ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

পাকিস্তান ভাঙার বীজ ও স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কিত হাস্যকর বিতর্ক!

পাকিস্তান সৃষ্টির সময়ই বপন করা হয় তার ধ্বংসের বীজ

১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক “লাহোর প্রস্তাব” উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে খুব স্পষ্টভাবে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের এলাকাগুলোকে নিয়ে “একাধিক” স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। খেয়াল করে দেখুন, মুসলিমগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল, একটি অখন্ড রাষ্ট্র না। এবং এসব স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর প্রদেশগুলোও আমেরিকা বা ভারতের মতো ফেডারেল রাষ্ট্রের মতো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে- একথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়।

কিন্তু ১৯৪৬ সালে দিল্লীতে মুসলিম লীগের আইন পরিষদের বৈঠকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে অখন্ড পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাব করেন এবং ১৯৪৭ সালে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত একেবারেই আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির জনগণ অধ্যুষিত দুইটি আলাদা ভূখন্ড শুধু এক ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটা অখন্ড দেশ হিসেবে জন্ম নিলো- পাকিস্তান!

এখন, যদি জিন্নাহ সাহেব শেরে বাংলার প্রস্তাব অনুযায়ী দুইটি আলাদা স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র একটা ফেডারেল সরকারের আন্ডারেও গঠন করতেন তাহলে কি হতো? ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন হতো কি? ৬ দফা আন্দোলনের মূল নির্যাসই ছিলো- লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান প্রণয়ন করে পাকিস্তানকে একটা ফেডারেল যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া। এবং এই ৬ দফা দাবীগুলো এতটাই যৌক্তিক ছিলো- যেকোন সুস্থ মস্তিষ্কের বিবেকবান মানুষ সেটার সাথে একমত হবেন।

যেমন- দুই প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে নিজ নিজ প্রদেশের আয় ব্যয়ের, বৈদেশিক মুদ্রার এবং বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। এতে কি হতো? এক প্রদেশের আয়ে অন্য প্রদেশের উন্নয়নের রাস্তা বন্ধ হয়ে যেত। এছাড়াও এই ছয় দফাতে দুই প্রদেশের জন্য এমন আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থা থাকা যাতে সেটা অন্য প্রদেশে পাচার না হতে পারে। অর্থাৎ, পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ বন্ধ হয়ে যেত ছয় দফা বাস্তবায়ন করলে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোন ক্ষতি হতো না। পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকরা যদি সত্যিই পূর্ব পাকিস্তানের জনগনদের শোষণের হাতিয়ার না ভেবে নিজের দেশের মানুষ ভাবতো তাহলে এই ৬ দফায় তাদের আপত্তি করার কথা ছিলো না। আমেরিকা, ইন্ডিয়ার মতো ফেডারেল যুক্তরাষ্ট্রগুলোকে এখনো বহাল তবিয়াতে টিকে নেই? পাকিস্তানের শাসকরা তখন উলটো এই ৬ দফা দাবী উত্থাপনের কারণে তৎকালীন আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের উপর নানা রকম দমন নিপীড়ন শুরু করে। এই ৬ দফাকে সামনে নিয়েই ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরুঙ্কুশ জয় লাভ করে। অর্থাৎ বাংলার মানুষের ভোটও ছিল ৬ দফার পক্ষে। তখনও পাকিস্তান সামরিক শাসক ক্ষমতা হস্তান্তরে তো টালবাহানা করেই, উলটো ২৫শে মার্চ রাতে নীরিহ ঘুমন্ত বাংলাদেশীদের উপর “অপারেশন সার্চ লাইট” নামক নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এক রাতে ঢাকাতেই মারা যায় ৩০ হাজার মানুষ। তারপরই আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণা, নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়।

ব্যাপারটা তাহলে এরকম- ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ যদি লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী একটা ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান গঠন করতেন, বাংলাকে আলাদা স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্ব দিতেন, সেটা না হোক অন্তত সত্তুরের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ের পর ৬দফা বাস্তবায়নে শেখ মুজিবর রহমানকে যথাযথ ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হতো, হয়তো পাকিস্তান এখনো অখন্ড থাকতো! অতএব, দুই পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য যারা ভারতীয় ইন্ধন ও ষড়যন্ত্র খুজেন, তাদের বুঝা উচিৎ সেই ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ সাহেবই পাকিস্তানের সৃষ্টির সময়ই তার কপালে ভেংগে পড়ার সিল মেরে দিয়েছিলেন। বাইরের ষড়যন্ত্র প্রয়োজন ছিল না।

