সিনেমা হলের গলি

পাসওয়ার্ড, নকল সিনেমা এবং কিছু অপ্রয়োজনীয় গলাবাজী…

ঈদে প্রায় একশো আশিটি সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে শাকিব খানের প্রযোজিত সিনেমা ‘পাসওয়ার্ড’। ছবিটি মুক্তির আগে থেকেই আলোচনায় ছিল নির্মাতা মালেক আফসারীর কাণ্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তা এবং সিনেমা মুক্তির আগে শাকিব খানের অকারণ শো-অফের কারণে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে শাকিব খান নিজের সিনেমা প্রযোজন করছেন, কাজেই অনেকের আশা ছিল, বাংলা সিনেমার নাম্বার ওয়ান এই নায়ক বুঝি মৌলিক কোন চিত্রনাট্য নিয়েই এবার সিনেমা বানাতে চলেছেন।

ঈদের আগে পুরো রোজার মাস জুড়ে মালেক আফসারীর ফেসবুক ওয়াল সয়লাব হয়ে ছিল পাসওয়ার্ড কতটা ভালো ছবি, কত শতাংশ মৌলিক ছবি, পাসওয়ার্ডের সামনে কেউ পাত্তা পাবে না, পাসওয়ার্ডকে কেউ নকল বলে প্রমাণ করতে পারলে তাকে দশ লাখ টাকা দেয়া হবে, এমন অজস্র হাবিজাবি কথাবার্তায়। নিজের ছবিকে ওপরে তুলতে গিয়ে অন্যান্য নায়ক-পরিচালকদেরও অপমান করে কথা বলেছেন মালেক আফসারী। আর শাকিব খান তো এককাঠি বাড়িয়ে বলেই বসেছেন, সিনেমার ওপরে তার ডক্টরেট ডিগ্রি নেয়া আছে, তাকে সুন্দরবনে নিয়ে ছেড়ে দিলেও নাকি তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল’ লেভেলের সিনেমা বানিয়ে দেখাতে পারবেন!

তা পাসওয়ার্ড কতটা ইন্টারন্যাশনাল মানের সিনেমা হলো? একটা বিষয় তো প্রমাণীত, দর্শকদের ‘মৌলিক সিনেমা’ দেখার আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন শাকিব খান এবং মালেক আফসারী, দুজনেই। কোরিয়ান সিনেমা ‘দ্য টার্গেট’ থেকে প্রায় হুবহু মেরে দেয়া হয়েছে শাকিব খানের ‘পাসওয়ার্ড’, কোরিয়ান সিনেমাটিও আবার একটা ফ্রেঞ্চ সিনেমার অফিসিয়াল রিমেক। প্রাপ্তি বলতে এটুকুই যে, তামিল-তেলুগু ছেড়ে মালেক আফসারী এখন কোরিয়ান সিনেমা নকলে হাত লাগিয়েছেন!

ফেসবুকে মালেক আফসারী পাসওয়ার্ড কেন দেখতে হবে সেটা নিয়ে লিখেছিলেন, এটা নাকি তার ড্রিম প্রোজেক্ট। শাকিব খান এই সিনেমার জন্যে তিন মাস ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করেছেন বলেও উল্লেখ করেছেন পরিচালক, অথচ শাকিবের ভুঁড়ি কিন্ত সিনেমায় আড়াল করা যায়নি কোনভাবেই। এই যদি ‘কঠোর পরিশ্রমে’র নমুনা হয়, তাহলে আলস্য কাকে বলে?

সবচেয়ে মজার ব্যাপার ঘটেছে অন্য জায়গায়। সেই ফেসবুক পোস্টেই মালেক আফসারী লিখেছিলেন, চিত্রনাট্যকার আবদুল্লাহ জহির বাবু নাকি দীর্ঘ দুই বছর ধরে এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন! আই মীন, সিরিয়াসলি? চাপাবাজীর তো একটা লিমিট থাকা উচিত, তাই না? ভীনদেশী সিনেমা থেকে ফ্রেম টু ফ্রেম কপি করে পাসওয়ার্ড বানিয়ে ফেলেছেন পরিচালক, সেখানে চিত্রনাট্যে কি এমন গুপ্তধন লুকিয়ে আছে যেটা লিখতে দুই বছর সময় লাগবে? স্ক্রিপ্ট রাইটারের সাবান স্লো নাকি?

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা সবসময়ই মানুষকে বোকার হদ্দ মনে করেন, এটা নতুন কিছু নয়। এখন সিনেমার সঙ্গে জড়িত লোকজনও দর্শকদের বুদ্ধিশূন্য বলেই মনে করছেন সম্ভবত। তাদের ধারণা হয়েছে, তারা যা বানাবেন, যেভাবে দেখাবেন সেটাই দর্শক দেখবে। সেকারণেই মালেক আফসারীরা নকল সিনেমা বানিয়েও গলার রগ ফুলিয়ে দাবী করেন, তার ‘মৌলিক’ সিনেমাকে কেউ নকল প্রমাণ করতে পারলে তিনি সিনেমা বানানো ছেড়ে দেবেন, এবং তাকে পুরস্কৃত করবেন!

