ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

পরীক্ষায় নকল করা কি আমাদের মৌলিক অধিকার?

মানুষটার পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী, মাথার পাগড়িটাও সাদা। একটা সরু গলির মুখ দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরুচ্ছিলেন তিনি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেল, হঠাৎই ১৮-১৯ বছর বয়সী কয়েকজন এসে তাকে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি দিলো, হতভম্ভ হবার মতোই ব্যাপার, ঘটছে টা কি এখানে!

কয়েক সেকেন্ড পরে পেছন থেকে আরেকজন এসে তার পিঠে একটা লাথিই বসিয়ে দিলো, মাথার পাগড়িটা ছিটকে পড়লো মাটিতে। না, সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং নয়, পাবনায় গতকাল এমনই একটা দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষায় নকল করতে না দেয়ার এক শিক্ষকের ওপরে হামলা চালিয়েছে ছাত্র নামধারী কয়েকজন কুলাঙ্গার!

হামলার শিকার হওয়া শিক্ষক মাসুদুর রহমান

হামলার শিকার হওয়া শিক্ষকের নাম মাসুদুর রহমান, তিনি পাবনার সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরে শিক্ষক ক্যাডারে সুপারিশকৃত হয়েছিলেন তিনি। মাসুদুর রহমান নিজেও এই বুলবুল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারপর শিক্ষক হিসেবে চাকুরি করেছেন আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। শেষে প্রজাতন্ত্রের সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে গেজেটভুক্ত হবার পরে নিজের কলেজেই বাংলা বিভাগে এসে যোগ দিয়েছেন।

সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজে যোগদানের আগেও অন্ততপক্ষে দুটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন মাসুদুর রহমান। শিক্ষকতার মহান পেশাটাকে ভালোবেসেই এটার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্ত এই ‘অপরাধে’ যে তাকে এভাবে অপমানিত হতে হবে, সেটা বোধহয় তার সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল না!

গতকাল ছিল এইচএসসি’র লিখিত পরীক্ষার শেষ দিন। পরীক্ষার হলে কড়াভাবে গার্ড দেয়ায় মাসুদুর রহমান কারো কারো চক্ষুশূল হয়েছিলেন আগেই। শেষ দিনে তাই দলবেঁধেই কয়েকজন হামলা চালিয়েছে তার ওপরে। এই অমানুষগুলোকে ছাত্র বলতেও ঘেন্না হচ্ছে, চুরি করতে বাধা দেয়ায় যারা শিক্ষককে কিল-ঘুষি এমনকি লাথি পর্যন্ত মারতে পারে, তারা ছাত্র হতে পারে না কোনভাবেই।

গুগলে একবার সার্চ দিয়ে দেখবেন, ‘নকল করতে না দেয়ায় শিক্ষকের ওপর হামলা’ লিখে। এরকম একশো একটা ঘটনার নজির পাবেন। পাবনাতেই এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে কয়েকবার। বিচারের দাবীতে মানববন্ধন হয়েছে, স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে, শেষমেশ ফলাফল কি সেটা আমাদের জানা নেই। সাতক্ষীরায় তো এসএসসি পরীক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের নকল করতে না দেয়ায় একটা কেন্দ্রে অভিভাবকেরাই হামলা চালিয়েছে শিক্ষকের ওপর! ভাবা যায়?

শিক্ষাগুরুর মর্যাদা সম্পর্কে পড়েছিলাম কাজী কাদের নেওয়াজের কবিতায়- সেখানে দিল্লির বাদশাহ আলমগীর শিক্ষকের ‘শির’ উঁচু করেছিলেন তাকে সম্মান দিয়ে। আর আমরা নকল করতে না দেয়ায় শিক্ষকের ওপর হামলা চালাচ্ছি ন্যাক্কারজনকভাবে, তাকে অপমান অপদস্থ করছি সবার সামনে! মাসুদুর রহমান, আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন প্লিজ!

নিজের পুরাতন কর্মস্থলে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষক মাসুদুর রহমান

এই যে ছেলেগুলো শিক্ষক মাসুদুর রহমানের ওপর হামলা চালালো, এদের কি ভালোমন্দের জ্ঞান নেই? আঠারো উনিশ বছর বয়স এদের, পরিবার থেকে এদেরকে কি আদব-কায়দার শিক্ষা দেয়া হয়নি? একজন শিক্ষকের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হবে, সেটা বাবা-মায়েরা কি তাদেরকে শেখানোর সময় পায়নি?

পাবনার ঘটনায় যারা জড়িত, এদের সবাইকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে যতো শিগগির সম্ভব। নইলে শিক্ষকের ওপর হামলার আগের ঘটনাগুলোর মতো দু’দিন পরে এটাও চাপা পড়ে যাবে, আমাদের গোল্ডফিশ মেমোরিতেও জায়গা হবে না ঘটনাটার। শিক্ষককে যারা সম্মান করতে জানে না, নকল করাকে যারা নিজেদের অধিকার মনে করে, তাদের পড়ালেখা করার কোন অধিকার নেই, মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোরও অধিকার নেই। তাদের জায়গা জেলের চৌদ্দ শিকের ভেতরে, সেখানেই তারা মানানসই।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button