খেলা ও ধুলা

কে বলেছে পেনাল্টি শ্যুটআউট ভাগ্যের খেলা?

পেনাল্টি শ্যুটআউট এমনই একটি জিনিস যার মাধ্যমে ফুটবলে ছোট দল ও বড় দলের ব্যবধান অনেকটাই ঘুচে যায়। চলতি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে মোট ৮টি ম্যাচের মধ্যে তিনটি খেলা গড়িয়েছে পেনাল্টি শ্যুটআউটে। তার মধ্যে দুইটিতে ফেবারিট ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়া জয় পেলেও, অঘটনের শিকার হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ২০১০ বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী দল স্পেন। এ ধরণের ফলাফলের জন্ম দেয় বলেই পেনাল্টি শ্যুট আউটকে বলা হয় লটারি কিংবা ভাগ্যের খেলা।

স্পেন কোচ ফার্নান্দো হিয়েরো তাই রাশিয়ার কাছে হেরে যাওয়ার পর পেনাল্টিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আ লোটারিয়া!” ঠিক এমনই ক্রোয়েশিয়ার কাছে হারের পর ডেনমার্ক অধিনায়ক সাইমন কায়েরের মুখেও উচ্চারিত হয়েছে, “পেনাল্টি হলো লটারির মত”। আর সেই একই অভিব্যক্তি প্রতিধ্বনিত হয়েছে দলের কোচ আগে হারেইদের মুখেও, “হ্যাঁ, এটি একটি লটারি।”

পেনাল্টি শ্যুট আউট, স্পেন-রাশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপ

কিন্তু পেনাল্টিতে হেরে যাওয়ার পর ভাগ্যকে দোষারোপ করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? আসলেই কি পেনাল্টিকে লটারি বা ভাগ্যের খেলা বলা যায়? আপাতদৃষ্টিতে উত্তরটিকে ‘হ্যাঁ’ বলে মনে হলেও, একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই আমরা নিজেদের ভুলটি বুঝতে পারব। আমরা উপলব্ধি করতে পারব, পেনাল্টি ভাগ্যের খেলা তো নয়ই, বরং ফুটবলের অন্য যেকোন অংশের মত এটির সাথেও জড়িয়ে আছে অনেক কৌশল, অনেক পূর্ব-পরিকল্পনা, অনেক প্রস্তুতি।

এতদিন পেনাল্টিকে সবচেয়ে বেশি অভিশাপ দিত যে দলটি, সেটি হলো ইংল্যান্ড। ১৯৯৬ ইউরো থেকে শুরু করে বিগত ২২ বছরে পাঁচটি মেজর টুর্নামেন্ট থেকে তারা বিদায় নিয়েছে পেনাল্টি শ্যুট আউটে পরাস্ত হওয়ার মাধ্যমে। অপরদিকে জিততে পারেনি একটিতেও। অথচ সেই তারাই এবারের বিশ্বকাপে এসে পেনাল্টির গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্তি পেয়েছে। কলম্বিয়াকে তারা হারাতে সক্ষম হয়েছে এই পেনাল্টি থেকেই।

তবে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোকপাতের আগে, চলুন ফিরে যাই ১৯৯৮ সালে। সে বছর বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড কোচ গ্লেন হোডল তার শিষ্যদেরকে বলেছিলেন, পেনাল্টি অনুশীলনের কোন প্রয়োজনই নেই। কারণ প্রকৃত ম্যাচের পরিস্থিতিতে পেনাল্টিকে কেন্দ্র করে যে টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, অনুশীলনে তেমন পরিস্থিতি তৈরী করা অসম্ভব। তাই পেনাল্টি নিয়ে যত কাজই করা হোক না কেন, কোন লাভ নেই।

এ যেন ঠিক সেই ছাত্রটির মত চিন্তাধারণা, যে পরীক্ষার আগের রাতে ভেবেছে যে পরীক্ষায় তো কোন প্রশ্নই কমন পড়বে না, তাহলে খামোকা পড়াশোনা করে লাভ কী! হোডল কিন্তু তার এমন মানসিকতার ফলাফল হাতেনাতেই পেয়েছিলেন সেবার। কোন প্রস্তুতি না থাকার ফলে, এই পেনাল্টিতে হেরে গিয়েই সেবারের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় তার দলকে।

এখানেই ইংল্যান্ডের বর্তমান কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের সাথে তার পূর্বসূরীদের পার্থক্য। সাউথগেট এমন একজন ব্যক্তি যিনি তার খেলোয়াড়ি জীবনে খুব উল্লেখযোগ্য কিছু করে দেখাতে পারেননি। বরং তিনি পরিচিতই হয়ে আছেন পেনাল্টি মিসের কারণে। ১৯৯৬ ইউরোয় জার্মানির বিপক্ষে তার করা পেনাল্টি মিসের কারণেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ইংলিশদের। অথচ কোচ হিসেবে সেই তিনিই উল্টে দিয়েছেন পাশার দান। আর তার পেছনে অবদান রয়েছে পেনাল্টির ব্যাপারে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার।