স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে হাস্যকর বিতর্ক

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিলো ২৬শে মার্চ ১২টা এক মিনিটে। ওয়ারির বলদা গার্ডেন হতে তৎকালীন ইপিআর এর ওয়ারলেসের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরির কাছে একটি বার্তা প্রেরণ করেন, সেটার শুরুতেই তিনি বলেন “This is may be the last message to you. From today, Bangladesh is independent” এটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। এটি বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণার সনদ। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা থেকে যথাযথভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এটা নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই। থাকতে পারে না।

তাও কারো মনে কোন ধরণের খটকা যাতে না থাকে তার জন্য কিছু তথ্য দেই।

২৬শে মার্চ দুপুর ১:০৫ টায় ইয়াহিয়া খান এক রেডিও ঘোষণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার অপরাধে শেখ মুজিবুর রহমানকে ভয়ংকর শাস্তি পেতে হবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদোহিতার অপরাধে। উনি অন্য কারো নাম উল্লেখ করেননি ঘোষক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে যে ১২টি অভিযোগ এনে বিচার করা হয় তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ছিলো স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার। তাকে মৃত্যুদন্ডের রায় দেওয়া হয়।

২৬শে মার্চ চৌধুরি বেলাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” স্থাপন করা হয় সেখান থেকে-

২৬শে মার্চ বেলা ২:১০ টায় মোহাম্মদ হান্নান ইংরেজিতে এবং ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪০ টায় আবুল কাশেম সন্দ্বীপ বাংলায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা দুটো শুধু চট্রগ্রাম এর ভেতরেই শোনা যায়। ২৭ শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান খুব স্পষ্ট ভাবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণা সারা বাংলাদেশে শোনা যায়। এটা হলো ফ্যাক্ট। সত্য। আপনি যে কোন রাজনৈতিক দলের অনুসারী হতে পারেন। কিন্তু সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না।

মেজর জিয়ার সেই ঘোষণা “মেজর” একটা ভূমিকা রেখেছিলো, সন্দেহ নেই। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন বাঙালী মেজর বিদ্রোহ করে স্বাধীণতা ঘোষণা করছেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে- এই ব্যাপারটা তখন উদ্ভ্রান্ত, আতংকিত মানুষকে অনেক অনুপ্রেরণা, সাহস দিয়েছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে অন্যকাউকে স্বাধীনতার ঘোষক বলার আদৌ কোন সুযোগ নেই।

এ ব্যাপারে একটা ঘটনা বলি- ১৯৯২ সাল, বিএনপি তখন ক্ষমতায়। বিটিভিতে “উঠোন” নামক একটা নাটক পরিচালনা করতেন আমজাদ হোসেন, তখনকার ক্ষমতাসীনদের খুশি করতেই কিনা কে জানে, এক পর্বে তিনি দেখাচ্ছিলেন, ২৫শে মার্চের কাল রাতেই আত্মগোপন করে থাকা কয়েকজন ছাত্র রেডিওতে মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনছে! সেটাও সহ্য করা গেল। কিন্তু এরপর দেখা গেলো আমজাদ সাহেব ঘোষণার যে অংশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা বলা হয়েছে- সে অংশ কেটে বাদ দিয়েছেন। আপনারা শুনলে খুশি হবেন যে- সেদিনের পর নাটকটি আর একটা পর্বও চালানো যায় নি। কলাকুশলীরাই আর রাজি হয়নি ঐ নাটকে কাজ করতে।’

এই তথ্যগুলোর রেফারেন্স হিসেবে অসংখ্য বই আছে, দলিলপত্র আছে। যে কারো কনফিউশন চাইলেই দুর করা যায় এই ইন্টারনেটের যুগে। এসব ব্যপার নিয়ে এখন বিতর্ক থাকাটাও অযৌক্তিক। সত্যটুকু জানতে ও স্বীকার করতে আপনাকে আওয়ামীলীগ-বিএনপি কিছুই হতে হবে না। আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক প্রোপাগান্ডার ক্ষপ্পরে পড়ে ভুল ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে। তাদের সহজ ভাষায় সত্যিটা জানাতে হবে। আর সেটার দায়িত্ব আমাদেরই।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button