খেলা ও ধুলা

এমন সভাপতি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…

ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের কাছে টেস্ট হারের ক্ষতটা এখনও টাটকা, ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং, প্রতিটা জায়গাতে পাঁচদিন ধরে ডমিনেট করেই জিতেছে রশিদ খানের দল। ঘরোয়া ক্রিকেটকে গুরুত্ব দেয়া এবং তরুণ প্রতিভা অন্বেষণের কাজটা ঠিকঠাকভাবে করতে পারছে আফগানিস্তান, কাজেই ফলটা আমাদের কাছে বিস্ময় হয়ে ধরা দিলেও, তাদের কাছে এটা স্বাভাবিকই। আফগানিস্তানের ম্যানেজারই বলেছেন, রশিদ খানের মতো বোলার নাকি ওদের দেশে আরও ৮-১০ জন আছে!

বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে বিশাল একটা ধাক্কা এটা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আফগানিস্তানের কাছে এভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করাটাই আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয় কিনা- উঠছে সেই প্রশ্নও। তবে আপনি যদি ভেবে থাকেন যে এই হারের পরে বিসিবি নড়েচড়ে বসবে, ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়ে বোর্ড একটু সিরিয়াস হবে, খেলোয়াড়েরা নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেবেন পরবর্তী ম্যাচগুলোতে- তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

স্বয়ং বিসিবি সভাপতিই মনে করেন, আফগানদের কাছে এই হারে হতাশ হবার কিছু নেই। তার ধারণা, বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভার বন্যা বইছে, আমাদের ঘরোয়া এবং বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে এবং এত বেশি প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছেন যে, চাইলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা আমেরিকা, বারমুডা, হংকং, জার্মানী কিংবা পাপুয়া নিউগিনির মতো দেশেও এসব প্রতিভা রপ্তানী করতে পারি!

ঘরোয়া ক্রিকেটের পাইপলাইনে প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়ের ঘাটতি আছে, সেটা সবাই জানে। জানেন না শুধু নাজমুল হাসান পাপন, তাই বললেন-

“আমি একমত নই, একদম একমত নই। আজকে যে স্কোয়াডটি দেয়া হলো (টি-টোয়েন্টি), এখানে যদি আমি দুটি নতুন ছেলের নাম দেই, দেখবেন তাদের কেউই সেরা একাদশে সুযোগ পাবে না। আমরা তো সুযোগই দিতে পারছি না। সুযোগই যদি না দেই, তাহলে পাইপলাইনে খেলোয়াড় আছে কিনা এটা বুঝবেন কিভাবে?”

“এর আগে সে (সাকিব) বলেছিল, বলার পরে আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে খুব চিন্তায় ছিল। আমাদের নতুন পাইপলাইনে খেলোয়াড় আছে কিনা। তবে এই টেস্ট শুরু হওয়ার আগে, আমি যখন থাইল্যান্ডে যাচ্ছি, সেদিন রাতে আমার বাসায় এসে সে বলেছিল যে, “আমাদের এত ভালো ভালো খেলোয়াড় আছে, আমার ধারণাই ছিল না।”

যাই হোক, ধরে নিলাম আমাদের ক্রিকেটে প্রচুর প্রতিভা, প্রতিভার ঠেলায় থাকা যাচ্ছে না, ম্যাচও জেতা যাচ্ছে না। আমাদের এতই প্রতিভা যে, আফগানিস্তানের এ দল এসে আমাদের হারিয়ে যায়, ওদের মূল দলের কাছেও আমরা গো-হারা হারি। মুস্তাফিজের বোলিঙে পুরনো ধার নেই, তাসকিন অফফর্মে, রুবেলও নেই ছন্দে- মানসম্মত এবং ম্যাচ জেতানোর মতো পেসার নেই আমাদের সংগ্রহে, এই ধ্রুব সত্যিটাও তিনি স্বীকার করতে চাইলেন না, বললেন-

“এইগুলো নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মানে নেই। পেসার-স্পিনার, এসব কোনো কথা না। আমাদের দলে বিশ্বের সেরা স্পিনার আছে। অনেকগুলো ভালো ভালো পেসার আছে। বিশ্বের নামিদামি, র‍্যাঙ্কিংয়ে সেরা কিছু দলকে হারিয়েছি আমরা পেসারদের দিয়েই। কাজেই এটা বলা ঠিক না।”

