টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

পেপ্যাল না আসলে কার সুবিধা, কার অসুবিধা?

প্রথমত,  Paypal কি?

Paypal সারাবিশ্বে বহুল ব্যবহৃত অনলাইন মানি ট্রান্সফার সিস্টেম যা অত্যন্ত দ্রুত এবং সিকিউরড একটা সার্ভিস। এটি সারা বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে সচল এবং ২৫ টা কারেন্সি সাপোর্ট করে, এমনকি আফগানিস্তানেও আছে। কেবল আমরাই অভাগা যেখানে পেপ্যাল নেই। এমন না যে পেপ্যাল নিজে থেকে আসতে চায় না, তারা আসতে চায়। এখানে আসলে তাদের লাভ, লাভ অনলাইনে বিজনেস করে এরকম যেকোন বাংলাদেশির! কিন্তু পেপ্যাল আসলে এদেশের ভুঁইফোঁড় আমলা ও নিজ উদ্দেশ্য হাসিল করতে আসা রাজনৈতিক নেতাদের লস, মূলত তাদের অসহযোগিতার কারণে পেপ্যাল বাংলাদেশে আসতে পারে না। এটা আমার কথা না, পেপ্যালের ভেতরকার কথা, এবং সেটা আমি প্রমাণ করতে পারব চাইলে।

যাই হোক, অনলাইনে যারা কাজ করছি, তারা সকলেই জানি পেপ্যাল আমাদের জন্য কতটা দরকার। একটা পেইড কোর্স কিনতে গেলে আমাদেরকে কত ধকল সামলে ডলার যোগার করতে হয়, ডোমেইন-হোস্টিং কেনার সময় হ্যাপা পোহাতে হয়, অনলাইনভিত্তিক কোন সার্ভিস কিনতে গেলেও হ্যাপা পোহাতে হয়, যেহেতু বাংলাদেশ থেকে ইজি পেমেন্ট সিস্টেম নেই। কেন ডুয়াল কারেন্সি কার্ড আছে না? জি আছে, তবে আপনি চাইলেই ডুয়াল কারেন্সি ব্যাঙ্ক থেকে ইস্যু করতে পারবেন না, আপনার মাসে ভালো বেতন থাকা লাগবে, খরচ করার সামর্থ্য থাকা লাগবে, ব্যাঙ্কে মিনিমাম ৫০,০০০ হাজার টাকা রাখতে হবে, তা থেকে আপনি ৮০% টাকা খরচ করতে পারবেন। বেশিরভাগ ব্যাংকেই একই নিয়ম। তাই আমজনতা ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের দিকে এগোতে পারে না।

যেখানে সরকার এবং এর অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো জনগণকে সহজে এবং সুলভে সার্ভিস প্রদান করা, সেখানে তারা সবসময় এর উল্টোটা করে আসছে, সেটা যে সরকারই হোক। আবার আপনি টাকা দিতে পারেন, সেই মাপের ব্যবসায়ী (ভালো এবং মন্দ অর্থে) এবং তেল দেয়ার অভ্যাস আছে তো আপনার জন্য দুনিয়ার সব সার্ভিস! বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দেশের টাকা বাইরে পাঠানো যাবে না । কিন্তু আনা যাবে! তাদের ভাষ্যমতে অনলাইন মানি ট্রানজেকশন বিশেষ করে পেপ্যালের মতো সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের মানুষজন দেশের মূল্যবান অর্থ দেশের বাইরে পাচার করবে, অথবা এ ধরনের ঝুঁকি আছে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে টাকা যা পাচার করার সরকারের নেতা-নেত্রী, তাদের আত্মীয়-স্বজন, দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়িকগোষ্ঠীই বেশি করে থাকে, অতীতে আমরা তাই দেখে এসেছি এবং ভবিষ্যতেও দেখবো বলে আশা রাখি।

আবার আসি পেপ্যাল এবং পেপ্যালের জুম সার্ভিস নিয়ে। যখন বাংলাদেশে ইন্টারনেটের অত প্রসার হয়নি, তখন আমরা বিদেশে থাকা আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের পাঠানো র‍্যামিটেন্স কিভাবে সংগ্রহ করতাম? ওয়েস্টার্ন ইউনিউন। এখনো করি অনেকে। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ছাড়াও বাংলাদেশে আরো এরকম সার্ভিস চালু আছে যেমন মানিগ্রাম, রিয়া, ক্লিঙ্ক, এক্সপ্রেস মানি সহ আরো বেশ কিছু সার্ভিস। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে এরকম আরেকটি সার্ভিস চালু হয় যার নাম Xoom .

