ইনসাইড বাংলাদেশ

পূর্ণিমাকে ভোলেনি বাংলাদেশ!

পূর্ণিমা রাণী শীলের কথা মনে আছে? কিংবা নামটা পরিচিত লাগছে? চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা নয়, সেই ছোট্ট কিশোরী পূর্ণিমার কথা বলছি, সংখ্যালঘু বা হিন্দু হবার ‘অপরাধে’ যাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণ করেছিল বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডারেরা। সেই পূর্ণিমা এখন আর ছোট্টটি নেই, অনেক বড় হয়ে গেছে সে, বয়স এখন প্রায় ত্রিশ। সেই মেয়েটাকে আজ তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম নিজের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

২০০১ সালের ঘটনা, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে সবেমাত্র। ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। গদিতে বসতে দেরী, অত্যাচারের স্টীম রোলার চালাতে দেরী হয়নি দলীয় ক্যাডারদের। আর সেই নৃশংস অত্যাচারের শিকার সবচেয়ে বেশী হয়েছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। ধরে নেয়া হয় যে, হিন্দু বা সংখ্যালঘু ভোটারেরা আওয়ামীলীগের ভোটব্যাংক, একারণেই তাদের ওপর ক্ষোভটা বেশী ঝেড়েছিল প্রতিপক্ষ দলটার কর্মীদের অনেকে।

তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস আর হৃদয়বিদারক গল্পটা পূর্ণিমা রানী শীলের। ২০০১ সালে পূর্ণিমার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর, ক্লাস এইটের ছাত্রী ছিল এই মেয়েটা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ওদের বাড়ি, সেখানেই একটা স্কুলে তখন পড়তো সে। ২০০১ সালের ৮ই অক্টোবর রাতটা হয়তো সারাজীবনের জন্যে দুঃস্বপ্নের এক কালরাত্রি হয়ে আছে। সেই রাতে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত ক্যাডারেরা হামলা করেছিল তাদের বাড়িতে। পূর্ণিমা আর তার মা’কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ি থেকে, একটু দূরের একটা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে প্রায় পনেরো থেকে বিশজন ধর্ষকামী যুবক ধর্ষণ করেছিল কিশোরী পূর্ণিমাকে। মায়ের সামনেই মেয়ের ছোট্ট শরীরটার ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল এই নরপিশাচের দল। পূর্ণিমার মায়ের ক্ষমতা ছিল না এই পশুগুলোকে বাধা দেয়ার, তিনি শুধু মিনতি করে বলেছিলেন- “বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো, নইলে ও মরে যাবে।”

সেই রাতের বিভীষিকার কথা এখনও স্পষ্ট মনে করতে পারেন পূর্ণিমা। বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, “ওরা আমাকে এমন অবস্থায় যে হাতের ওপর করে তুলে নিয়ে কেউ খামচাচ্ছে, কেউ জামা-প্যান্ট টেনে খুলে ফেলছে। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে শ্মশানঘাট। সেই শ্মশানঘাটের মাঝে আমাকে একটা পতিত ক্ষেতের মধ্যে রেখে গণধর্ষণ করা হয়। আবার ওদের হাতের টর্চলাইটের আলোতে আমি ওদের দেখতে পাচ্ছি।”

এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন শাস্তি নেই, সংখ্যালঘুদের খুন-ধর্ষণের কোন বিচারও নেই। তবে পূর্ণিমা বিচার পেয়েছিল, সেই বিচারের জন্যে ওকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশী সময়। ২০১১ সালে আদালত সতেরো আসামীর মধ্যে এগারো জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দেন।

ধর্ষনের শিকার হওয়া মেয়েদের প্রতি আমাদের সমাজ বা মানুষজন বেশ নির্মম। একাত্তরের বীরাঙ্গনারাও রেহাই পাননি সমাজের উপেক্ষা আর ঘৃণা থেকে, সেখানে পূর্ণিমা তো কোন ছার! তবে সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের কাজ করে গিয়েছেন পূর্ণিমা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করেছেন, তারপরে নিজের শহরেই ছোট বাচ্চাদের গান শেখানোর একটা স্কুল খুলেছিলেন।

তবে চলার পথে পদে পদেই কলুষিত মানসিকতার মানুষগুলোর বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত হতে হয়েছে পূর্ণিমাকে। ২০১১ সালের সেই রাতে একদল অমানুষের হাতে ধর্ষিত হয়েছিলেন পূর্ণিমা, এরপরও তাকে কম ভোগায়নি সমাজের ধর্ষকামী অমানুষের দল। সবার যেখানে ওর পাশে দাড়ানোর কথা ছিল, শক্ত করে পূর্ণিমার হাত ধরে তাকে আশ্বাস দেয়ার কথা ছিল, তার বদলে কটুক্তি আর গঞ্জনা সইতে হয়েছে এই মেয়েটাকে।

এখানেই থেমে থাকেনি পশুর দল, পূর্ণিমার নাম আর ছবি দিয়ে ভূয়া ফেসবুক একাউন্ট খোলা হয়েছে, সেই একাউন্ট থেকে অশ্লীল ছবি আর পোস্ট দেয়া হয়েছে। এগুলো নিয়েও বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে পূর্নিমাকে। তার সহপাঠী বা কলিগরা এগুলো দেখে তার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছে, তার দিকে আঙুল তুলেছে। রাস্তায় চলতে পারতেন না পূর্ণিমা, তার ওপর হামলাও করেছে কেউ কেউ, চুলের মুঠি ধরে মেরেছে পূর্ণিমাকে, যেন ধর্ষিত হওয়াটা তার দোষ! এই তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাবার কথাও ভাবছিলেন পূর্ণিমা, বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি।

দেশের মানুষ পূর্ণিমাকে ভুলে গিয়েছিল, আর যারা মনে রেখেছিল তারাও ঘৃণাভরেই উচ্চারণ করতো এই নামটা। এই দেশ, বাংলাদেশের মানুষজনের কাছে ভালো কিছুই পায়নি পূর্ণিমা, কখনও হয়তো খানিকটা সহানুভূতি মিলেছে। কিন্ত কেড়ে নিয়েছে তার সোনালী কৈশর। সতেরো বছর আগে তার জীবনটাকে নরকে পরিণত করে দিয়েছিল কিছু মানুষরূপী হায়েনা, সেই ধারাটা বজায় রেখেছে আমাদের সমাজ, সমাজে ভালোমানুষের মুখোশ পরে লুকিয়ে থাকা অজস্র হায়েনা। সতেরো বছর বাদে তারানা হালিমের মাধ্যমে পূর্ণিমাকে ছোট্ট করে হলেও কিছু একটা দিতে পারলো বাংলাদেশ।

এটা পূর্ণিমার সঙ্গে হওয়া সেই নৃশংস অবিচারের ক্ষতিপূরণ নয়, এটা একজন মানুষ পূর্ণিমার পাশে দাঁড়ানো, তার কাঁধে বন্ধুত্বের হাত রেখে তাকে ভরসা দেয়া। তার মনে এই আত্মবিশ্বাসটা ঢুকিয়ে দেয়া, জীবনে চলার পথে সে একা নয়, পুরো বাংলাদেশ আছে ওর সঙ্গে। সতেরোটা বছর ভয়াল এক অতীত নিয়ে পথ চলেছে পূর্ণিমা, একদম একা। আজ থেকে সবাই ওর সঙ্গে আছে, এটাই ওকে জানিয়ে দিয়েছেন তারানা হালিম। আমাদের পক্ষ থেকে পূর্ণিমার জন্যে ভালোবাসা, তারানা হালিমের প্রতি অজস্র কৃতজ্ঞতা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button