মতামত

এই আপনাদের প্যারিস-লস এঞ্জেলস-সিঙ্গাপুর!

এই মুহুর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের স্টেটমেন্টগুলো লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, তারা এই মুহুর্তে এটা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন দেশে অসীম উন্নয়ন হয়েছে, হচ্ছে। উন্নয়নের জোয়ার, উন্নয়নের মহাসড়ক এই শব্দগুলো এতোবার আপনি টিভিতে রেডিওতে সংবাদপত্রে দেখে বা শুনে থাকবেন যে, আপনি হয়ত ভাবতে পারেন এই এক কথা ছাড়া তারা অন্য কিছু বলে না কেন!

খেয়াল করলে দেখা যাবে, দেশে দুর্নীতি কিংবা অন্য কোনো অভিযোগ নিয়ে কথা উঠলেও সেই প্রসঙ্গের ভেতরেও কোনো না কোনো ভাবে উন্নয়ন প্রসঙ্গ ঢুকে যাবে। অর্থাৎ, রাজনীতিবিদরা এটা প্রমাণ করতে চাইছেন, সমস্যা যাই থাকুক উন্নয়ন তো হচ্ছে। দেশের মানুষ ভাল আছে। এরকম উন্নয়ন আগে কেউ করেছে?

এই বারংবার উন্নয়নতত্ত্বকে ব্যবহার করার মধ্যে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। বর্তমানে সব সমস্যাকে ওভারলুক করা যাচ্ছে এই এক তত্ত্ব দিয়ে। এই যেমন কিছুদিন আগে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলো। অনেক শোরগোল উঠলো। তখন প্রধানমন্ত্রী বললেন, উন্নয়ন চাইলে আন্দোলন না করে গ্যাসের বর্ধিত দাম মেনে নিতে হবে।

উন্নয়ন কতটা হয়েছে এরকম তুলনা বোঝাতে নেতারা এখন বেশ সুন্দর সুন্দর এডজেক্টিভ ব্যবহার করেন। আপনি এও শুনে থাকবেন, রাজনীতিবিদদের মুখে যে দেশ এখন এতোই উন্নত যে আকাশ থেকে দেখলে শহরের কোনো কোনো অংশকে প্যারিস লস এঞ্জেলেস মনে হয়। কোনো কোনো জায়গাকে মনে হয় সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া।

সত্যি কথা বলতে, উন্নয়ন যে হচ্ছে এই কথার সাথে দ্বিমত করা আসলে পাগলামো হবে। তবে উন্নয়ন হচ্ছে বলে দেশে কোনো সমস্যা নেই, উন্নয়ন চাইলেই অনেক কিছু মেনে নিতে হবে – এরকম তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ক্ষতিকর।

উন্নয়নের সাথে সাথে সরকারের নিজেদের যে ব্যয় বাড়ছে সেই ব্যয় সংকুলান করতেও সরকারকে এখন ভাবতে হচ্ছে অনেক পথের কথা। মহাসড়কে টোল বসানোর চিন্তাও করছে সরকার। এতে সাধারণ জনগণের উপরই ঘুরে ফিরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে করের বোঝা বাড়ে। অথচ, যারা কর ফাঁকি দেয়, যাদের খেলাপী ঋণ হাজার হাজার কোটি টাকা, সারা ব্যাংকখাতকে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত, যারা দুর্নীতি করে, যারা সরকারি প্রজেক্টের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে– তাদের উপর কিন্তু অতটা চাপ পড়তে দেখা যায় কদাচিৎই।

এর বাইরে সবচেয়ে অবাক করে নেতা-মন্ত্রীদের অসম তুলনার কথা শুনলে। ঢাকা শহর যে বসবাসের অনুপযোগী এটা বুঝতে এখন আর আমাদের কোনো তালিকার জন্যে বসে থাকতে হয় না। কদিন আগে এশহরে ডেঙ্গু ভয়াবহ রুপ দেখিয়েছে। এখানে নারীদের নিরাপত্তা কম, পাবলিক বাসের সংকট। রাস্তায় অসহনীয় যানজট। বায়ুদূষণ। এখানে নদী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অবস্থা৷ একটা তীব্র ভূমিকম্প হলে এশহরের কি অবস্থা হবে খোদাতায়ালা ভাল জানেন।

কোথাও আগুন লাগলে কি নারকীয় দশা হয় আমরা দেখেছি। কদিন পর পর একেকটা বস্তির হাজার হাজার ঘরবাড়ি আগুনে ছাঁই হয়ে যায়। এখানে ফুটপাতে হাঁটা যায় না৷ খুব কঠিন এক শহর এই ঢাকা। অথচ, এই ঢাকাকে নেতাদের চোখে মনে হয় প্যারিস, লসএঞ্জেলেস! তারা বলেন, অর্থনীতিতে অবদান রাখার হিসেবে আগামী পাঁচবছরে বাংলাদেশ হয়ে যাবে কানাডার সমান। বলেন, এই-শহরের পাবলিক টয়লেট হয়ে গেছে ফাইভস্টার হোটেলের টয়লেটের মতো।

