রিডিং রুমলেখালেখি

পুওরম্যান সিন্ড্রোম- ছোটবেলা থেকে যে রোগে আক্রান্ত আমরা প্রত্যেকেই!

বাইসাইকেল এবং বাইকের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। জনগণ মজলুমের পাশে দাঁড়াল। মজলুম হল বাইসাইকেলওয়ালা। বাইকারের নানা দোষ। হর্ণ দেয়নি, স্পীড বেশি ছিল। বাইকার ক্ষীণস্বরে বলছে, হর্ণ দিয়েছে। স্পীড কম ছিল। কাজ হয়নি। জনগণ মানছে না। সব দোষ অবশ্যই বাইকারের। হতেই হবে। জাজমেন্টে ভুল নেই।

বাইকারের সাথে এবার প্রাইভেটকারের অ্যাক্সিডেন্ট হল। দুই ড্রাইভারের তুমুল ঝগড়া। জনগণ মজলুমের পাশে দাঁড়াল। মজলুম হল বাইকার। কার ড্রাইভারের নানান দোষ। সে বাইকারকে সাইড দেয়নি। ড্রাইভার ক্ষীণস্বরে বলছে, বাইকার তো রংরুটে আসছে। তবুও সাইড দিছি। জনগণ ড্রাইভারের কথা কানে তুলছে না। তাদের জাজমেন্ট বলছে, সব দোষ জন্মগতভাবেই কারের ড্রাইভারের। কার-বাইক সংঘর্ষে অবধারিতভাবে দোষ হতেই হবে কারের।

উপরের দুটো সিনারিওতে যেসব জনগণ ‘দোষ কার হবে’- যুক্তি ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেয় তাদের বলা হয়- পুওরম্যান সিনড্রোমে (Poorman Syndrome) আক্রান্ত মানুষ। এটা মানসিক রোগ। সিনড্রোমের বাংলা প্রতিশব্দ- মানসিক দৈন্যতা।

তারা অকারণে সুদর্শন মানুষকে সহ্য করতে পারে না। ক্লাশের ফার্স্টবয়কে দেখলেই তারা ভেবে নেয়, এই ছেলে মারাত্মক অহংকারী। সুন্দরী বউ নিয়ে ঘোরা বরকে নানাবিধ বাজে সম্বোধন করে। যেমন- মেয়েটা সুন্দর অথচ বরটা কেমন কালো। পাতিলের তলার মতো।

বাইকারের দোষ থাকলেও এরা প্রাইভেটকারের ড্রাইভারকে দোষ দিবে। বাইসাইকেলের কিংবা রিক্সার দোষ থাকলেও এরা বাইকারকে গালিগালাজ করবে। এতে প্রচ্ছন্ন আনদ পায়। তাদের চোখে যে বেশি যোগ্য, যার বেশি সম্পদ, যার বেশি সম্পত্তি, যে বেশি সুখি, সেই হবে দোষী।

এরা মনে-মুখে প্রচন্ডরকম দৈন্যতার পরিচয় দিবে। এতে তাদের অর্গাজমিক আনন্দ হয়। আনন্দের উৎস দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ। ক্ষোভের উৎস অপ্রাপ্তি। হয়তো তার কার নেই, কার নিতে ইচ্ছে করে কিন্তু পারছে না। সামর্থ্য নেই। হয়তো তার বাইক নেই, বাইক নিতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পারছে না। হয়তো সে ক্লাশে ফার্স্ট হতে চায়, ফার্স্ট হতে পারেনি কিংবা পারবে না এজন্য ফার্স্টবয়ের প্রতি ধীরেধীরে একটা প্রচ্ছন্ন ঘৃণার পাহাড় গড়ে তুলেছে। হয়তো সুন্দর মেয়ের আকাঙ্খা ছিল, মেটে নি। হয়তো আর্থিক দুর্দশায় দিনকাল যাচ্ছে। এজন্য তার থেকে অধিক অর্জনের মানুষ অবধারিতভাবেই তার চোখে দোষী।

লোহা গরম হলে একসময় নিজের তাপ বায়ুমন্ডলে ছেড়ে দিয়ে শীতল হয়। পুওরম্যান সিনড্রোমের মানুষজন নিজের নিউরনে জমে থাকা ঘৃণা, রাস্তায় চলতে গিয়ে তারচেয়ে উচুশ্রেণির মানুষের উপর ঢেলে দিয়ে নিজের আত্মা শীতল করে। এই সিনড্রোম আছে বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মাঝে।

নিজেকে সুস্থ্য করার উপায় কী হতে পারে?

সাইকিয়াট্রিক কাউন্সেলিং এর দরকার নেই। একটা লিস্ট করে ফেলুন, কাদের দেখলে আপনার বেশি রাগ উঠে যায়। এবার তাদের নামের পাশে ডিটেইল লিখুন, কেন রাগ উঠে যায়? তাদের কী কী বেশি আছে, যেটা আপনার নেই। আপনার হয়তো নিজেকে বিশুদ্ধ মনে হবে। কিন্তু নিজের কাছে কনফেস করুন, দেখবেন ভালো লাগবে।

এবার লিস্ট দিয়ে কী করবেন? একটা ডেডলাইন ফিক্স করুন। যেটা অন্যদের আছে সেটা আপনিও অর্জন করবেন। সেটাই হতে হবে তাও নয়। হয়তো অন্য আরেকটা কিছু অর্জন করবেন। যেটার মূল্যমান অন্যদের ছাড়িয়ে যাবে। এতে নিজেরর জীবনের ধাপটা লাফিয়ে লাফিয়ে উপরেও উঠবে। আবার পুওরম্যান সিনড্রোম থেকে রোগমুক্তিও ঘটবে।

আপনি খেয়াল করবেন, আপনার যা কিছু ভালো, অনেকের চোখে সেসব খারাপ। আপনার সমালোচনা করে, গোপনে অন্যের সাথে হাসিতামাশা করে। যদি এমন ব্যাপার আপনার সাথে ঘটে তাহলে ভাববেন, আপনি সেই সমালোচক মানুষটার থেকে ভালো আছেন। আপনার যা আছে, তার তা নেই। তাই আপনার সমালোচনা করে। আপনাকে ছোট করে ঘুরে বেড়ায়। নিজের আত্মার দৈন্যতার অনুভূতিটা সবার মাঝে ঢেলেঢেলে নিজেকে শীতল করে। আপনি বরং একটু হাসুন। লোকটার কথা ভেবে একবার আফসোস করে বলুন- আহারে বেচারা!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button