সিনেমা হলের গলি

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম- স্নেহ ও মমতার বন্ধন

মা- বাবাদের অনুসরণ করেই অনেকেই অভিনয়ে আসেন। বাবা-মায়েদের মতো সন্তানরাও সফল হবেন এমন সুনিশ্চয়তা হয়তো দেয়া যায় না, তবে অনেকেই সফল হয়েছেন৷ বাবা-মায়েদের পথ ধরে সন্তানদের বলিউড জগতে আসা যেন একটু বেশিই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, নিজেদের স্বাতন্ত্র‍্যে দর্শকদের ভালোবাসা পেয়ে থাকেন। তেমনি বলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়া পাঁচ প্রজন্মের গল্পকথা নিয়ে এই বিশেষ আয়োজনঃ

বাবা বলে ছেলে নাম করবেঃ সেলিম খান-সালমান খান

শত বর্ষের বলিউডের ইতিহাসে চিত্রনাট্যকার হিসেবে সেলিম-জাভেদ জুটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই জুটির একজন সেলিম খান। শুরুটা করেছিলেন অভিনয় দিয়ে, বেশ কিছু ছবিতে অভিনয়ও করেছেন। তবে নিজের ক্যারিয়ার বদল করে ফেলেন রাজেশ খান্নার ‘হাতি মেরা সাথী’ সিনেমায় জাভেদ আখতারের সঙ্গে যৌথভাবে চিত্রনাট্য লেখায়৷ এরপর একে একে শোলে, দিওয়ার, ত্রিশূল, মিস্টার ইন্ডিয়া সহ বেশ সংখ্যক জনপ্রিয় সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন একাধিকবার। সেলিম খান একক হিসেবেও জঞ্জির সহ বেশ কয়েকটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন।

সেলিম খান ও সালমান খান

আশির দশকের একেবারে শেষে ১৯৮৯ সালে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় সিনেমা দিয়ে নায়ক হিসেবে আবিভূর্ত হন সেলিম খানের ছেলে সালমান খান৷ যদিও এর আগে ‘বিবি হ্যায় তু এয়সি’ নামে একটা ছবি করেছিলেন পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে। প্রথম ছবির সাফল্যের পর সালমান খানের ক্যারিয়ারে একে একে যুক্ত হয় সাজান, হাম আপকে হ্যায় কৌন, করন অর্জুন, হাম দিল দে চুকে সানম থেকে তেরে নাম, দাবাং, ওয়ান্টেড, বজরঙ্গি ভাইজান, সুলতানের মতো তুমুল সাড়া জাগানো সিনেমা। বাবা সেলিম খান যেমন চিত্রনাট্যকার হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্টিত করেছেন, তেমনি অভিষেকের ত্রিশ বছর পরেও এখনো সালমান খান সুপারস্টার হিসেবে সমুজ্জ্বল আছেন। ইতিহাসে জনপ্রিয় নায়কদের তালিকায় তিনি প্রথমদিকেই থাকবেন। সামনের সিনেমার তালিকাও বেশ আশা জাগানিয়া। বাবা সেলিম খান তাঁর ছেলে সালমান খানের ‘পাত্থার কি ফুল’ সহ দুইটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। সেলিম খানের অন্য দুই ছেলে আরবাজ খান ও সোহেল খানও অভিনয়ে যুক্ত।

তুমি আমার মা, আমি তোমার মেয়েঃ তনুজা-কাজল

উত্তম কুমারের বিখ্যাত বাংলা সিনেমা ‘দেয়া নেয়া’ সিনেমায় মাধবী মাধুপে হল মিতালী গানে পাশের বাড়ির মেয়ে হিসেবে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন তনুজা। অভিনেত্রী শোভনা সমর্থের দুই কন্যার বড় কন্যা নূতন বলিউডে একজন সুপ্রতিষ্ঠিত নায়িকা, ছোট কন্যা হলেন তনুজা।

