ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

পূর্ণিমা, নাকি মৌসুমী?

গত নির্বাচনের আগে একটা জিনিস ছিল চোখে পড়ার মতো, সেটা হচ্ছে সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়া অঙ্গনের তারকাদের রাজনৈতিক প্রচারণায় অংশ নেয়াটা। এতদিন যাদেরকে দূর গ্রহের নক্ষত্র ভাবা হতো, তারা নেমে এসেছিলেন মানুষের কাছাকাছি। পছন্দের দল বা প্রার্থীর হয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন তারা, চেয়েছেন ভোট। এটাকে বাঁকা চোখে দেখার কিছুই নেই, তারকারাও মানুষ, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা থাকতেই পারে, যে কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি অনুগত হতেই পারেন। কিন্ত সেটা যদি শুধুই ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে হয়, সেটার চেয়ে নিন্দনীয় কাজ আর কিছুই নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অনেক তারকাই মনোনয়ন সংগ্রহ করেছিলেন, পছন্দের রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোটে দাঁড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তবে সবার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে জিতে সরকার গঠন করেছে, তবে মধুর খোঁজে ঘুরে বেড়ানো মৌমাছিদের আনাগোনা এখনও বন্ধ হয়নি। সামনেই সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী নিয়োগ দেয়া হবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে, আর সেখানে আওয়ামী লীগ থেকে তেতাল্লিশজন সংসদে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। আর এই তেতাল্লিশ জনের একজন হবার বাসনায় তারকাদের দৌড়ঝাঁপটাও এখন চোখে পড়ার মতো। রাজনীতি বা আওয়ামী লীগ, কোনটার সাথে দূর দূরান্তের সম্পর্ক না থাকা স্বত্ত্বেও অনেকেই নাম লেখাচ্ছেন এই রেসে!

এদেরই একজন চিত্রনায়িকা মৌসুমী। ক্যারিয়ারে অজস্র জনপ্রিয় আর ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেয়া এই অভিনেত্রীও আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন, সংসদে ঠাঁই পেতে চান তিনিও! অথচ অভিযোগ আছে, একটা সময়ে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি! তারেক রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্বল চেহারায় একটা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করার ছবিও ভেসে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যদিও মৌসুমীর দাবী, তিনি কখনোই জাসাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ছবির বিষয়ে তার বক্তব্য হচ্ছে- “বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের যেতে হয়, গেলে তো ছবি আসবেই। ছবিটা তো আমি তুলি নাই।”

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, মৌসুমি সত্যি কথা বলছেন। জাসাস, বিএনপি বা তারেক রহমান, কারো সঙ্গেই তার কোন ঘনিষ্ঠতা কোব কালে ছিল না। কিন্ত তিনি যে মনে প্রাণে আওয়ামী লীগ সমর্থন করেন, সেটার প্রমাণ কোথায়? গত পাঁচ-দশ বছরে তিনি কি কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন? তার পরিবারের কি কোন রাজনৈতিক ইতিহাস আছে? রাজনীতিতে ত্যাগী নেতাদের সুযোগটা সবার আগে পাবার কথা, মৌসুমী দলের জন্যে কি ত্যাগ স্বীকার করেছেন? নাকি শুধু নিজের আখের গোছানোর জন্যেই রাজনীতিতে আসার এই সিদ্ধান্ত?

এবার আরেকজনের কথা বলি। তার নাম পূর্ণিমা রানী শীল। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সংখ্যালঘু নির্যাতনের যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস আর হৃদয়বিদারক গল্পটা পূর্ণিমার। ২০০১ সালে পূর্ণিমার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর, ক্লাস এইটের ছাত্রী ছিল এই মেয়েটা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ওদের বাড়ি, সেখানেই একটা স্কুলে তখন পড়তো সে। ২০০১ সালের ৮ই অক্টোবর রাতটা হয়তো সারাজীবনের জন্যে দুঃস্বপ্নের এক কালরাত্রি হয়ে আছে।

