ইনসাইড বাংলাদেশ

পাসপোর্টে পুলিশি ভেরিফিকেশন: প্রয়োজন, না কেবলই ঘুষ নেওয়ার ধান্দা?

বিচারপ‌তি‌দের স্ত্রী হ‌লে তা‌দের জন্য তাহ‌লে ভিন্ন আইন? নয়‌তো বিচারপ‌তির স্ত্রীর কা‌ছে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের জন্য ঘুষ চাওয়ায় কেন পু‌লি‌শের এক এএসআই‌য়ের দুই বছ‌রের জেল হ‌বে? তাও মাত্র দুই হাজার টাকার জন্য?

ঘটনা হ‌লো, এএসআই সাদেকুল তখন এসবিতে কর্মরত ছিলেন। ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট এক প‌রিবা‌রের পাস‌পো‌র্টের যাচাই কর‌তে গি‌য়ে নিজেকে এসআই আবদুস সালাম পরিচয় দেন। ওই বা‌ড়ির দুই মেয়ের পাসপোর্ট পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য তি‌নি বা‌ড়ির কর্তীর কা‌ছে দুই হাজার টাকা ঘুষ চান। তি‌নি জানান, এই টাকা না দিলে ভেরিফিকেশন হবে না।

সা‌দেকুল কী ক‌রে জান‌বেন ওই নারী বিচারপ‌তির স্ত্রী? ও‌দি‌কে এ ঘটনা ওই বিচারপতিকে জানান তাঁর স্ত্রী। পরে আদালতের নির্দেশে সাদেকুল উচ্চ আদালতে হাজির হন। আদালতের কাছে তিনি ক্ষমা চান। কিন্তু আদালত শুনানি নিয়ে এএসআই সাদেকুলের বিরুদ্ধে মামলা ও তাঁকে গ্রেপ্তার করতে বলেন। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন স্পেশাল অফিসার হোসনে আরা বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট এএসআই সাদেকুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

ঘটনা এখা‌নেই শেষ নয়। মামলাটি আবার যায় দুদ‌কে। দুদক ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত গত ২১শে মার্চ সা‌দেকুল‌কে দুই বছ‌রের জেল দেন। এরপর আদালত থে‌কে সা‌দেকুল‌কে কারাগা‌রে পাঠা‌নো হয়।

ছবি- ittefaq.com.bd

আমার এতো বড় ঘটনা বলার কারণ দুটো। পাস‌পো‌র্টের পু‌লিশ ভে‌রি‌ফিকশ‌নের জন্য ঘুষ চাওয়ার অ‌ভি‌যোগ তো বেশ পু‌রো‌নো। অ‌ধিকাংশ লোকক‌ে এই ঘুষ দি‌তে হয়। পাস‌পোর্ট দে‌রি আর ভোগা‌ন্তির য‌তো কারণ তার ম‌ধ্যে এই ঘুষ বা ভে‌রি‌ফি‌কেশর সব‌চে‌য়ে বড় কারণ। এখন প্রশ্ন হ‌লো, আদালত কেন বল‌বে না পাস‌পো‌র্টের ভে‌রিফিকশ‌নের জন্য কেন পু‌লিশের কা‌ছে পাঠা‌তে হ‌বে? কেন শুধু এনআই‌ডি দি‌য়ে পাস‌পোর্ট দেয়া হ‌বে না? যারা বল‌বেন, পু‌লিশ‌কে দি‌লে অপরাধীরা বা যে কেউ পাস‌পোর্ট পে‌য়ে যা‌বে তারা ব‌লেন তো, কোন দুষ্ট লোকটা পাস‌পোর্ট পায়নি? তারা তো টাকা দি‌য়ে সব ম্যা‌নেজ ক‌রছে। এমন‌কি রোহিঙ্গারাও পাস‌পোর্ট পে‌য়েছে। তাহ‌লে ভে‌রি‌ফি‌কেশন রেখে লাভ কী হ‌লো?

এরপ‌রেও যারা ভে‌রি‌ফি‌কেশন চান, ব‌লেন তো পাসপোর্ট কী? পাস‌পোর্ট কিন্তু নাগ‌রিকত্ব নয়, শুধুমাত্র ট্রা‌ভেল ডকু‌মেন্ট। খুনী আসামিও পাস‌পোর্ট পাওয়ার অ‌ধিকার রা‌খে। কিন্তু তা‌কে ভ্রমণ কর‌তে দেয়া হ‌বে কি না সেটা হ‌চ্ছে আইনশৃঙ্খলা বা‌হিনীর কাজ। আর ব‌লেন তো, এনআই‌ডির চে‌য়ে বড় ডকু‌মেন্ট আর কী হ‌তে পা‌রে? যার এনআই‌ডি আছে তার কেন ভে‌রি‌ফি‌কেশন লাগ‌বে? এই আঙু‌লের ছা‌পের যু‌গে তো এনআই‌ডি য‌থেষ্ট। তারপ‌রেও কেন ভে‌রি‌ফি‌কেশন?