তনুজা ও কাজল

ষাটের দশকে মায়ের পরিচালিত ‘চাবিলি’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন, তবে তার আগে বড় বোনের একটি সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছিলেন। বলিউডে তিনি অনুভব, হাতি মেরা সাথী, দো চোর, মেরা জীভন সাথী সহ বেশ সংখ্যক ছবি করেন। তবে তিনি বিশেষ হয়ে আছেন বাংলা ছবির জন্য। দেয়া নেয়া ছাড়াও তিন ভূবনের পাড়ে, এন্টনি ফিরিঙ্গি, রাজকুমারী ছবিগুলো কালজয়ী হয়ে আছে, সর্বশেষ ‘সোনার পাহাড়’ সিনেমাতেও মুগ্ধ করেছেন।

১৯৯৪ সালে ‘বেখুদি’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয়েছিল তনুজার মেয়ে কাজলের। নিজের মেয়ের প্রথম সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন তিনি। তবে ছবিটা চলেনি, কাজল আলোচনায় আসেন বাজিগর, ইয়ে দিল্লিগী সিনেমা দিয়ে। এরপর তো দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েংগে, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, কাভি খুশি কাভি গাম, হাম আপকে দিল রেহতে হ্যায়, ইশক, ফানাহ, মাই নেম ইজ খানের মতো জনপ্রিয় সিনেমা দিয়ে নিজেকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করেছেন হিন্দি সিনেমার ইন্ডাস্ট্রিতে। পাঁচবার ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রী হওয়া এই জনপ্রিয় নায়িকা অজয় দেবগণ কে বিয়ে করে সংসারে থিতু হয়েছেন। তবে মায়ের মতো বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেননি বাঙালি পরিবারের এই নায়িকা।

তুই যে আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়েঃ মহেশ ভাট-আলিয়া ভাট

১৯৭৪ সালে ‘মঞ্জিলে এক ভি’ সিনেমা দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্বপ্রকাশ করেন মহেশ ভাট। পরের ছবি ‘নয়া দৌড়’ দিয়ে নিজের মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। এরপর একে একে আর্থ, সারাংশ, ড্যাডি, আশিকি, সাড়াক, দিল হ্যায় কি মানতা নেহি, গুমরাহ থেকে সর্বশেষ জখমের মতো সিনেমা বানিয়ে হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে অন্যতম সেরা নির্মাতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ‘হাম হে রাহি পেয়ার কে’র জন্য বিশেষ জুরি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন, এছাড়া ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন বেশ সংখ্যকবার। পরিচালনার বাইরে তিনি একজন সফল প্রযোজক ও কাহিনীকার।

বাবা মহেশ ভাটের সঙ্গে আলিয়া ভাট

২০১২ সালে করন জোহরের ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ দিয়ে জমকালো অভিষেক ঘটেছিল মহেশ ভাটের ছোট মেয়ে আলিয়া ভাটের। দেখতে একেবারেই পুতুলের মত সে। এরপর একে একে হাইওয়ে, টু স্টেইটস, ডিয়ার জিন্দেগী, উড়তা পাঞ্জাব, রাজি সিনেমা দিয়ে নিজেকে সময়ের শীর্ষ অভিনেত্রী বানিয়েছেন। ইতিমধ্যেই সেরা অভিনেত্রী হিসেবে দুইবার ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন, ক্রিটিকেও পুরস্কৃত হয়েছেন। মহেশ ভাটের বড় মেয়ে পূজা ভাট বাবার সিনেমা বাদে অন্য কারো সিনেমা তেমন করেননি,অন্যদিকে আলিয়া ভাট নিজ যোগ্যতায় জনপ্রিয়তা পাবার পর বাবার বিখ্যাত সিনেমার সিক্যুয়েল ‘সাড়াক ২’ তে অভিনয় করছেন। আলিয়া ভাটের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উজ্জ্বল এটা তাঁর মুক্তি প্রতিক্ষীত সিনেমাগুলোর নাম দেখলেই বুঝা যায়।

