ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থেকেও দুর্নীতির ‘পক্ষে’ এভাবে সাফাই গাওয়া নজিরবিহীন!

ওবায়দুল কাদের, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক যিনি গণমাধ্যমে বিচিত্র মন্তব্য দিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনায়। তার সাম্প্রতিক আলোচিত মন্তব্য রুপপুরের সেই বালিশ কান্ড এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের পর্দা বিষয়ক দুর্নীতিকে নিয়ে। তিনি এধরণের দুর্নীতিকে ‘ছিঁচকে’ কাজ বলে অভিহিত করেছেন।

ফরিদপুরের দুর্নীতির ঘটনাটি একদম তরতাজা। কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমে এই দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়। জানা যায়, আইসিইউ’র যেখানে রোগীকে রাখা হয়, সেখানে রোগী আড়াল করার জন্যে একটা পর্দা ব্যবহৃত হয়। পর্দা মানে পর্দা, স্বর্ণ রুপা দিয়ে বানানো কোনো কাপড় নয়। এই এক সেট পর্দার দাম কত জানেন? এক হাজার না, দুই হাজার না, পাঁচ হাজার, দশ হাজার, পঞ্চাশ কিংবা এক লাখও না। এক সেট পর্দার দামই সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা!

ফরিদপুর মেডিকেলে সরঞ্জাম কেনায় এই দুর্নীতি তদন্ত করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক তদন্তে শুধু পর্দা নয়, অন্যান্য সরঞ্জাম কেনাকাটায় ৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে।

এই হলো পর্দা কান্ড। যেখানে এক সেট পর্দার দাম হয় সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা!

এর আগে রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশ কান্ডের কথা তো সবাই জানেন। পাবনাযর রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের গ্রিন সিটিতে একেকটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয় ৬ হাজার টাকা। সেই বালিশ ভর্তি কি তুলা থাকে না, জাদু মন্তর থাকে কে জানে! যাহোক, রুপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এসব কেনাকাটা সংক্রান্ত দুর্নীতিও তখন টক অব দ্য টাউন হয়েছে।

সরকারি প্রকল্পে কেনাকাটায় দুর্নীতি হওয়া দুর্নীতির একটা রুপ। এর বাইরেও কি দুর্নীতি থেমে আছে? সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ করার উৎসব থেমে আছে?

কয়দিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম, পুকুর খনন শেখার জন্য এক প্রকল্পের ১৬ জন কর্মকর্তা বিদেশ সফর করবেন। তাদের বিদেশ সফর ব্যয় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। প্রকল্প হলেই কোনো না কোনোভাবে তার সাথে বিদেশ সফর জুড়ে দেয়ার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কদিন পর দেখা যাবে হয়ত কিভাবে গুগলে সার্চ দিয়ে তথ্য বের করতে হয় এই প্রশিক্ষণ নিতে আমেরিকা সফর করছে কোনো একটা দল। হতেই পারে। বাংলাদেশে সব সম্ভব। নাসায় অলীক যেতে না পারলেও নাসাকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্যে বাংলাদেশ থেকে মন্ত্রণালয়ের দল ঠিকই চলে যায়। বিদেশ সফর করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করে কে! শুধু ধন্যবাদ কেন, কদিন পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নরেন্দ্র মোদীকে ‘আপনার হেয়ার স্টাইল অনেক সুন্দর’ বলার জন্যেও বিদেশ সফর যে হবে না তার নিশ্চয়তা নেই। যেকোনো কিছুই সম্ভব এদেশে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তারপরেও দুর্নীতি কমছে না। আওয়ামীলীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে ক্ষমতায়। এখন দুর্নীতি কমে এসে এতোদিনে জিরো না হোক, মোটামুটি টলারেবল পর্যায়ে আসার কথা। কিন্তু, প্রতিদিন পত্রিকা খুললে দুর্নীতির কোনো না কোনো চালচিত্র পাওয়া যাবেই। এগুলোকে অস্বীকার করার জায়গা নেই, বিশেষ করা আপনি যদি সরকারের কোনো দায়িত্বশীল পর্যায়ের প্রতিনিধি হন। আপনি নিজে দুর্নীতি করেন না, মানে দুর্নীতি হচ্ছে না কোথাও – এই থিউরি দেয়ারও সুযোগ নেই। আপনি দুর্নীতি করেন না বলে দেশের দুর্নীতির অদ্ভুত একেকটা ঘটনাকে হালকা চালে দেখে যাবেন- এটাও অপ্রত্যাশিত৷ কারণ, আপনার দল টানা তিনবার ক্ষমতায়। এখনো অজুহাত দেখানোটা ইম্যাচিউর আচরণ।

