এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

যেখানে নামাজের কোন জায়গা নেই!

“জার্মানির মিউনিখে পুরাতন এক মদের দোকান থেকে মুসলিমদের প্রার্থনার শব্দ ভেসে আসছে। মুসলিম নারী-পুরুষ একসাথে সেখানে জায়নামাজ বিছিয়ে হাঁটু গেড়ে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করছে। পাশেই দাঁড়িয়ে চোখেমুখে কৌতুহল নিয়ে মুসলিমদের প্রার্থনা দেখছেন এক ইহুদি, এক মহিলা নামাযের জামাতের এক কোণায় বসে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন।”

অস্বাভাবিক দৃশ্য মনে হচ্ছে? মিউনিখে এরকম দৃশ্য আজকাল স্বাভাবিক হয়ে গেছে, প্রায়ই দেখা যায়। গত মে মাস থেকেই জার্মানির মিউনিখে বসবাসরত লিবারেল মুসলিম সম্প্রদায় যাযাবরের মত হয়ে গেছে। প্রতি শুক্রবার এলেই তাদের জুমার নামাযের জন্য নতুন নতুন জায়গার খোঁজ করতে হয়। এক শুক্রবার সবাই মিলে নামাজের জন্য একটা জায়গা কোন রকমে পেয়ে গেলেও, পরের শুক্রবার যে কোথায় নামাজ পড়া হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

‘মিউনিখ ফোরাম ফর ইসলাম’ (এমএফআই) নামে একটি অর্গানাইজেশন ২০১৪ সালে সেখানে বেশ বড় একটা মসজিদ নির্মাণ করেছিল। সেখানে অতিরিক্ত মুসলিমদের সমাগম হয় বলে গতবছর মসজিদটি বন্ধ সিটি কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে।

সিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র, স্টেফান হফম্যান সিএনএন নিউজকে জানান, সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হয় বলে ফায়ার রেগুলেশনের যেসব নিয়ম-কানুন আছে সেসব মানা সম্ভব হচ্ছিল না। একারণেই বন্ধ করা হয়েছে মসজিদটি।

মানুষ মসজিদে জায়গা হত না, বাইরের রাস্তায়ও অনেকে নামাজে দাঁড়িয়ে যেত বলে এমএফআই এর ইমাম, আহমেদ পোপাল জানান। মানুষে মসজিদ ভরে গেলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত, তখন জানালা দিয়ে মানুষ ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করত।

মুসলিমদের জন্য মসজিদ হলো এমন এক জায়গা যেখানে সবাই একসাথে মিলিত হতে পারে, ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করতে পারে, আত্মিক প্রশান্তিও লাভ করতে পারে এখানে এসে। একটা মসজিদও যখন থাকে না নামাজের জন্য তখন এটা খুব কষ্টের ব্যাপার।

এমএফআই এর মসজিদটি ছাড়াও কমপক্ষে পাঁচটা বেশ বড় মসজিদ ছিলো মিউনিখে। সেগুলোও বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত লোক সমাগমসহ নানা অসুবিধার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। মিউনিখের আশেপাশে কিছু মসজিদ অবশ্য টিকে আছে এখনও। কিন্তু যারা সেন্ট্রাল মিউনিখে থাকে, পড়াশোনা ও বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততার কারণে তাদের পক্ষে বেশিরভাগ সময় সম্ভব হয়ে ওঠেনা অতদূর গিয়ে নামাজ পড়ে আসা।

এছাড়াও শহরের মধ্যে ছোট ছোট কতকগুলো প্রার্থনার স্থান রয়েছে। সেগুলোতে স্থানীয় ভাষায় ধর্মীয় উপদেশ দেওয়া হয় এবং বিশেষ কোন কমিউনিটির মানুষদের জন্যই সেগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বলে সবাই সেখানে নামাজ আদায় করতে পারে না।

মসজিদের সমস্যা তো আছেই, ইউরোপজুড়ে ধারাবাহিক জঙ্গী হামলার পর থেকে মুসলিমরা সেখানে ব্যক্তিগতভাবেও খ্রিস্টানদের বিদ্বেষের মুখে পরে অনেক সময়।