মধুর আমার মায়ের হাসিঃ নার্গিস-সঞ্জয় দত্ত

গানের মতো হয়তো মা নার্গিসের সেই প্রিয় মুখের হাসির কথা বারবার মনে পড়ে ছেলে সঞ্জয় দত্তের। বলিউড অভিনেত্রীদের মাঝে অগ্রজ হিসেবে যারা আছেন,তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম নার্গিস। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় জগতে আবির্ভাব হবার পর নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয় ১৯৪২ সালে তামান্না ছবিতে। তখনকার সময়ে তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা। উনার অভিনীত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ বলিউডের ইতিহাসে কালজয়ী ছবির একটি। ‘রাত অউর দিন’ দিয়ে প্রথম জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী হয়েছেন। এছাড়া আওয়ারা, শ্রী ৪২০ রয়েছেই।

নার্গিস ও সঞ্জয় দত্ত

নার্গিস বিয়ে করেন অভিনেতা সুনীল দত্তকে, তাদের ঘরে আসে ছেলে সঞ্জয় দত্ত৷ অভিনয়ের পরম্পরায় তিনিও নাম লিখান বলিউডে। তবে প্রথম ছবির মুক্তির আগেই অকালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন মা নার্গিস, ছেলের প্রথম ছবি ‘রকি’র সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। ব্যক্তিজীবনে বিতর্কিত হলেও ক্যারিয়ারে বেশ সংখ্যক জনপ্রিয় ও ভালো সিনেমা উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে সাজান, সাড়াক, মুন্না ভাই এম বি বি এস, লাগো রাহো মুন্নাভাই, খলনায়ক অন্যতম। সম্প্রতি তাঁর জীবনী নিয়ে রাজকুমার হিরানী নির্মাণ করেছেন ‘সাঞ্জু’ সিনেমা।

আমি বাবা-মায়ের শত আদরের মেয়েঃ গুলজার ও রাখী গুলজার-মেঘনা গুলজার

হিন্দি সিনেমার গানের ইতিহাসে সেরা গীতিকার হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত গুলজার। উনার নিপুণ লিখনীতে গানগুলো হয়েছে কালজয়ী। দেশের সব পুরস্কারের পাশাপাশি অস্কার ও নিজের ঘরে তুলেছেন। গান লেখার পাশাপাশি তিনি নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি আঁধি, ইজাজত, মাচিসের মতো সিনেমা নির্মান করেছেন।

বাবা গুলজারের সঙ্গে মেয়ে মেঘনা গুলজার

অন্যদিকে বাঙালি অভিনেত্রী রাখী মজুমদার ‘বধূ বরন’ নামক বাংলা ছবি দিয়ে অভিনয় জগতে আসেন। পরমা খ্যাত এই জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রীর প্রথম হিন্দি সিনেমা ‘জীবন মৃত্যু’। পরবর্তীতে দাগ, কাভি কাভি, রাম লক্ষ্মন, করন অর্জুন সহ অনেক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সত্তর দশকের শুরুতে এই দুইজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন৷ রাখী মজুমদার হয়ে যান রাখী গুলজার। এই দুইজনের ঘর আলো করে আসে একমাত্র কন্যা সন্তান মেঘনা গুলজার। তবে মেয়ের জন্মের এক বছর পরেই বাবা- মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে, এরপরেও মেয়ের প্রতি সব দায়িত্ব-পালন করেছেন তিনি।

গুলজার এবং রাখী আর কোনো সংসারে আবদ্ধ হননি। মেঘনা গুলজার সাধারনত ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন, বাবার মাচিস আর হুতুতু ছবির সহকারী চিত্রনাট্যকার ছিলেন। ফিলহাল ছবি দিয়ে নির্মাতা হিসেবে অভিষেক হওয়া মেঘনা গুলজার এখন বলিউডের অন্যতম সেরা নির্মাতা। ‘রাজি’ সিনেমাটি দিয়ে পেয়েছেন ফিল্মফেয়ারে সেরা নির্মাতার পুরস্কার। এসিড আক্রান্ত এক নারীর জীবনী নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন ‘ছাপাক’, সামনের বছরের শুরুতেই সিনেমাটি মুক্তি পাবে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button