সবচেয়ে অবাক লাগে যখন এসব দুর্নীতিকে দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকজন ‘এগুলা তেমন কিছু না, আগে তো এর চেয়েও বেশি হইতো’ ভাব নিয়ে হালকা করে দেখতে শুরু করে। ওবায়দুল কাদের যেমনটা করলেন। তিনি বললেন, “এ ধরনের ছিঁচকে কাজগুলো যারা করে থাকে তারা নিশ্চয়ই কোন এমপি বা মন্ত্রী নয়। এটা হাওয়া ভবনের মত লুটপাটের বিষয় নয়। দেশটাকে লুটপাট করে খেয়েছে হওয়া ভবন। হাওয়া ভবন ছিল তখন খাওয়া ভবন। আমাদের সময়ে লুটপাটের জন্য কোন ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র তৈরি হয়নি। এটা আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি। বালিশ আর পর্দা এটার সঙ্গে হাওয়া ভবনকে মেলানো যাবে না।” প্রায় একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদও।

২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দুর্নীতি চরমে ছিল। দুর্নীতিতে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। একথা সবাই জানে। সেই জায়গা থেকে আওয়ামীলীগকে মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল, দিন বদলের সনদ দেখে। তারপর আওয়ামীলীগ আরো দুবার টানা ক্ষমতায়৷ কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতি কি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেছে? দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের ক্ষতি এবং ক্ষত যে সারছে না এখনো। তাই, ২০০১ থেকে ২০০৫ এর দুঃশাসনকালের রেফারেন্স দিয়ে বর্তমান দুর্নীতিকে ‘ছিঁচকে’ বলা দুঃখজনক। কারণ, ওই দুর্নীতির সেই ভয়াল সময়টা পার হয়ে যাওয়া এতোদিনে আমাদের উচিত ছিল। কেন পারিনি? প্রত্যেকটা দুর্নীতিই দেশকে একটু করে পিছিয়ে দেয়৷ রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করলে, সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেম থাকলে কোনো দুর্নীতিকেই ‘ছিঁচকে’ বলার সুযোগ নেই আসলে।

একটা অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় আজকাল। এইসময়ে এসে যত অপকর্ম, সব কিছুকে হালালীকরণ করতে রেফারেন্স দেয়া হয় অতীতের। অতীতের কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। কিন্তু বর্তমানের একটা অপরাধকে হালালীকরণের জন্যে অতীতের কথা টানা দেশের জনগণকে সুখকর কোনো বার্তা দেয় না।

অবস্থার প্রেক্ষিতে মনে হয়, এদেশে সব অপকর্ম, ধর্ষণ, দুর্নীতি, গুম, খুন, দুঃশাসন – চিরকালের জন্যে বৈধ থাকবে। কারণ, অতীতে যেহেতু হয়েছে, এখন হতে দোষ কি! “আগের মতো তো হচ্ছে না” – সাফাই গেয়ে দায় সারা যায়৷ আবার এখন যেসব অপকর্ম হচ্ছে ভবিষ্যতেও এসবের রেফারেন্স টানা হবে। এভাবেই চলতে থাকবে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button