সেই রাতে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত ক্যাডারেরা হামলা করেছিল তাদের বাড়িতে। পূর্ণিমা আর তার মা’কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ি থেকে, একটু দূরের একটা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে প্রায় পনেরো থেকে বিশজন ধর্ষকামী যুবক ধর্ষণ করেছিল কিশোরী পূর্ণিমাকে। মায়ের সামনেই মেয়ের ছোট্ট শরীরটার ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল এই নরপিশাচের দল। পূর্ণিমার মায়ের ক্ষমতা ছিল না এই পশুগুলোকে বাধা দেয়ার, তিনি শুধু মিনতি করে বলেছিলেন- “বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো, নইলে ও মরে যাবে।”

সেদিন পূর্ণিমা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন শুধু। কিন্ত সেই ভয়াল রাতের রেশটা তাকে টানতে হচ্ছে সারাজীবন ধরে। বিচার তো পানইনি অনেকগুলো বছর। এখনও তার নামে ফেসবুকে ভুয়া একাউন্ট খুলে তাকে উত্যক্ত করা হয়। সেসব একাউন্ট থেকে অশ্লীল ছবি আর পোস্ট দেয়া হতো। এগুলো নিয়েও বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে পূর্নিমাকে। তার সহপাঠী বা কলিগরা এগুলো দেখে তার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছে, তার দিকে আঙুল তুলেছে। রাস্তায় চলতে পারতেন না পূর্ণিমা, তার ওপর হামলাও করেছে কেউ কেউ, চুলের মুঠি ধরে মেরেছে পূর্ণিমাকে, যেন ধর্ষিত হওয়াটা তার দোষ! এই তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাবার কথাও ভাবছিলেন পূর্ণিমা।

পূর্ণিমা তো এসির হাওয়া খেয়ে ফটোসেশন করে বেড়ানো সেলেব্রেটি নন, তাই বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা তাকে করতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তিনি, বছরখানেক আগে প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের দপ্তরে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও চাকুরি পেয়েছিলেন তিনি। জীবনযুদ্ধে পূর্ণিমা হার মানেন নি, মাথা নত করেননি, তিনি একজন ধর্ষিতা, এই লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখেননি। সেই অসমসাহসী তরুণী এবার সংসদে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আওয়ামী লীগের হয়ে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছেন। সংসদে গিয়ে তিনি ধর্ষিতার অধিকার নিয়ে কাজ করতে চান।

সময় এখন আওয়ামী লীগের। গত দশ বছর ধরেই রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এই রাজনৈতিক দলটা। সবশেষ নির্বাচনেও সিংহভাগ আসনে জয়ী হয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। দেশে এখন বিরোধী দল বলতে কেউ নেই সেই অর্থে, সবাই এসে ভীড়ছে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে। এদের মধ্যে সুবিধাভোগী লোকজনের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয়। দশ বছর আগে যে ছেলে শিবিরের রেজিস্টার্ড কর্মী/সাথী ছিল, সে-ও এখন কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কোন একটা পদে ঢুকে গেছে। আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধুকে তিনবেলা যে লোক গালি দিতো, সে এখন পল্টি নিয়ে কোন একটা তরুণ লীগ বা শিশু লীগ গঠন করে ফেলেছে। এরকম নজির চারপাশে একটা দুটো নয়, হাজার হাজার চোখে পড়বে।

আমাদের আর কিছু বলার নেই। বাকীটা পাঠকেরাই ভালো বিচার করতে পারবেন। আওয়ামী লীগের পতাকার নিচে ঠাঁই নেয়া সুবিধাভোগীদের পাল্লাটা এখন ভারী, তাদের ভীড়ে হয়তো একজন পূর্ণিমাকে ঠিকমতো চোখেও পড়বে না। সেই পূর্ণিমা, যাকে হিন্দু হওয়ার মাশুল দিতে হয়েছিল দেড়যুগ আগে, সেই পূর্ণিমা, যিনি ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক’ বলে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। এই পূর্ণিমারাই আওয়ামী লীগকে মনেপ্রাণে ধারণ করে, সুসময়ে ভীড় করা বসন্তের কোকিলেরা নয়। একটু উনিশ থেকে বিশ হলে কোকিলের দল উড়ে যাবে নিমেষেই, তবে পূর্ণিমারা রয়ে যাবেন ঠিকই…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button