সাউথগেট তার পূর্বসূরীদের মত পেনাল্টিকে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়ার পক্ষপাতী নন। বরং বিশ্বকাপে আসার আগে তিনি দলের সাথে পেনাল্টির ব্যাপারে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজ করেছেন। রাতের পর রাত এ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। আর অনুশীলনের সময় শিষ্যদেরকে একেকজন পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ করে তোলার প্রচেষ্টায় বিন্দুমাত্র আপোষ করেননি।

পেনাল্টি শ্যুট আউট, ইংল্যান্ড-কলম্বিয়া, সাউথগেট, ২০১৮ বিশ্বকাপ

এবং তার এই কঠোর পরিশ্রমের প্রতিফলন আমরা দেখতে পেয়েছি কলম্বিয়ার বিপক্ষে রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচে। কলম্বিয়া, ডেনমার্ক কিংবা স্পেনের মত দলগুলোর কোচদেরকে আমরা দেখেছি অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষ হলে তারা প্রতিটি খেলোয়াড়ের কাছে গিয়ে জানতে চাইছেন, পেনাল্টি নিতে সে ইচ্ছুক কি না! অর্থাৎ এ যেন স্বেচ্ছায় রক্তদান বা মরণোত্তর চক্ষুদানের মত ব্যাপার। দিলে ভালো, কিন্তু না দিলেও কোন ক্ষতি নেই! তবে সাউথগেটকে এমনটি করতে দেখা যায়নি। তার কাছে আগে থেকেই একটি তালিকা করা ছিল যে তার দলের সেরা পেনাল্টি টেকার কারা, আর সে অনুযায়ী তিনি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন যে কার পরে কে শট নিতে যাবেন।

শুধু এখানেই শেষ নয়। পেনাল্টি টেকারদের পাশাপাশি তিনি বিশেষভাবে কাজ করেছেন গোলরক্ষকদের সাথেও, যারা কিনা পেনাল্টি শ্যুট আউটে জয়ের প্রধান অস্ত্র। কলম্বিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি শুরুর আগে আমরা দেখতে পেয়েছি, ইংল্যান্ডের এক গোলকিপিং কোচ জর্ডান পিকফোর্ডের হাতে এমন একটি পানীয়ের বোতল তুলে দেন, যার গায়ে কলম্বিয়ার কোন খেলোয়াড় কীভাবে পেনাল্টি কিক নেয় সে ব্যাপারে বিস্তারিত লেখা রয়েছে। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন, খেলা শুরুর আগেই প্রতিপক্ষের পেনাল্টি টেকারদের শক্তিমত্তা আর দুর্বলতার বিষয়ে তারা ঠিক কতটা গবেষণা চালিয়েছে!

পেনাল্টি শ্যুট আউট, ইংল্যান্ড-কলম্বিয়া, সাউথগেট, ২০১৮ বিশ্বকাপ

একই সাথে পেনাল্টি যে মনস্তত্ত্বের লড়াই, সেই বিষয়টিও ভোলেননি সাউথগেট। তাই ইংল্যান্ড-কলম্বিয়া পেনাল্টি শ্যুট আউটের সময় আমরা সাক্ষী হয়েছি এমন কিছু দৃশ্যের, যেগুলো সচরাচর দেখা যায় না। যখনই কোন ইংলিশ খেলোয়াড় কিক নিতে এসেছেন, পিকফোর্ড দৌড়ে এসেছেন তাকে অভিবাদন ও শুভকামনা জানাতে। সেই কিকারের হাতে বলটিও তিনি নিজ হাতে তুলে দিয়েছেন। খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্তু এতেই না জানি কতটা মনোবল বেড়ে গেছে ওই ইংলিশ কিকারদের! এবং জর্ডান হ্যান্ডারসন যখন তৃতীয় কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন, তখন তার সকল সতীর্থরা এগিয়ে আসেন তাকে সান্ত্বনা জানাতে। কিন্তু সেটিও খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য, যাতে করে তার সতীর্থদের মাঝেও হতাশা ছড়িয়ে না পড়ে।

এভাবেই পেনাল্টি থেকে জেতার ক্ষেত্রে শতভাগ প্রস্তুতি নিয়েছেন সাউথগেট, এবং তার ইতিবাচক ফলও তিনি পেয়েছেন। তার পূর্বসূরীরা এই প্রস্তুতিহীনতার কারনেই কখনও জিততে পারেননি পেনাল্টি, আর হারের পর দুষেছেন ভাগ্যকে। অথচ সাউথগেট প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রস্তুতি যদি ভালো থাকে তবে ভাগ্যকেও হারিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু হ্যাঁ, কলম্বিয়ার প্রস্তুতি যদি ইংল্যান্ডের চেয়ে ভালো থাকত, সেক্ষেত্রে তারাই হয়ত জয়ের হাসি হাসতে পারত।

পেনাল্টি শ্যুট আউট, ইংল্যান্ড-কলম্বিয়া, সাউথগেট, ২০১৮ বিশ্বকাপ

দিনশেষে সার কথা ওই প্রস্তুতিই। পেনাল্টিতে জিততে চাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। তা কৌশলগত দিক থেকে যেমন, ঠিক তেমনই মানসিক দিক থেকেও। একমাত্র যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমেই সম্ভব পেনাল্টি শ্যুট আউটে জেতা। এটিকে তাই লটারি বা ভাগ্যের খেলা বলে অভিহিত করার কোন যৌক্তিকতাই নেই।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button