজয়ের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই বিশ্বটা যে কত বিশাল এবং একে জানার ও বোঝার আনন্দটা যে তার থেকেও বিশাল এই উপলব্ধিটা কমল ভাইয়ের কাছ থেকেই শেখা। তিনিই প্রথম শিখিয়েছিলেন, না বুঝে শুধু মুখস্থ করলে প্রতিভার কোন বিকাশ হয় না, বরং প্রতিভা ধ্বংস হয়।

কমল ভাইয়ের একটি বড় ইচ্ছা হল স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ভিতরে পড়াশোনার আগ্রহ গড়ে তোলা। তাই তো তিনি বুয়েট থেকে পাশ করার পরও অন্য কোন বড়  কোম্পানিতে  চাকরি না করে একটি ভিন্নধর্মী পাঠশালা বা কোচিং সেন্টার গড়ে তোলেন, যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তবধর্মী পাঠদানের পাশাপাশি প্রতিভার বিকাশ ঘটানো হয়।

কিন্তু ইদানিং শোনা যাচ্ছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে সরকার নাকি সব কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দিতে চায়। এই সিদ্ধান্তটা যে কতটা বোকামী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে করে কী প্রমানিত হয়? সরকার কি তাহলে তার প্রশাসনের ব্যর্থতা অন্য কারও ঘাড়ে চাপাচ্ছে? এটা তো অনেকটা ঝিকে মেরে বউকে বোঝানো”র মতো হল।

সরকারকে এখনই এরকম সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের উচিত এই কলংকের সাথে জড়িত প্রকৃত আসামীদেরকে কাঠগড়ায় দাড় করানো। আর তা না হলে কমল ভাইয়ের মত মেধাবী মানুষের সাহায্য থেকে এ দেশ বঞ্চিত হবে, যার সূদুরপ্রসারী দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

৩.

মোস্তফা একটি প্রাইভেট কোচিং এর একটি শাখায় ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত আছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা বি.এ পাশ। ৬ বছর আগে তিনি তার শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন। ইচ্ছা ছিল বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করবেন। কিন্তু এই দেশের যা চাকরির বাজার এবং যা প্রতিযোগিতা, তার সাথে পেরে উঠছিলেন না। শেষমেশ একটি প্রাইভেট কোচিং-এ জব হয় তার। দীর্ঘ ৪ বছর ধরে কর্মরত আছেন।

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স

পরিবারে আছেন স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধা মা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হলেন মোস্তফা। একার উপার্জন নিয়ে আল্লাহর রহমতে ভালোভাবেই দিন কাটছে মোস্তফার। তবে ইদানিং খুব টেনশনে আছেন তিনি। কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেয়ার কথা  চলছে সরকারের পক্ষ থেকে। অভিযোগ- প্রশ্নপত্র ফাঁস। অন্য কোচিং সেন্টারের কথা বলতে পারবে না, তবে তার এই কোচিং-এ এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি।

তার কোচিং-এ যারা ক্লাস নেয়, তারা সবাই মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। দেশের স্বনামধন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা। মোস্তফার মতে সঠিক প্রমাণাদি ছাড়া এত বড় একটি সিধান্ত নেয়া সরকারের কোনভাবেই ঠিক হবে না। প্রশ্নপত্র যদি কোন অসাধু উপায়ে ফাঁস হয়ে কোন অসাধু কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে এর সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ভুলে গেলে চলবে না যে, গোড়ায় যদি পচন ধরে তাহলে কোন অবস্থাতেই শীর্ষ থেকে থেকে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং সরকার কে আগে গোড়া অর্থাৎ এর উৎপত্তির সন্ধান করতে হবে এবং সেখান থেকে সমস্যার সমাধান করতে হবে। একটি পিঁপড়া কামড় দেয়ার ফলে পুরো পিপড়াদের কলোনিকে ধ্বংস করাতে বিপদ কমবে না, বরং আরও বাড়বে।

মোস্তফা চিন্তা করে এই কোচিং হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলে কিভাবে সংসার চালাবে। এই কোচিং এর সাথে জড়িত আছে কত শত শত মানুষের জীবিকা। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তখন তারা। তাই মোস্তফার মতে সরকারের উচিত মূল সমস্যা বের করে তার সমাধান করা। তা না হলে ভুলের মাশুল সরকারকেই দিতে হবে। তাই সময় থাকতে এখনই উচিত এই ভয়ংকর সিধান্ত থেকে বেরিয়ে আসা এবং এই বাড়তে থাকা বহুল আলোচিত সমস্যার লাগাম টেনে ধরা।

পুনশ্চঃ “প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে সকল কোচিং সেন্টার বন্ধ”। এরকম একটি রায় দেওয়ার আগে এরকম হাজার হাজার সুনীল, বিজয় এবং মোস্তফার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। না হয় এরকম একটি রায় বাংলার মাটিতে একটি কলঙ্কময় সিদ্ধান্ত হিসেবে স্মরণীয় থাকবে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button