ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

প্রধানমন্ত্রী, আপনিও…

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার পর্বটি শুনলাম। সমসাময়িক এবং সামগ্রিক বাংলাদেশ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন এই সাক্ষাৎকারে। কথাগুলো শোনার পর থেকে কেমন বিভ্রান্ত লাগছে। বিশেষ করে আগ্রহ ছিলো, ডেঙ্গু সমস্যাটি নিয়ে তিনি কি ভাবছেন সেটা জানার। আশ্চর্য লাগলো একারণে যে, প্রধানমন্ত্রী আসলে নতুন কিছু বলেননি।

দেশে সিটি মেয়র, মন্ত্রীরা যা বলে বেড়িয়েছেন এই ডেঙ্গুর বিস্তারকে কেন্দ্র করে, প্রধানমন্ত্রী সেই সুরেই কথা বলেছেন। সাফাই দিয়েছেন মেয়রদের পক্ষে। বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের কারণে ঘটনা বেশি ছড়ায় বলেই মানুষ বেশি আতংকিত!

প্রধানমন্ত্রী আপনি বললেন, “সিটি কর্পোরেশন একেবারেই ব্যবস্থা নেয়নি কথাটা ঠিক নয়। ব্যবস্থা নিয়েছে।”

Image Source: BBC Bangla

অথচ, ডেঙ্গু বাহক এডিস মশা মারার কার্যকরী ঔষধটাই সিটি কর্পোরেশন এখন পর্যন্ত খুঁজে পায়নি। এখন ফিল্ড টেস্ট হচ্ছে। তারপর ঔষধ আনবেন। তারা তাহলে কি ব্যবস্থা নিয়েছে? প্রচলিত যে মশক নিধক কার্যক্রম, সেই ঔষধ তারা ছিটিয়েছে। এটা রুটিন কাজ। এই কাজকে কি বাড়তি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের আওতায় ধরা যাবে? তাছাড়া, এই ঔষধ কাজ করে কিনা সেটাও সিটি কর্পোরেশন খতিয়ে দেখার সময় পায়নি।

তাহলে কি ব্যবস্থা নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন? দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা কি আদৌ নিয়েছে যা দেখে বলা যায়, এই সিটি কর্পোরেশন তার নগরবাসীর জন্যে আসলেই খুব ভাবছে? বরং, শুরু থেকেই ডেঙ্গুকে অগ্রাহ্য করা, ডেঙ্গুর বিস্তারকে নাকচ করে দেওয়ার প্রবণতা আমরা দেখেছি। সমস্যাকে স্বীকারই না করলে কি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে একজন প্রশাসক?

প্রধানমন্ত্রী আপনি শুনেছেন কিনা, ডেঙ্গুর বিস্তার যখন বাড়ছে তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রজনন সক্ষমতার সাথে এডিস মশার প্রজনন সক্ষমতার জোড়া দিয়ে উদাহরণ দিলেন। এটা কি দায়িত্বশীল কোনো মানুষের ভাষা? আপনার এই মন্ত্রী তারপর চুপে চুপে বিদেশ গেলেন। সেই বিদেশ যাওয়ার খবর কেউ জানে না। সরকারি সফরও ছিলো না তবুও তিনি বিদেশ গেছেন, যেতেই পারেন। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে কেন একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে নেই, সেটা জানার আগ্রহ লোকের হতেই পারে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিডিয়ার চাপ, লোকের সমালোচনার তোপে যাত্রা সংক্ষিপ্ত করে দেশে আসলেন। কিন্তু তাকে বিদেশ যাত্রা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি দিলেন ধমক!

সাঈদ খোকন

একই সময়ে সাঈদ খোকন বলে বেড়িয়েছেন, “আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ডেঙ্গু নিয়ে আতংকের কিছু নেই।” বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে ছেলেধরার মতো গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজব কে ছড়াচ্ছে আসলে? মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, হাসপাতালে রোগীদের জায়গা ধরে না এমন অবস্থা। মানুষের অসহায়ত্ব। এসবকে গুজব মনে করলে মানুষের দূর্ভোগকে তাহলে মিথ্যা বলা ছাড়া উপায় নেই। সেই সাঈদ খোকন অবশ্য পরে এসে বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। যদিও তিনি মনে করেন না, সিটি কর্পোরেশন ভুল পথে আছে। কোনো ভুল করেছে। শুরু থেকেই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হওয়া কি ভুল নয়? অবশ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা এখন জানলাম, আপনিও মনে করেন সিটি কর্পোরেশন ব্যবস্থা নিয়েছে ঠিক সময়ে!

