ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ছবিটির নেপথ্যে…

গাঁদাফুলের মালা সারা গায়ে সাপের মতো পেঁচিয়ে মুখমণ্ডলে যারপরনাই বিরক্তির ভাব নিয়ে টিএসসির জনারণ্যে হাঁটছেন— এমন একজন মধ্যবয়স্কার ছবি গতকাল ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, পাগল ঠাওরে কিংবা ‘অ্যাটেনশন সিকার’ ভেবে বিদ্রুপ করেছেন। আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারছিলাম না তার এই আপাদমস্তক ফুলবতী সাজার মাজেজা কী, কোন দুঃখে বা কী সুখে তিনি ঐ কিম্ভূতকিমাকার বেশ ধারণ করেছেন।

সামান্য ঘেঁটে আজ ভদ্রমহিলার পরিচয় বের করলাম। নাম নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা। তার প্রোফাইলে ঢুকতেই মাথা চক্কর দিলো, চোখ ভনভন করতে লাগল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের সাবেক ছাত্রী, একজন ভিজুয়াল আর্টিস্ট, একজন চিত্রশিল্পী, একটি নারীসংগঠনের সভাপতি, বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের পরিচালক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সাবেক শিক্ষক, আরো অনেক কিছু।

দেশে-বিদেশে প্রিমা যেসব জায়গায় তার চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করেন, যেসব মঞ্চে পারফর্ম করেন বা বক্তৃতা দেন, যেখানে-যেখানে চা-পানি পান করেন; সেসব জায়গায় জীবনে ঢুকতেও পারব না— নিশ্চিত। এশিয়ায়-ইউরোপে তার পারফরম্যান্সের ছবি দেখে ঢোঁক গিললাম আর ভাবলাম ঐ দেশের পথেঘাটে হাঁটতে পারলেও বর্তে যেতাম।

ফুলবেষ্টিত যে ছবিটা ভাইরাল হয়েছে, সেটা হয়তো তার কোনো ভিজুয়াল আর্টের শুটিং ছিল। প্রোফাইলে দেখলাম ঢাকার রাস্তাঘাটে মাঝেমধ্যেই তিনি এ ধরনের পারফর্ম করেন। কেন করেন, কীজন্য করেন, কী এর মাজেজা; তা বোঝার মতো ক্ষমতাও আমাদের মতো ভেতো বাঙালির নেই। তার কাজকারবারের তর্জমা ধরার মতো অ্যান্টেনা সাধারণের নেই।

প্রিমার যে ছবিটা ভাইরাল হয়েছে; মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই ছবিটা এ বছরের না, গত বছরের। স্যান্ডি সিউ নামক একজন জাপানির টাইমলাইনে প্রিমার গোটা লাইভ পারফরম্যান্সটির ভিডিও আবিষ্কার করলাম এবং বুঝলাম গতবছরের ঘটনা এ বছর আলোচনায় এসেছে। ঘটনাটা পহেলা ফাল্গুনকেন্দ্রিকও না। গত বছরের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে তিনি ভিডিওটি করিয়েছিলেন। মোটা মাথা দিয়ে যতটুকু ধারণা করতে পারি— শিল্পকর্মটির সহজ তর্জমা হলো, আমরা নানান রকম শেকলে আটকে আছি; শেকলগুলো খালিচোখে আমরা দেখতে তো পাইই না, টেরও পাই না। কখনও-কখনও সেসব শেকলকে আমরা অলঙ্কার ভেবে অবচেতনভাবে ভালোবেসেও ফেলি এবং গোটা জীবন সেই শেকল আমরা বয়ে চলি। গা থেকে ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলে শিল্পী প্রেমা শেকল ছেঁড়ারই আহ্বান জানিয়েছেন মাত্র। তার পরনের কালো কাপড় হয়তো কোনো শোক বা অশুভ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একটিমাত্র স্থিরচিত্র দেখে অনেকের মতো আমিও প্রিমাকে ভারসাম্যহীন ভেবেছিলাম এবং তার প্রোফাইল দেখার পর এখন নিজেকেই ভারসাম্যহীন মনে হচ্ছে। বহির্বিশ্বে যা শিল্প, বিদেশে যা করলে বিদেশীরা শিল্পীকে মাথায় তুলে নাচে, পদকে-সম্মানে ভরিয়ে রাখে; সীমানা পেরিয়ে সেই শিল্প এই মরার দেশে এলেই শিল্পী মার খায়, শিল্প মারা খায়; শিল্পীকে আমরা পাগল ঠাওরাই, পারলে দুটো ঢিল ছুড়ি, ক্ষণকাল না তিষ্ঠেই শিল্পীকে অতিষ্ঠ করে তুলি। ভাইরাল জিনিশের আড়ালের কথা না জেনে মজা লোটার প্রবণতা থেকে আমরা কবে যে বেরোতে পারব!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button