এমএফআই এর ইমাম আহমেদ পোপাল জানান, তারা চার মাস ধরে বিভিন্নভাবে একটি স্থায়ী জায়গার সন্ধান করছে। কিন্তু এখনও সেরকম কোন জায়গার সন্ধান তারা পায়নি। স্থানীয়রা মসজিদ করবে শুনলে তাদের জায়গা বা বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। শুধু তাই না স্থানীয়রা অনেকে আবার তাদের সাথে শত্রু সুলভ বিভিন্ন ধরণের বৈরি আচরণ করে থাকে।

পোপাল বলেন, তিনি কখনো কারো সাথে ঝামেলায় জড়াতে চান না। প্রতিবাদও করতে চাননা কোন কিছুর। তিনি শুধু সেখানকার মুসলিমদের অসহায় অবস্থাটা সম্পর্কে সবাইকে জানাতে চান। যদি কোন সমাধান পাওয়া যায়!

মুসলিমদের পাশে দাঁড়ালেন যে খ্রিস্টান যাজক

সব ধর্মেই কিছু ব্যতিক্রম ভালো মানুষ থাকেন যারা বিশ্বাস করেন সবারই নিজ নিজ ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করার অধিকার আছে। তাই কার্ল কার্ন নামক মিউনিখের এক চার্চের যাজক যখন আহমেদ পোপালের এই জামায়াতটির অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তিনি তার চার্চের একটি ঘর মুসলিমদের নামায পড়ার জন্য দিতে চান। কার্ন বলেন, যখন কোন ধর্মের মানুষ প্রার্থনা করতে চায়, তখন সৃষ্টিকর্তার ভয়ে ভীত এমন সবারই উচিত তাদের সে কাজে সাহায্য করা।

নিজের প্রার্থনাগৃহের দরজা মুসলিমদের জন্য খুলে দিয়ে কার্ল কার্ন সবার কাছে যে বার্তাটি দিতে চেয়েছেন তা হলো, মুসলিমরা মিউনিখে অবাঞ্ছিত নয়।

কার্ল কার্নের বার্তা অনেকের কাছেই পৌঁছেছে সম্ভবত। কেননা, এরপর থেকে মিউনিখের অনেক চার্চে, থিয়েটারে এবং কালচারাল ইন্সটিটিউশনেও মুসলিমদের নামাজের জন্য সাময়িকভাবে জায়গা দেওয়া হতে থাকল। এমএফআই এর প্রতিষ্ঠাতা একরান ইনান এবং ইমাম আহমেদ পোপাল যদিও এ নিয়ে খুবই কৃতজ্ঞ তবু তারা মুসলিমদের জন্য একটা স্থায়ী প্রার্থনার জায়গা চান।

যেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের চাইতেও কঠিন

২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১.২ মিলিয়ন মুসলিম জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের বেশিরভাগই সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক থেকে আসা রিফিউজি। বর্তমানে জার্মানিতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫.৫ শতাংশ মুসলিম। একারণেই দেশজুড়ে যেসব মসজিদ আছে সেগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বিশেষ করে, জুম্মার দিনে।

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে জার্মানির মানুষেরা অনেকেই এখনো এই রিফিউজি মুসলিমদের মেনে নিতে পারেনি। ১৯% জার্মান নাগরিক চায় না শরণার্থী মুসলিমরা তাদের দেশে তাদের প্রতিবেশী হয়ে বাস করুক।

জার্মানির মিউনিখ নগরীটি রাজনৈতিকভাবেই খুব রক্ষণশীল। সেখানে খ্রিস্টানরা খুব কড়াকড়িভাবে নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে। তাই, মসজিদ নির্মাণ করা বা মসজিদের জন্য কোন জায়গা ভাড়া পাওয়া একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করার চেয়েও বেশি কঠিন বলে অনেকের ধারণা। তার ওপর আবার সম্প্রতি সারা ইউরোপজুড়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে মুসলিমদের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় এটি আরও ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

শুধু মিউনিখেই নয় পুরো জার্মানি জুড়েই মুসলিমদের জন্য প্রার্থনার জায়গার অভাব। দেশজুড়েই বেশি মুসলিম সমাগমের কারণে অনেক মসজিদ বন্ধ হয়ে গেছে।