প্রধানমন্ত্রী, যাদের এই সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ করার কথা, তারা এই সময়ে কি ভূমিকা রেখেছে এই তথ্যগুলো কি সত্যিই আপনি পেয়েছেন নাকি আপনার কাছ থেকে লুকানো হয়েছে কিংবা সব জেনেও আপনি এদের সমর্থন করলেন?

আমরা জানি এবং মিডিয়ায় আপনার মন্ত্রীদের মারফতই শুনে থাকি , দেশে কোনো দূর্যোগে, সংকটময় মুহূর্তে আপনার রাতে ঘুম হয় না। আপনি দেশে থাকেন বা বিদেশে থাকেন, সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে থাকেন পরিস্থিতি। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে দেশবাসীর জন্য দোয়া চান।

ডেঙ্গু ইস্যুটি নিয়েও তাই আপনি সংবেদনশীল ভাবনা ভেবে থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, বিবিসির সাক্ষাৎকারে আপনি একবারও উচ্চারণ করলেন না, এমন পরিস্থিতিতে কারো গাফিলতির প্রমাণ পেলে আপনি ব্যবস্থা নেবেন। আপনি বললেন না, ত্রুটি থাকতে পারে, আমরা সেই ত্রুটি দূর করতে সচেষ্ট। বরং, আপনি প্রত্যেকটা প্রশ্নে ভীষণভাবে আড়াল করতে চাইলেন দায়িত্বপ্রাপ্তদের অদক্ষতা, অবহেলা, ত্রুটি, দুর্নীতির অভিযোগগুলো।

মশার ঔষধ কেনা নিয়ে দুর্নীতি – এই প্রশ্নেও আপনি বললেন না, কেউ দুর্নীতি করলে বিচার হবে। ডেঙ্গু নিয়ে কেউ তামাশা করলে ছাড় দেয়া হবে না। আপনি বোঝালেন, টেন্ডার হয়। যারা পায়, তারা ঔষধ আনে…

আপনি বললেন, সিটি কর্পোরেশন সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের দোষ দিলে হবে না। মানুষকেও সতর্ক হতে হবে।

অথচ, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবার কিছুটা বিস্তার লাভ করতে পারে এমন আগাম সতর্কতা কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে জানিয়েছে। নগর কর্তৃপক্ষ কিংবা স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই এই সতর্কতা সম্পর্কে অবগত ছিলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি একটু বিবেচনা করে দেখুন, আগাম সতর্কতা দেয়ার পরও যখন ডেঙ্গু এভাবে ছড়িয়েছে সেই দায় কি সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এড়াতে পারে? তারা যদি আগাম সতর্কতা জেনে আগাম ব্যবস্থা নিতো, তাহলে এখনো মশার ঔষধ কার্যকর কি অকার্যকর এই বিতর্কে পড়ে থাকতে হতো না। আজকে এখন সব মহল নিজেদের দায় এড়াতে বলে যাচ্ছেন, নাগরিক সচেতনতার কথা ; বলছেন জনগণকে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। কেনো এই সমন্বিত সচেতনতার প্রচার কি বর্ষার আগে চালানো যেতো না? আগে ভাগেই জনগণকে বার্তা দেয়া যেত না?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আজ এতোদিন পর এসে বললেন, গত বছরের তুলনায় এইবছর তিনগুণ বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। সেই অনুপাতে তিনগুণ ব্যবস্থা কি নেয়া হয়েছিলো? বরং শুরু থেকেই নগরপিতা সহ স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা বলেছিলেন, সব স্বাভাবিক। সব ম্যানেজ হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী, আপনিই বলুন, এটা কি কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণের মধ্যে পড়ে?

প্রধানমন্ত্রী আপনি বলেছেন, “প্রতিটি মানুষের বাসায় গিয়ে টবের জমানো পানি ফেলে আসা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু ওষুধেই ওইসব লার্ভা ধ্বংস করা যাবে না। এটা করতে হলে সবাইকে নিজে থেকেই সচেতন হতে হবে।

কারো ঘরের কাছে বা ঘরে কোথাও যদি পানি জমা থাকে এবং সেখানে মশার লার্ভা তৈরি হয়, তাদের জরিমানা করা হবে। মানুষ যদি আগামীর জন্য প্রস্তুত থাকে, তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি হবে না।”

