অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ছেলে আমার বড় হবে…

কলকাতার অশোকনগরে একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিও ভাসছিল নিউজফিডে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক ‘গুণধর’ পুত্র তার পিতাকে প্রহার করছে, থাপ্পড় দিচ্ছে, পাঞ্জাবির কলার ধরে টেনে আনছে। দেখে মনে হবে, বুড়ো লোক বোধহয় বিশাল কোনো পাপ করে ফেলেছে নাহয় টাকা পয়শা চুরি করেছে অথবা বুড়ো বোধহয় ফকির, ছেলেকে খুব বিরক্ত করছে তাই ছেলেটা ক্ষিপ্ত হয়ে বুড়ো মানুষটাকে এভাবে থাপ্পড় দিচ্ছে, কলার ধরে টেনে এনে মারছে। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়।

এই ভিডিও দেখে মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেল৷ ক্রোধ জাগবার কথা, কিন্তু রাগ ক্ষোভের চেয়ে আমার অন্যরকম অনুভূতি হলো। এই মানবজনমে এমন কিছু দেখতে হবে, ভাবিনি কখনো। হ্যাঁ, আমাদের সম্পর্কগুলো ঠুনকো হচ্ছে, পত্রিকায় বাবা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নিয়ে কত কাহিনীও তো লেখা হয়। কিন্তু, এই ভিডিও দেখে সহ্য করতে পারলাম না আসলে। বৃদ্ধ বাবাও বুঝতে পারছিলেন না, তিনি ছেলের কাছে কৈফিয়ত দেয়ার মতো করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলেন। যেন অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন ছেলের কাছে। কিন্তু পাষাণ ছেলের মন গলেনি তাতে, সে অবলীলায় বাবার গায়ে হাত তুললো৷

উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার অশোকনগরের বিল্ডিং মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। বৃদ্ধ লোকটার নাম মানিকলাল বিশ্বাস। আর সেই কুলাঙ্গার ছেলের নাম প্রদীপ বিশ্বাস৷ দূর্গাপূজার দশমীর দিনে মানিকলাল তার অসুস্থ স্ত্রীকে মিষ্টি এনে খাওয়াচ্ছেন লুকিয়ে, ছেলে প্রদীপ সেটা দেখে ফেলে৷ মাকে মিষ্টি খাওয়ানোর মতো “বিরাট” অপরাধে সে বাবার গায়ে হাত তুলে৷ ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ তার সুগারের রোগী স্ত্রীকে ভালবেসে দূর্গাপূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে একটু মিষ্টি দিয়েছেন, তাতেই চটে যায় ‘দায়িত্ববান’ ছেলে। সুগারের রোগীকে মিষ্টি খাওয়ানো ভুল- এটি বোঝাতে সে বাবার উপর অত্যাচার করে, নির্মম সেই ভিডিওচিত্র প্রতিবেশীদের কেউ রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেয়। মুহূর্তের সেই ভিডিও ভাইরাল হয়৷ পুলিশের কাছেও পৌঁছায় এই ভিডিও। পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করে প্রদীপকে।

ইদানিং কত রকমের ভিডিও ভাইরাল হয়, সেইসব ভিডিও নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ তৈরি হয় নতুন বিতর্ক শুরু হয়। কিন্তু, এই ভিডিও দেখে সবাই হতবাক। সবাই এই ছেলেটার উচিত শাস্তি হোক এটাই দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমন কুলাঙ্গার ছেলে থাকলে আসলে শত্রুর দরকার হয় না আর৷ এই ছেলে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। কিন্তু, ছেলের হাতে এইভাবে নিগৃহীত হয়েও মানিকলালই ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন!

প্রদীপকে আদালতে তোলা হয় গতকাল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মানিকলালও। এই বৃদ্ধ মানুষটি আদালতের কাছে অনুরোধ জানান, তার ছেলেকে যেন মুক্তি দেয়া হয়! একজন বাবার পক্ষেই কেবল সম্ভব এইরকম অবস্থার মধ্যেও ছেলের পক্ষেই কথা বলা। উল্লেখ্য, বাবার গায়ে হাত তোলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। প্রদীপ এর আগেও বাবার গায়ে হাত তুলতো অনেক তুচ্ছ তুচ্ছ কারণেও।

কিন্তু এবার ভিডিও প্রকাশ হওয়ায় প্রতিবেশীরা সবাই ক্ষেপে যায় প্রদীপের উপর। অনেকেই বলে, তারা এই কুলাঙ্গারকে এতদিন কিছু বলতে পারেনি, বলতে গেলেই শুনতে হবে এটা পারিবারিক সমস্যা, অন্য কেন নাক গলায়। কিন্তু, এবার সবার বাঁধ ভাঙ্গা ক্ষোভ উপচে পড়ে প্রদীপের উপর। সে যেভাবে নিজের পিতার গায়ে হাত তুলেছে, এভাবে মানুষ নিজের শত্রুকেও মারে না। একজন আশি বছর বয়সী পিতার প্রাপ্য কি এটাই?

যেখানে এমন ছেলেকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দেয়াও লজ্জার, সেখানে মানিকলাল কিনা নিজেই ছেলের জামিনের তদবির করতে গেলেন। তিনি উলটো বলেন, সুগারের রোগীকে মিষ্টি খাওয়ানো তারই ভুল হয়েছে। ছেলেকে যেন ছেড়ে দেয়া হয়। ছেলেকে না নিয়ে বাড়ি ফিরবেন না। এমনকি ছেলেকে না ছাড়া হলে আত্মহত্যারও হুমকি দেন তিনি। একজন বাবা তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য এর চেয়ে বেশি আর কি করতে পারেন! বিচারকও বাবার আকুতি বুঝলেন, জামিন পেয়ে গেল সেই কুলাঙ্গার। এতো বড় অপরাধ করার পর তার পিতাই যখন ছেলের হয়ে কথা বলছে, ছেলের অপরাধ ঢাকছে, তখন বিচারকও নিশ্চয়ই অবাক হন। এমন কুলাঙ্গারকে জামিন দিতেন না হয়ত, কিন্তু বৃদ্ধ মানিকলালের জন্যই কুলাঙ্গারটাকে আপাতত জামিন দিতে হলো৷

প্রদীপ নাকি অনুশোচনায় ভুগছে, ক্ষমা চেয়েছে। যে লোকের অনুশোচনাবোধ আছে সে কেন নিজের পিতার গায়ে হাত তুলবে? এমন বিকৃত মস্তিষ্ক যার, সে কি তার পিতার এই মহানুভবতা মনে রাখবে? কে জানে! সব অত্যাচারের তো আর ভিডিও হয় না। সব পাপের বিচারও হয় না। যদি এই ঘটনার পর প্রদীপ কিংবা প্রদীপের মতো কুলাঙ্গারদের একটুও উপলব্ধি হয় তাহলেই মানিকলালের এই মহানুভবতা স্বার্থক হবে। প্রদীপ হয়ত নিজেকে অনেক বড় মনে করেছে, এখন আর তার বাবাকে দরকার হয় না, তুচ্ছ-অদরকারি-অপাংতেয় মনে হয়। কিন্তু, মানিকলালের কাছে ছেলেই তো যক্ষের ধন, তার কাছে তো ছেলে এখনো সেই ছোট, অবুঝ, যার সব দোষ ক্ষমা করা যায়।

মানিকলাল হয়ত এবারো ক্ষমা করে দিয়ে ভাবেন, ছেলে আমার বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে একদিন…

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button