উত্তরটা সহজ- ঘুষ বা‌নিজ্য। হাজারে কোটি টাকার ঘুষ বা‌নিজ্য। আমার যদি ভুল না হয়- এই সরকা‌রের আম‌লেই পাস‌পো‌র্টে পু‌লিশ ভে‌রি‌ফি‌কেশন বন্ধ করার প্রস্তাব উঠে‌ছিল সংস‌দে। আমি য‌তোটা জা‌নি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন বিষয়ক একটি বৈঠকেও এ নি‌য়ে আলোচনা হয়। য‌দি ভুল না জে‌নে থা‌কি, ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

ঐ বৈঠ‌কে পাসপোর্ট তৈরিতে ভেরিফিকেশনের বিরোধিতা করেন বেশিরভাগ সরকা‌রি কর্মকর্তা। তারা বৈঠকে পাসপোর্ট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। কিন্তু বরাব‌রের ম‌তোই এসবি ভেরিফিকেশন বন্ধের বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন না থাকলে অসৎ লোকেরাও পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন।

কিন্তু বৈঠকে ব‌া‌কিরা ব‌লেন, সৎ হোক আর অসৎ হোক, পাসপোর্ট পাওয়া বাংলাদেশের একজন নাগরিকের অধিকার। যদি একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার অধিকার থাকে, যদি ভোটাধিকার থাকে তবে তার বিনা শর্তে পাসপোর্ট পাওয়ারও অধিকার রয়েছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে গওহর রিজভী পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে নেওয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু যা হওয়‌ার তাই। ভে‌রি‌ফি‌কেশন বন্ধ হয়‌নি।

এনআইডি পাওয়ার যোগ্যতা যার আছে, পাসপোর্ট পাওয়ারও যোগ্যতা সে রাখে। (ছবি- flickr.com)

দুদ‌কের এক গণশুনা‌নি‌তেও ভে‌রি‌ফি‌কেশন ঘুষ নি‌য়ে কথা ও‌ঠে। চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ তখন বলেন, পাসপোর্ট ইস্যু, পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা পাসপোর্ট সংশোধনের ক্ষেত্রে পুলিশি ভেরিফিকেশন সম্পৃক্ত ভোগান্তি লাঘবে অপরাধীদের তালিকা পাসপোর্ট অধিদপ্তরে থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘সবাই তো অপরাধী নন। তাহলে ভেরিফিকেশন জরুরি কেন? এ বিষয়টি একটি প্রস্তাব হিসেবে রাখলাম।’

ত‌বে ওই প্রস্তা‌বেই শেষ। আর আগায়‌নি কিছু। এর আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভেরিফিকেশনের নামে পুলিশি হয়রানি, বিশেষ করে ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) দেওয়ার প্রস্তাব ও‌ঠে। কিন্তু এমআরপি কর্তৃপক্ষের ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট প্রদান প্রস্তাবের সঙ্গে ‘প্রচণ্ড দ্বিমত’ পোষণ করে চিঠি পাঠায় এসবি। কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রস্তাবটি সরকারের নীতি পরিপন্থী বলেও উল্লেখ করে তারা।

আদাল‌তের কা‌ছে আমার প্রশ্ন, এএসআই সা‌দেকু‌লের দোষটা কোথায়? অন্য যে কারও কাছ থে‌কে য‌দি ভে‌রি‌ফিকশ‌নের জন্য টাকা নেয়া যায় তাহ‌লে বিচারপ‌তির স্ত্রীর কাছ থে‌কে কেন নেয়া যা‌বে না? কেন নেয়া যা‌বে না ক্ষমতাশালী মানুষ, সাংবা‌দিকের কাছ থে‌কে? তারা, মা‌নে ক্ষমতাবানরা পার পে‌য়ে যাবেন আর সাধারণ মানুষ ঘুষ দে‌বেন?

আমি রাষ্ট্র‌কে বল‌বো ভে‌রিফি‌কেশন ছাড়া য‌দি পাস‌পোর্ট না হয়, য‌দি ঘুষ দি‌তেই হয় সবাই‌কে তাহ‌লে শুধু সা‌দেকুল দোষী হ‌বে কেন? আমি তার নিঃশর্ত মু‌ক্তি দা‌বি কর‌ছি। আর বিচার য‌দি কারও কর‌তে হয়, তাহ‌লে যারা এই ডি‌জিটাল যু‌গেও ভে‌রি‌ফিকশ‌নের না‌মে ঘুষ প্রথা রা‌খেন তা‌দের বিচার করা উচিত। কিন্তু কথা হ‌লো বিড়া‌লের গলায় ঘন্টাটা বাঁধ‌বে কে? আর সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সবাই মি‌লে যদি শুধু এই ছোট্ট কাজটা কর‌তে না পা‌রেন, তাহ‌লে তারা সড়‌কে শৃঙ্খলা আনার ম‌তো বড় কাজ কর‌তে পার‌বে সেটা আমি অন্তত বিশ্বাস ক‌রি না। কা‌জেই আব‌ারও- দুই হাজার টাকা ঘুষ চাওয়ায় দুই বছ‌রের জেল পাওয়া সা‌দেকু‌লের মু‌ক্তি চাই।

(ফিচার্ড ছবি- amaderbrahmanbaria.com)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button