এই সিরিজের আগে এবং সিরিজ চলাকালে অন্তত দু’বার সাকিব আল হাসান বলেছেন, নেতৃত্বটা তিনি উপভোগ করছেন না, বিশেষ করে সাদা জার্সিতে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী নন, সাকিব চান নতুন কেউ আসুক অধিনায়ক হিসেবে। সাকিবের ভাষ্যমতে- ‘অধিনায়কত্ব যদি না করতে হয় তাহলে আমার মনে হয় সব থেকে ভালো হবে আমার জন্য। আমার কাছে মনে হয় ক্রিকেটের জন্য ভালো হবে ব্যক্তিগত দিক থেকে চিন্তা করলে।’

এটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাজমুল হাসান পাপন উল্টো সাকিবের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলে বললেন, “আমরা দেখছি টেস্টের ব্যাপারে বেশ কিছুদিন থেকে ওর (সাকিব) আগ্রহ তেমন নেই। বিশেষ করে আপনারা যদি দেখেন, আমাদের দলগুলো যখন বাইরে যাচ্ছিল, তখন টেস্টের সময় সে একটু বিশ্রাম চায়। স্বাভাবিকভাবে ওর হয়তো আগ্রহটা কম।” প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক, টেস্টে যার আগ্রহ কম, তার কাঁধেই কেন টেস্ট অধিনায়কের দায়িত্ব সঁপে দেয়া হয়েছে? সাকিব বারবার বলার পরেও বিসিবি কেন পরিবর্তনের কথা ভাবছে না?

সাকিব ইনজুরি, আঙুল ইনফেকশন, পাপন, বিসিবি

অবশ্য, বিসিবি যে একদম হাত পা গুটিয়ে বসে আছে, ক্রিকেটকে কিছু করছে না তা-ও নয়। এই গতকালই যেমন ঘোষণা করা হলো, এবারের বিপিএল হবে বঙ্গবন্ধুর নামে, ফ্র‍্যাঞ্চাইজিগুলোর খরচ বহন করবে বিসিবিই। কি দারুণ একটা সিদ্ধান্ত, তাই না? ঢাকায় হবে বিশ্ব একাদশ বনাম এশিয়া একাদশের ম্যাচ- এটা হয়ে গেলে ক্রিকেটের উন্নতি আর যে আটকায়! র‍্যাঙ্কিঙের সেরা পাঁচে তো তখন আমরা হাসতে হাসতেই চলে যাবো! গত দশ বছরে বিশ্ব একাদশ বনাম এশিয়া একাদশের ম্যাচ কেউ আয়োজন করতে পেরেছে? বাংলাদেশ করবে, এমন অর্জন আর কারো তো নেই!

বিপিএল প্রসঙ্গটা যখন এলোই, কিছু কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। এই দেশের ক্রিকেটে বিপিএল একটা বিষফোঁড়ার মতো। টুর্নামেন্টটা খেলে স্থানীয় ক্রিকেটারদের খানিকটা লাভ হয়, বিদেশী ক্রিকেটারেরা আরও বেশি লাগ করেন, তবে এতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের কোন উপকার নেই। বিপিএলের প্রতিটা আসরেই যে পরিমাণ বিতর্ক তৈরি হয়, অনিয়ম আর জুয়ার মহোৎসব বসে, সেটা লিখে শেষ করার মতো নয়। বঙ্গবন্ধুর মতো মহান একজন নেতার নামটা এই কালিমার সাথে যুক্ত করার কোন দরকার ছিল বলে মনে হয় না। বঙ্গবন্ধু আমাদের হৃদয়ে আছেন, তাকে সেখানে থাকতে দিলেই ভালো হতো।

নাজমুল হাসান পাপনের একেকটা সাক্ষাৎকার দেখলেই এখন শুধু বাংলালিঙ্কের বিজ্ঞাপণের কথা মনে পড়ে- ‘ওরে, কত কথা বলে রে!’ বাংলাদেশের ক্রিকেটে আগুন লেগেছে, দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তিনি এখন নিরোর মতো বাঁশি বাজিয়েই চলেছেন, বাজিয়েই চলেছেন। কে জানে, দেশের ক্রিকেটটা পুড়ে ছারখার হবার আগে তিনি একটু সিরিয়াস হবেন কিনা!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button