ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

পুলিশকে প্রত্যাহার কিংবা ক্লোজড করা কি আমাদের স্রেফ বোকা বানানো?

পুলিশের একজন অসৎ কর্মকর্তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার কথা উঠলেই আপনারা প্রায়ই শুনে থাকবেন “ক্লোজড” করা হয়েছে কিংবা “প্রত্যাহার” করা হয়েছে। এই দু’টি শব্দ শুনতে শুনতে কানটা পচে গেছে, ইনফ্যাক্ট ঘেন্নাই ধরে গেছে এই দুই শব্দের প্রতি।

বাঙালকে বোকা বানাবার মোক্ষম শব্দগুলোর দুইটি হচ্ছে এই ক্লোজড বা প্রত্যাহার করা। বোকা বানার কথা বলছি এই কারনে যে, কখনো কোনো ঘটনার সময় একজন পুলিশকে যখন প্রত্যাহার বা ক্লোজড করা হয় তখন আমরা আনন্দে বড় আত্নহারা হয়ে যাই। মনে হয় একটা যুদ্ধ জয় করেছি। প্রাথমিকভাবে আমরা যেমন মনে করি যে আমরা জিতে গেলাম ঠিক একইভাবে প্রশাসনও বোঝে যে বাঙালকে ঠান্ডা করা গেছে এখন।

উপরের এই শব্দগুলো’র মানে দাঁড়ায় একটি অসৎ কর্মকর্তাকে আমি এক থানা থেকে সরিয়ে হয় অন্য থানায় দিলাম কিংবা পুলিশ লাইনের কোথাও তাকে একটি নিরাপদের স্থান করে দিলাম। সোনাগাজীতে অপঃকর্ম করা ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রত্যাহার করে খুব সম্ভবত পুলিশ লাইনে আনা হয়েছে। এই মামলা যখন স্থিমিত হয়ে যাবে আগামী ১ থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে তখন দেখা যাবে এই মোয়াজ্জেমকে সুন্দর করে কোনো অধিক মুনাফা সম্পন্ন এলাকায় কাজে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। মানে দাঁড়ালো এইসব প্রত্যাহার বা ক্লোজড হচ্ছে সিম্পলী আপনার চোখে ধুলো দিয়ে সাময়িক যে বৈরী পরিস্থিতি রয়েছে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা।

আজ পর্যন্ত যত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তার কতজনের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেই পরিসংখ্যান কি আমরা আদৌ জানি? কি করে তদন্ত হচ্ছে, কারা তদন্ত করছে, ফলাফল কি ইত্যাদি।

এই যে মিতু নামে এক পুলিশের কর্মকর্তার স্ত্রী খুন হোলো চট্রগ্রামে, সেই পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলকে যখন আবার সন্দেহ করা হলো স্ত্রীকে হত্যার ব্যাপারে, সেটির তদন্ত ফলাফল কি? কি হয়েছিলো বাবুলের? কে মেরেছিলো মিতুকে? এগুলোর একটিরও উত্তর আমরা পাইনি আজও।

সাম্প্রতিক সময়ে আমি ইংল্যান্ডে একটি মামলা ডিল করছি যেখানে আমার ক্লায়েন্ট হচ্ছেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার ভিকটিম। সেখানেও যে অসৎ পুলিশ কর্মকর্তাটি জড়িত ছিলো তাকেও দেখি ক্লোজ করা হয়েছে।

কিন্তু এই মামলা ডিল করতে গিয়ে দেখলাম সেই পুলিশের অফিসার বহাল তবিয়তে তার সকল ক্ষমতা বিরাজ করে বেঁচে রয়েছে এবং আমার ক্লায়েন্টকে নানা নাম্বার থেকে বিরক্ত করছে, হুমকি দিচ্ছে। তার বিরুদ্ধে যে তদন্তের কথা ছিলো সেটি তো হচ্ছেই না বরং পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তারা তাকে প্রটেকশন দিচ্ছে বলেই আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

এই যে গত মাসে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় এক তরুণীকেে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে দুই পুলিশ কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক সেকেন্দার হোসেন ও সহকারী উপ-পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম-কে যে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হোলো, সেটির ফলাফল কি? এরা দুইজন এখন কোথায়? তদন্তের ফলে কি তাদের শাস্তি হয়েছে নাকি নিরপরাধ প্রমাণিত হয়েছে?

৪ বছর আগে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের সাত সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। এ ছাড়া ঘটনা তদন্তে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছিলো, সেগুলোর রেজাল্ট কি?

এই বছরের জানুয়ারীতে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় থানা-হাজতে মহসিন (২৮) নামে এক আসামির মৃত্যুর ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে ডিউটি অফিসারসহ তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। তারা হলেন, ডিউটি অফিসার এএসআই গোলাম রব্বানী, পুলিশ কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন এবং এবাদুর রহমান। এদের তদন্তের ফলাফল কি? এরা কোথায় এখন?

২০১৮ এর জানুয়ারীতে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার এসআই নাজমুল হকসহ চার পুলিশকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এই প্রত্যাহারকৃত অন্য পুলিশ সদস্যরা হলেন- কনস্টেবল মনিরুজ্জামান, এইচএম এরশাদ ও ওলিয়ার রহমান। এদের এই প্রত্যাহারের পর তদন্তের ফলাফল কি? তাদের কি শাস্তি হয়েছিলো? অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিলো? তাদের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো?

এমন অসংখ্য প্রত্যাহারের সংবাদ আমরা একটি ঘটনা হলেই পাই বা জানতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রত্যাহার হয় লবডংকা আর কচু। পাব্লিকের রোষ থেকে বাঁচাতে প্রত্যাহার হচ্ছে পুলিশের একটা পুরোনো পদ্ধতি এবং এর কোনো জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে বলেও প্রশাসন কখনো মনেই করেনি।

আমার মনে হয় সময় এসেছে খুব জোরে আওয়াজ তুলবার। আজকের তরুণ প্রজন্ম সরকারের কাছে জানতে চাক, এইসব প্রত্যাহার দিয়ে কি হয়েছে? প্রত্যাহারের ফলাফলই বা কি হয়েছে? 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button