মজার ব্যাপার হচ্ছে Xoom কিন্তু বাংলাদেশে ২০১৫ থেকে না, সেই ২০০৩ থেকে আছে ( Xoom এর যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে এবং পেপ্যাল এই সার্ভিসটি ২০১৫ সালে কিনে নেয় ১.০৯ বিলিয়ন ডলারে)! সেই সময় তারা অনলাইন টু অফলাইন মানি ট্রানজেকশন সার্ভিস দিতো ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ নামে লোকাল ডিস্ট্রিভিউটর দিয়ে, যার আসল মালিক ইন্ডিয়ান The Patel Group। কিন্তু লো ট্রানজেকশন ভলিউম হওয়ায় জুলাই মাসের ১৬ তারিখ, ২০০৮-এ তারা শ্রীলঙ্কা , বাংলাদেশ, মরক্কো, নেপাল থেকে সার্ভিস গুটিয়ে নেয়। পরে জুম-কে কিনে নেয় পেপ্যাল।

তো এই জুম নতুন করে আলোচনায় আসে যখন আমাদের সবার প্রিয় মাননীয় আইসিটি প্রতিমন্ত্রী কিছু দিন আগে সাংবাদিকদের জানান যে পেপ্যাল বাংলাদেশে অফিশিয়ালি চালু হবে ১৯ অক্টোবর। তিনি এও বলেন, পুরো কার্যক্রম নভেম্বর থেকে শুরু হলেও উনারা আগেই উদ্বোধন করবেন। উনার কথায় আমরা আশান্বিত হই, এবার বোধহয় পেপ্যাল এলো! ঘোর অবিশ্বাসীরাও এবার বিশ্বাস করতে থাকে যে পেপ্যাল এলো বলে! সেই আশায় গুঁড়ে বালি, যখন বাংলাদেশের আইসিটি ডিভিশন থেকে বিভিন্ন আইসিটি প্রফেশনালদের ইমেইলে ১৯ তারিখের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় এবং সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয় ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশে “Xoom – A Paypal Service” উদ্বোধন করা হবে ।

আস্তে আস্তে মানুষ জানতে শুরু করে এই কাহিনী। সবার মনে একই প্রশ্ন, যে সার্ভিস ২ বছর ধরে বাংলাদেশে আছে, সেটাকে নতুন করে উদ্বোধন করার কারণ কি? তার উপর এটা জুম, পেপ্যাল তো না! এরকম অবস্থায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ১৭ অক্টোবর সকালে একবার ইংরেজিতে এবং বিকালে বাংলায় ব্যাখ্যা দিলেন যে পেপ্যাল উদ্বোধন করা হবে নাকি জুম! উনার কথায় সেটা পরিষ্কার যে ১৯ তারিখ জুম নতুন করে উদ্বোধন করা হবে। তার উপরে তিনি বলছেন, জুম পেপ্যালের সার্ভিস, জুম চালু হওয়া মানে পেপ্যাল চালু হওয়া! এদিকে অনলাইন কমিউনিটির প্রফেশনালরা পেপ্যালে মেইল করতে শুরু করলে পেপ্যালের এশিয়া অংশের হেড অব কমিনিকেশন Pooja Sabharwal মেইলে জানান যে পেপ্যাল বাংলাদেশে সহসাই অপারেশন শুরু করবে না! তবে জুম বাংলাদেশে ২০১৫ থেকেই চালু আছে।

এরপর শুরু হয় পক্ষে বিপক্ষে নানা মত। প্রথমত জুম-কে পেপ্যাল বলে দিনে-দুপুরে অনলাইন ইন্টারনেট প্রফেশনালদের বোকা বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেটা গত পাঁচ বছর ধরেই হচ্ছে। এই করবো সেই করবো বলে বাংলাদেশ আইসিটি ডিভিশন আসলেই কি করেছে সেটা নিয়ে সকলেরই প্রশ্ন। আমরা শুধু বিল্ডিং দেখি, সেলফি দেখি, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে সেগুলো দেখি, কিন্তু এই জনগণের এই কষ্টার্জিত টাকা কই যায় সেই হিসাব পাই না। তার উপর ৬ মাসে ফ্রিল্যান্সার বানানো হবে, ১৫ দিনে গেম ডেভেলাপার বানানো হবে এরকম আজগুবি নানা কাজ আর ফান্ডের ছড়াছড়ি। কিন্তু ক্ষতি হয় আমজনতার। Payoneer থেকে কার্ড দেয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে, নেট+ থেকে কার্ড দেয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশীদের, আপওয়ার্ক থেকে বাংলাদেশীদের ব্লক করে দেয়া হয়, নতুন প্রোফাইল এক্সেপ্ট করা হয় না- এসব কিছুর পিছনের আইসিটি ডিভিশনের মতো একটা অর্বাচীন প্রতিষ্ঠানের কাজগুলো দায়ী। তার আরেকটা নিদর্শন পেপ্যালের কথা বলে জুমের মতো সার্ভিস চালিয়ে দিয়ে জনগণের নিকট মুলা বেচার চেষ্টা করা। আপনি নাকি শুধু ইউএস থেকেই টাকা আনতে পারবেন, এখন আমার ক্লায়েন্ট যদি চীন বা কানাডায় হয়, তখন কি হবে?

এই আনন্দ কই রাখবো?

পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, আমাদের মাননীয় আইসিটি প্রতিমন্ত্রী, আপনি এই একটা ভুল করে ধরা খেয়ে গেলেন। বারবার জনগণকে ধোঁকা দেয়া যায় না, তার উপর লেখাপড়া জানা শিক্ষিত জনগণ, যারা বাইরের ক্লায়েন্টদের সাথে বিজনেস করছেন, এই ভুলের সমীকরণ আসলেই তারা মেলাতে পারবেন না!

 

 

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button