ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

একটাই কবরস্থান, যেখানে সমাধিস্থ হয় হিন্দু-খৃস্টান-মুসলমান!

জায়গাটা বাংলাদেশের মৌলভীবাজারে। কমলগঞ্জের এই জায়গাটায় সেই ১৮৭৫ সালে একটা চা বাগানের যাত্রা শুরু হয়। পাত্রখোলা চা বাগান। এই বাগানেই একসাথে বসবাস করতেন সব ধর্মের মানুষ। হাজার বছরে বাংলা জনপদে ইতিহাসের নানান বাঁকে এসে মিশেছে নানা জাতি ধর্ম বর্ণের মানুষ। তারই ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজার কমলগঞ্জের এই চা বাগানে দেখা গেলো, সবে মিলে বসবাস করার অপূর্ব নজির।

কিন্তু আজন্মই কেউ জীবিত থাকে না। মৃতদের জন্যেও একটা ঠিকানা দরকার হয়। এই চা বাগানের মানুষদের জন্যে একটা ঠিকানা দেয়া হলো। মানে একটা জায়গা দেয়া হলো। যেখানে এখানকার মানুষরা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর সমাধিস্থ হবেন। প্রায় ৫ একরের এই বিশাল জায়গাটি সবার। যেমন করে তারা জীবদ্দশায় একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, একজন আরেকজনের বিপদে আপদে পাশে থাকতেন, সবাই মিলে থাকতেন একই মাটিতে মিলেমিশে- ঠিক তেমন করেই মৃত্যুর পর এক মাটিতে তাদের শেষ যাত্রা। সত্যিই অসাম্প্রদায়িকতার এক চরমতম সুন্দর উদাহরণ এটি।

পাত্রখোলা চা বাগান, সিলেট, মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ

আপনার মনের মধ্যে যদি কৌতুহল জাগে যে, একেকটা ধর্মের তো আলাদা রিচুয়াল৷ কবর দেয়ার কায়দা কানুন ভিন্ন৷ পদ্ধতিও ভিন্ন। এই প্রশ্নেরও উত্তর আছে। একই মাটিতে তাদের চিরকালের যে অন্তিম যাত্রা, সেই যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা নিজেদের ধর্মীয় রীতি মেনেই হয়ে থাকে। হয়ত, কেউ মৃতদেহ পোড়ায় তাদের রীতিমতো, কেউ দাফন করে। তাতে সমস্যা হয় না। সবাই স্বাধীনমতো নিজেদের ধর্মীয় রীতি মেনেই শেষকৃত্য পালন করেন।

বিবিসি বাংলা এক ভিডিওচিত্রে এই জায়গাটির কথা তুলে এনেছে। এই পাত্রখোলা চা বাগানে আছে মসজিদ, মন্দির এবং খৃস্টানদের উপসনালয় এবং ধর্মীয় প্রতিনিধি। তারা নিজেদের ধর্ম, রীতি যেমন পালন করছেন তেমনি অন্যদের প্রতিও ভালবাসা জারি রেখেছেন। যেমন- পাত্রখোলা জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল আজিজ বললেন, আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কোন হিংসা বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। বিভিন্ন জায়গায় গির্জা মন্দিরে যেসব হামলা হচ্ছে আমাদের এখানে এমন কোন সংঘাত নেই। আজ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয় নাই।

একই কথা যেন উচ্চারিত হলো এখানকার খৃস্টান কমিউনিটির ধর্ম যাজক যোসেফের মুখে। যোসেফ বিশ্বাস জানালেন, আমাদের এখানে কখনো নিজেদের মধ্যে কোন ধরণের সংঘাত বা বিদ্বেষ ঘটেনি। আমাদের কোন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজন হয় না, নিজেরাই নিজেদের বিপদে থাকি।

পাত্রখোলা চা বাগান, সিলেট, মৌলভীবাজার

এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাব সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়া দরকার। ধর্মীয় সংঘাত যেন সম্প্রীতি নষ্টের কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তাই সবাই একসাথে যেন আরো বেশি প্রগাড় বন্ধনে আবদ্ধ তারা।

এখানকার চা বাগান সার্বজনীন মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ প্রসাদ শর্মা বলেন, এক দিনে তিন ধর্মের লোক মারা গেলেও যে যার রীতি অনুসারে শেষকৃত্য করেন, পরস্পরকে সহযোগিতাও করেন। এ নিয়ে কোনো ঝামেলা কখনও হয়নি।

*

স্থানীয়দের কথা অনুযায়ী, সুদূর ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে এই ভূমিকে প্রথম অংশে শ্মশান, দ্বিতীয় অংশে খৃস্টানদের জন্য সমাধিস্থল ও সবশেষে মুসলমানদের জন্য কবরস্থান করে দেয়া হয়েছে। একই সাথে তিনটি স্থানই উন্মুক্ত। এই তিন জায়গায় কোথাও নেই সীমানা প্রাচীর। তাই এই এলাকায় কবরস্থান, শ্মশানঘাট ও সমাধিস্থলে তিন ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে স্ব স্ব ধর্ম পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। একদিনে যদি তিন ধর্মের তিনজন মানুষও মারা যায়, তারা সবাই নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পাদন করেন। কখনোই এই নিয়ে তাদের মধ্যে হয়নি কোনোরকমের ঝামেলা।

এই চা বাগানটি ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠিত করে। কমলগঞ্জের সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নে পড়েছে এই চা বাগান। বর্তমানে এটি ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন। একসাথে এই পাত্রখোলা চা বাগানে বসবাস করছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ। হিন্দু – মুসলমান – খৃস্টান ; ধর্ম আলাদা হলেও মানবিকতায় মানসিকতায় তারা একাকার হয়ে যান সম্প্রীতির জয়োধ্বনিতে।

পাত্রখোলা চা বাগান, সিলেট, মৌলভীবাজার

১৮৭৫ সাল থেকে এখনো তাদের এই বন্ধন। প্রায় দেড়শো বছরের এই সম্প্রীতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে সমগ্র উপমহাদেশ। যেখানে আজ ধর্মের নামে কেউ কেউ উগ্রতা ছড়াচ্ছে, জুলুম করছে অন্যের উপর – সেই উপমহাদেশে এমন একটি চা বাগানের গল্প সত্যিই স্বস্তিদায়ক।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button