এক হাতে তালি বাজে না- 

জার্মানীতে এই সমস্যাটা হুট করে সৃষ্টি হয়নি, এখানে কোন দৈবসংযোগও নেই। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই পঙ্গপালের মতো সেদেশের নাগরিকেরা ছুটেছে ইউরোপের দিকে। মানবিকতার খাতিরে ফ্রান্স কিংবা জার্মানীর মতো উন্নত দেশগুলো ঝুঁকি নিয়েই আশ্রয় দিয়েছে শরণার্থীদের। কিন্ত শরণার্থী যেকোন দেশের জন্যেই সমস্যার নাম। এদের মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসছে আইএসের ভূত, আত্মঘাতি হামলা হচ্ছে ফ্রান্স-জার্মানী-ইংল্যান্ডের পথেঘাটে, প্রাণ দিচ্ছে নীরিহ মানুষজন। তাদের ট্যাক্সের টাকায় খেয়েপরে জীবনধারণ করে ওদের ওপরেই হামলা চালানোটা সেসব দেশের নাগরিকেরা অবশ্যই মেনে নেবে না, নিচ্ছেও না। ফলে বাড়ছে হেট ক্রাইম। আর তার শিকার হচ্ছে অসহায় মুসলমানেরা। দু-চার-দশজন আততায়ীর কৃতকর্মের দায় নিতে হচ্ছে লাখো মানুষকে। এক জার্মানী দেশটাই আশ্রয় দিয়েছে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা নিজের দেশের কট্টরপন্থীদের কথা না শুনে অ্যাঞ্জেলা মার্কেল উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন সীমান্তের দুয়ার, সেই দেশে এখন কেন নামাজ পড়ার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না মুসলমানেরা, সেটা ভাবার সময় নিজেদের দিকেই প্রথমে আঙুলটা তোলা উচিত।

কবে সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান হবে!

এমএফআই’এর এই জমায়েতটা কিন্তু অনেক সুন্দর কিছূ শিক্ষা দেয়। এই যে একসাথে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনার প্রয়োজনে এখানে এসে নারী-পুরুষ এক সারিতে দাঁড়ায়, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনায় শামিল হয় এ এক চমৎকার ব্যাপার। এক ধর্মের প্রার্থনালয়ে অন্য ধর্মের মানুষের জমায়েত। এটা তো মানবতারই জয়গান।

কিন্তু এটা তো কোন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। ব্যাপারটা দীর্ঘসময় এরকম বিশৃঙ্খলভাবে চলতে পারে না। তাই, আহমেদ পোপাল এবং একরান ইনান এ দু’জন মানুষ মিলে সিটি কাউন্সিলকে বোঝানের চেষ্টা করছে তাদের নির্দিষ্ট জায়গা দেওয়া হোক। যে যায়গায় তারা শান্তিপূর্ণভাবে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারবে।

সিটি কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ অবশ্য তাদের কথায় তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। রাজনৈতিকভাবে তারা তাদের জনপ্রিয়তা হারাতে চাচ্ছে না সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কাছে। আবার তারা মুসলিম মৌলবাদ ছড়িয়ে পড়ার ভয়েও খানিকটা ভীত।

কে জানে কতদিন চলবে জার্মানিতে মুসলিমদের এই দৈনদশা! কবে সব ধর্ম পালনকারীরা কেবল মানুষ বলে সন্মান পেতে শিখবে! কতদিন পর সকল মানুষ তাদের নিজ নিজ ধর্ম আর বিশ্বাস শান্তিপূর্ণ ভাবে পালন করার অধিকার পাবে! আদৌ কি পাবে!

এমএফআই এর সংগঠক একরান ইনান এবং ইমাম আহমেদ পোপাল অবশ্য আপাতত এত কিছু নিয়ে ভাবছেন না। তারা শুধু একটা জায়গা চাইছেন মরিয়া হয়ে, যেখানে তারা একসাথে জমায়েত হয়ে কিছু সময় সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে পারবেন। কিন্তু কোন কুল-কিনারাই তারা করতে পারছেন না!

তথ্যসূত্র-

http://edition.cnn.com/interactive/2017/09/world/germany-mosques-cnnphotos/

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button