উন্নয়ন

কানাডার সমান হয়ে গেলে অভিনন্দন জানাবো হয়ত, সিঙ্গাপুর হংকংকে জিডিপিতে ছাড়ালেও এটা আনন্দের সংবাদ কিন্তু তাই বলে আমরা সাধারণ জনগণ কি জীবনমানের দিক দিয়ে, নাগরিক সুবিধা, জীবনের নিরাপত্তার দিক থেকে সেইসব দেশকে ছাড়িয়ে গেছি? রাজনীতিবিদদের ছেলেমেয়েরা হয়ত বিদেশে মানুষ হন, তারা গাড়ি, বাড়ি, আর নেতা কর্মীদের ঘেরাও করা এক রাজকীয় ভাবসাবে চলাফেরা করেন। তাদের মুখে অনেক কথা শোভা পায়, কিন্তু তাদের মুখের বাণীর সাথে সাধারণ মানুষের অন্তরের যাতনার মিলন হয় খুব কমই।

সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের জীবনে অনেক সময়ই আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রাপ্তির মিল খুঁজে পায় না। রাজনীতিবিদরা যেসব দেশের সাথে আমাদের তুলনা দিয়ে বেড়ান সেদেশে নাগরিকদের জীবনের সাথে তুলনা করে দেখলে যাতনা আরো বাড়ে। যেমন- আমাদের দেশে এখন বাজারে গরুর মাংসের দাম ৬০০ টাকা। যদিও দাম নির্ধারণ করে দেয়া আছে ৫২৫ টাকা।

দুধের প্যাকেট ৭০ টাকা, আর গরুর ফ্রেশ দুধ রাখলে ৮০-১২০ টাকা পর্যন্ত দাম হয়। এক ডজন ডিম ১০০-১১০ টাকা এখানে। সয়াবিন তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এরকম দ্রব্যমূল্যের দামের খতিয়ান দিলে অনেক দেয়া যায়। উৎসব, উপলক্ষ হলে দ্রব্যমূল্যের দাম আরো বেড়ে যায়। এই যখন অবস্থা তখন আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০০ ডলার। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে অবশ্য আরো কম।

যাইহোক, এখন কানাডার চিত্র দেখা যাক। কানাডায় এক কেজি গরুর মাংস ৪ ডলার বা বাংলা টাকায় ২৫৬ টাকা। দুধ ৮৫ টাকা লিটার। তাদের মাথাপিছু বার্ষিক আয় কত জানেন? আমাদের প্রায় ২৩ গুণ- ৪৫ হাজার ডলার।

আমেরিকার নিউইয়র্কের অবস্থা দেখা যাক। সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫০০ টাকা। ডিমের ডজন ১৬০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ টাকা। দুধের লিটার ৬৫ টাকা। আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় তো ৬০ হাজার ডলার!

বাজার দর, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র

অস্ট্রেলিয়ার মানুষ কেমন আছে? সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৬১ টাকা। এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৪৮৮ টাকা। ডিমের ডজন ২৪৪ টাকা। দাম একটু বেশি লাগছে ডিমের? তাতে কি! অস্ট্রেলিয়ানদের মাথাপিছু আয় ৫৪ হাজার ডলার! আমাদের ২৬ / ২৭ গুণ বেশি তাদের মাথাপিছু আয়।

লন্ডনের দিকে যদি যান, সেখানে গরুর মাংসের কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এক ডজন ডিম ৯০ টাকা। রান্নার তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। দুধের লিটার ৯০ টাকা। মাথাপিছু আয়? প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

কথায় কথায় সিঙ্গাপুরের নাম নেয়া হয়। সিঙ্গাপুরে মানুষের মাথাপিছু আয় কত জানা আছে? ৫৮ হাজার ডলার। আপনি প্রত্যেকটা উন্নত দেশের খতিয়ান দেখেন, যাদের সাথে আমাদের নেতারা তুলনা করেন দেশকে, সবার মাথাপিছু আয় বেশি। জীবনমান উন্নত। নাগরিক সেবা ফার্স্ট ক্লাস। নতুন জন্ম নেয়া শিশু থেকে বৃদ্ধ মানুষ – সবার নাগরিক অধিকার আছে।

এই তথ্যগুলো আপনি নিজেও চাইলে খুঁজে বের করতে পারবেন। কিন্তু কখনো ভুলেও রাজনীতিবিদদের কাছে এসব শোনার আশা করবেন না। তারা আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছে, উন্নয়ন চাইলে মেনে নিতে হবে। বিরোধ করলে উন্নয়নবিরোধী তকমা দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু, যে যৌক্তিক সমালোচনা করে সেও দেশটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে বলেই এই কথাগুলো সামনে আনতে চায়। রাজনীতিবিদরা যে কথা অবশ্য সহ্য করতে পারেন না..

একটা সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকবে, এটা প্রত্যাশিত। কিন্তু, এই উন্নয়নের সাথে জনগণের জীবনমানও কতটুকু সমৃদ্ধ হলো সেটাও লক্ষ্য করা উচিত। আয় বৈষম্য, জীবনমান বৈষম্য যখন বাড়ছে তখন এসব ‘প্যারিস-সিঙ্গাপুর-কানাডা’র গল্প শুনে মনে হয়, আমাদের সাথে রুঢ় রসিকতা করা হচ্ছে। এই শহরের বাস্তবতা মেনে নিয়ে এমন রসিকতা হজম করা খুব মুশকিল হয়ে যায়। খুব মুশকিল…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button