সিনেমা হলের গলি

জোয়াকিন ফিনিক্স, ইউ জাস্ট নেইলড ইট!

তারপর পুরো একটা রাত আর দিন কেটে গেল, অথচ আমি আর্থার ফ্লেক নামের চরিত্রটার অদ্ভুতুড়ে মোহ থেকে বেরুতে পারলাম না। দুটো ঘন্টাজুড়ে যে চরিত্রটা মগজ আর মনের ওপর অকথ্য অত্যাচার করে গেল, নিজের যন্ত্রণার ভাগীদার হতে বাধ্য করলো, তাকে কি এত সহজে ভোলা যায়? আর্থার ফ্লেক থেকে জোকারে রূপান্তরিত হবার যে জার্নিটা পর্দায় উপস্থাপন করলেন জোয়াকিম ফিনিক্স নামের রক্ত-মাংসের মানুষটা, মেথড অ্যাক্টিঙের ভক্ত হয়ে থাকলে এমন পারফরম্যান্সের সাক্ষী হবার পরে রাতের ঘুম উড়ে যাওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়।

মিথলোজির কাল্পনিক এক পাখি ফিনিক্স, ধ্বংসস্তুপ থেকে ডানা মেলে যে উড়ে চলে, নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখায়। সেই পাখির সঙ্গে মিলিয়ে সন্তানদের নাম রেখেছিলেন বাবা-মা। জোয়াকিম ফিনিক্স তার নামের মর্যাদা রাখলেন, আক্ষরিক অর্থেই তিনি উড়ে বেড়ালেন পর্দাজুড়ে। টোড ফিলিপসের জোকারে তিনি পুরোটা সময় জুড়ে শুধু মন্ত্রমুগ্ধতা ছড়ালেন, অভিনয় দেখে মুখ থেকে আপনা-আপনিই বেরিয়ে এলো- ‘ইট ওয়াজ অ্যা মাইন্ডব্লোয়িং এক্সপেরিয়েন্স!’

ফিনিক্সকে যখন জোকারের চরিত্রের জন্যে বাছাই করা হয়েছিল, তখন কম কথা ওঠেনি। জোকার চরিত্রটাকে কাল্ট ক্যারেক্টারে পরিণত করেছিলেন হিথ লেজার, ক্রিস্টোফার নোলানের দক্ষ পরিচালনা আর হিথ লেজারের হাড়ভাঙা খাটুনী মিলে ঐতিহাসিক একটা রূপ নিয়েছিল, লেজারের অস্বাভাবিক মৃত্যু দর্শকের মনে জোকারকে চিরস্থায়ী একটা আসন তৈরি করে দিয়েছে আরও ভালোভাবে।

জোকার ক্যারেক্টারটাই স্পেশাল কিছু, দুনিয়াজুড়ে লাখো ভক্ত আছে জোকারের, একটু উনিশ থেকে বিশ হলেই সর্বনাশ!তার ওপরে জোকারের নাম শুনলেই হিথ লেজারের সেই অবয়ব চোখে ভাসে শুধু। এমন একটা চরিত্রকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে গেলে বারবার তুলনা করা হবে লেজারের সঙ্গে, কারণ হিথ লেজার আর জোকার তো দুটো সমার্থক শব্দ। ফিনিক্স নিজেও সেটা জানতেন, তাকে শুধু ভালো অভিনয় করলেই হবে না, ভাঙতে হবে লোকের মনে আগে থেকে সেট করে রাখা অনেকগুলো প্যাটার্নকেও!

সেই মিশনে নেমে ফিনিক্স যেটা করেছেন, সেটাকে ‘ওয়ান্স ইন অ্যা লাইফটাইম’ পারফরম্যান্স বললে ভুল হবে না খুব একটা। মনে দাগ কেটে যাওয়া এমন দুর্দান্ত অভিনয় কালেভদ্রে চোখে পড়ে। হতাশা, ক্রোধ, যন্ত্রণা, গ্লানি- সব এত চমৎকারভাবে নিজের ভেতরে ধারণ আর্থার ফ্লেকের করেছেন মানুষটা, দুটো ঘন্টা মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকা যায় পর্দার দিকে। পর্দাজুড়ে তার প্রভাবশালী বিচরণ, বাকীসব যেন জড়বস্তু! হতাশ মানুষটার চোখের শূন্য দৃষ্টি, অপমানের গ্লানি, প্রতিশোধপরায়ণ এক প্রতিমূর্তির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চোয়াল- একেকবার একেক অবতারে হাজির হয়েছেন, অজান্তেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছে বারবার!