এখন পুরো পৃথিবীই উন্মুক্ত, কোরিয়ান সিনেমার প্রচুর ভক্ত আছে বাংলাদেশে, ফেসবুকে তাদের আলাদা গ্রুপও আছে। এখন তো এসব তামিল-তেলুগু বা ফ্রেঞ্চ-কোরিয়ান সিনেমার গল্প মেরে দিয়ে সিনেমা বানিয়ে পার পাওয়া যাবে না। নির্মাতারা যদি ভেবে থাকেন যে এদেশে কেউ কোরিয়ান সিনেমা দেখে না, ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ সিনেমা দেখে না, তাহলে তারা মুর্খ ছাড়া আর কিছুই নন।

অবশ্য, এসব চোট্টামীতে ধরা খেয়েও মালেক আফসারীদের গলার আওয়াজ কমে না, তারা তখন মুখে তেলতেলে হাসি ফুটিয়ে দাবী করে বসেন, বাংলাদেশে নাকি কেউ মৌলিক সিনেমা বানায় না, মৌলিক সিনেমা বানিয়ে তারা প্রযোজককে পথে বসাতে চান না! এই লোকের কথাবার্তা শুনলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, ক্ষতিপূরণ, এই ঘর এই সংসারের মতো সিনেমাগুলো তিনিই বানিয়েছিলেন!

আমার কথা হচ্ছে, সারাবিশ্বেই সিনেমা রিমেক করা হয়। এক ইন্ডাস্ট্রিতে কোন ভালো সিনেমা এলে সেটার রিমেক অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে হবেই। বলিউডেও হরহামেশা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার রিমেক হচ্ছে। কিন্ত রিমেক আর চুরির মধ্যে যে একটা বড়সড় পার্থক্য আছে, সেটা আমাদের দেশের পরিচালক-প্রযোজকেরা ভুলে যান।

মূল সিনেমার নির্মাতার সাথে কথা বলে, তার অনুমতি নিয়ে, আর্থিক চুক্তিপত্র করে আইনসম্মতভাবে সিনেমাটার একটা ভার্সন বানানোর নাম রিমেক। আর সেটা না করে সরাসরি গল্পটাকে মেরে দিয়ে নিজের মতো করে উপস্থাপনের নাম চুরি। এই চুরিটা আমাদের দেশের লোকজন খুব গর্বভরে করে। বলে রাখা ভালো, শাকিব খানের প্রথম প্রযোজিত সিনেমার নাম ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’, সেটা ছিল তেলুগু সিনেমা ‘রেবেল’ এর ফ্রেম টু ফ্রেম কপি। 

আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই শাকিব খানকেও। ইন্ডাস্ট্রির নাম্বার ওয়ান হিরো তিনি বহুবছর ধরেই, তার নামে সিনেমা চলে, হিট হয়। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কলকাতাতেও অভিনয় করেছেন তিনি, জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। একটা দেশের এক নম্বর নায়ক হয়ে এসব নকল সিনেমায় অভিনয় করতে, প্রযোজনা করতে কি তার খারাপ লাগে না? মৌলিক সিনেমাই করতে হবে, সেটা বলছি না। কিন্ত অনুমতি না নিয়ে এভাবে নকল সিনেমায় কেন তিনি টাকা ঢালবেন?

ভিনদেশী বা অন্য ইন্ডাস্ট্রির সিনেমার রিমেক করাটা দোষের কিছু নয়। দর্শক বিনোদনের খোঁজে সিনেমা হলে যায়, আর এই সিনেমাগুলো ম্যাস অডিয়েন্সকে যেমন ভরপুর বিনোদন দিতে পারে, সেটা অন্যান্য সিনেমা দিতে পারবে না। সুতরাং, ভিনদেশী গল্পের বাংলাদেশী ভার্সন ঢাকাই সিনেমায় থাকবেই। কথা হচ্ছে, অফিসিয়াল অনুমতি নিয়ে সিনেমার রিমেকই করুন না, জিনিসটার একটা গ্রহণযোগ্যতা থাকে তাহলে।

কোটি কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ রাখতে পারবেন সিনেমা বানানোর জন্যে, সেটার স্বত্ব কেনার জন্যে কি কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করা যায় না? আর নকল গল্প ধরা পড়ার পরেও আমাদের পরিচালক বা প্রযোজকেরা যেমন আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে আজেবাজে যুক্তি খাটিয়ে গলাবাজী করেন, তাতে ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ বাগধারাটার কথাই মনে পড়ে যায়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button