ভবিষ্যতের জন্য আগাম প্রস্তুতি মানুষ নিশ্চয়ই নিবে কিন্তু সিটি কর্পোরেশন, মন্ত্রণালয় এবং সরকারের আগাম কোনো পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিলো কিনা সেটা আপনি বললেন না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আপনি কি জানেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি বলে? বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বল‌ছে, এডিস মশা সবচেয়ে বেশি থাকে সরকারি পরিবহন পুলে। এর পরপরই এডিস থাকে হাসপাতালের নিচে খোলা জায়গায়, ছাদে, পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রে। সরকারি অফিসগুলোতে এডিস মশা বেশি। তাই শুধু জনগণের উপর সচেতন হবার দায় দিয়ে কারোই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।

তাছাড়া, জনগণকে কারা সচেতন করবে? কারা দেশ পরিষ্কারে নামবে? আপনি নির্দেশ দিয়েছেন, দলের নেতা কর্মীরা পরিষ্কার অভিযানে নামবে। প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে একটা অনুরোধ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান যদি আপনার তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের মতো হয়, তাহলে এমন অভিযান করে বিড়ম্বনা না করাই ভাল। হাছান মাহমুদ চলচ্চিত্র অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে পরিষ্কার রাস্তায় ঝাড়ু দিয়ে সাফ করার যে অভিনয় করেছেন এমন তামাশা জনগণ এই সময়ে হজম করতে পারে না।

জনগণকে সচেতন করার নামে যেসব চলচ্চিত্র কুশলীরা এই নাটকে নাম লিখিয়েছেন, তাদেরকে বরং সত্যিকার অর্থে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে বলুন। সব কিছুকে সিনেমার স্ক্রীপ্ত ভাবা ঠিক না। মানুষ শিখবে কার কাছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান ক্যাম্পাস পরিষ্কার করার অভিনয় করতে ভালো রাস্তায় ফেলা ময়লা কুড়িয়েছেন। তিনি আসার আগে পরিষ্কার রাস্তায় ময়লা ফেলা হয়, যেন তিনি এসে সেই ময়লার দুই এক টুকরা কুড়িয়ে ফটোসেশন করতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী, এই তথ্যগুলো কি আপনার কাছে যায় না? আপনার মনিটরিং প্রক্রিয়ায় কি এগুলো ধরা পড়ে না? প্রধানমন্ত্রী যে মা নিজের ডেঙ্গুতে পুত্রকে হারিয়ে এখন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কন্যাকে নিয়ে বাঁচার লড়াই করছেন তার কান্না কি আপনার মেয়র মন্ত্রীরা আদৌ বুঝে? তারা বোঝে না বলেই তারা তামাশা করতে পারে। তারা ম্যাজিশিয়ান না। রাতারাতি কোনো কিছু তারা বদলাবে এই আশা কেউ করে না। কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্য আমাদের, মানুষের দূর্ভোগে, কষ্টে, বিপদে, দুঃসময়ে, মৃত্যুতে তারা সমব্যথী না। এই জন্যেই তারা এতো সমালোচিত। এই জন্যে তাদের পদত্যাগের দাবি উঠেছে।

আপনি এই লোকগুলোর পক্ষ নিয়েই কথা বলে গেলেন পুরোটা সময়। আমরা জানি না, স্বজন হারানো কিংবা হাসপাতালের বিছানায় অসুখে কাতর রোগীর স্বজনদের রাতে ঘুম হয় কিনা। তারা কি খুব নিঃসঙ্গ বোধ করে কিনা। এই নগরপিতা, এই মন্ত্রী যারা মানুষের মৃত্যুকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করে, যারা মানুষের ব্যাথাকে অগ্রাহ্য করে তাদের পক্ষে আপনিও কথা বলবেন, এটা হয়ত ভুক্তভোগী এই নগরের মানুষ বর্তমান অবস্থায় আশা করেনি।

আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেই মানুষ আশ্চর্য হলো বেশি। ভাবছি, বঙ্গবন্ধু এইরকম পরিস্থিতিতে হয়ত মানুষকে কি বলতেন? হয়ত জনগণকে সচেতন হবার কথা বলার পাশাপাশি প্রশাসনের সব অদক্ষদের সতর্ক করতেন, মনে করিয়ে দিতেন কার কি দায়িত্ব জনগণের প্রতি। হয়ত, বলতেন যাদের করের টাকায় তোমার বেতন হয় তাদের সেবা হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। যেটা আজ অনেকেই ভুলে বসে আছে…

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button