আর্থার থেকে জোকারে ট্রান্সফরমেশনের ওই সময় যে অভিনয়টা করেছেন জোয়াকিন ফিনিক্স, সেটা দর্শক ভুলতে পারবে না অনেকদিন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার ক্রুর হাসিটা মনে ভয় জাগিয়েছে, সেইসঙ্গে জন্ম দিয়েছে কৌতুহলের। প্রেডিক্টেবল ঘটনাগুলোও উপভোগ করে দেখেছি শুধু ‘জোকার এটা কিভাবে করবে’ এই আগ্রহ থেকে। সিঁড়ির গোড়ায় নাচতে থাকা ক্লাউন কিংবা মেন্টাল অ্যাসাইলেমের সেই বন্দী আসামী; অথবা বিপ্লবী জনতার ভীড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রেভ্যুলেশনের প্রতীক হয়ে যাওয়া জোকার- প্রত্যেকটা জায়গায় ফিনিক্স ছিলেন দুর্দান্ত, কিংবা তারও অনেক বেশি কিছু!

একটা জায়গায় আর্থার ফ্লেক চেষ্টা করছে তার জুতোটা প্রাণপণে টেনে বড় করার, সমাজের চোখে বেমানান হয়ে থাকতে থাকতে অতীষ্ট হয়ে যাওয়া একটা মানুষের টিকে থাকার অসহ্য লড়াইটাই যেন ফুটে উঠেছে ছোট্ট সেই দৃশ্যে। পুরো সিনেমায় অভিনয় দিয়েই এভাবে অজস্রবার গায়ে কাঁপুনি তুলে দিয়েছেন ফিনিক্স, তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছে সিনেমার লাইটিং এবং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। চাকরি হারিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেয়ালের ‘ডোন্ট ফরগেট টু লাফ’ থেকে ‘ফরগেট টু’ অংশটা কেটে বাক্যটাকে ‘ডোন্ট লাফ’ বানিয়ে দেয়াটাই অদ্ভুত গুজবাম্প এনে দিয়েছে শরীরে!

হিথ লেজারের সঙ্গে জোয়াকিন ফিনিক্সকে তুলনা করতে গেলে দুজনের এফোর্টের প্রতিই অবিচার করা হবে বোধহয়। হিথের জোকার মনে ভয় জায়গায়, আতঙ্কের শিহরণ তোলে; আর ফিনিক্সের জোকার তার প্রতি একটা মায়ায় বাঁধা পড়তে বাধ্য করে। এটকু বলতে পারি, হিথ নিজে যদি জোকারের ব্যাটনটা কারো হাতে তুলে দিতে চাইতেন, সেটার জন্যে জোয়াকিন ফিনিক্সের চাইতে উপযুক্ত কেউ আর হতে পারতেন না, এটা নিশ্চিত! শুধু পাগলাটে ওই হাসিটার জন্যেই ফিনিক্সকে লেটার মার্ক দেয়া যায়, বাদবাকী নম্বরের কথা বাদই দিলাম! চেপে রাখা বেদনা যে হাসিতে ফুটে ওঠে, কষ্টগুলো দাবানল হয়ে বন্দুকের গুলির মতো বেরোয় যে হাসির শব্দে, সেটাকে অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য তো আমাদের নেই!

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে কেন আট মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভিয়েশন পেয়েছিল সিনেমাটা, সেটা জোয়াকিন ফেলিক্সের অভিনয় দেখলে বুঝে নিতে কষ্ট হয় না মোটেও। এর আগে দুইবার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড মিস করা এই ভদ্রলোক যদি এমন পারফরম্যান্সের পরেও এবছর অস্কারটা না পান, আমি অন্তত ভীষণ হতাশ হবো…

আরও পড়ুন- জোকার রিভিউ: দেখে না কেউ, হাসির শেষে নীরবতা…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button