ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

তাহলে কি ছবি না তোলার অপরাধে পতিতা বলা, চরিত্রহনন করাই শিষ্টাচার?

বাংলাদেশে যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচন হয়, সেদিন জাতিসংঘের ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন’ এর ৬৩তম অধিবেশনে শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেল লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে এই সরকারের অর্জনের কথা তুলে ধরছিলেন। সত্যি বলতে নারীর ক্ষমতায়ন পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে, এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ডাকসু নির্বাচনেও আমরা দেখেছি একাধিক নারী ভিপি পদে নির্বাচন করেছেন। নারীদের এই সাহসকে প্রেরণা, আগামীর সু-বার্তা এই দৃষ্টিতেই দেখতে চাই আমরা।

কিন্তু সবসময় নারী মাথা উঁচু করবে এটা অনেকেই সহজ ভাবে নিতে পারে না। নারী স্রোতের বিপরীতে গেলে তাকে চরিত্রহনন করা যেন এক আদিম কৌশল। ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র জোট বেশ আলোচিত হয়েছিল। এই জোটের পক্ষ থেকে ভিপি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন অরণি সেমন্তি খান। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পক্ষ এখন এই প্রার্থীর চরিত্রহননে নেমেছে। ভোটের দিন ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে এই জোট নির্বাচন বর্জন করেছিল সবার আগে। বর্জনের পরও ফলাফল প্রকাশিত হয়। দেখা গেল, ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হলো নুরুল হক নুরু। স্বতন্ত্র জোটের প্রার্থী অরণির অর্জিত ভোট ২৬০০+। এই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে এবং নতুন করে নির্বাচনের দাবিতে পরদিন ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করে ভোট বর্জনকারী সবগুলো দল এবং জোট।

ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন ভিপি না হওয়ায় তার ছাত্রলীগও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ভিপি পদে নতুন করে নির্বাচন চেয়েছে। বিক্ষোভ করেছে ভিসি চত্বরে। তবে শোভনই পরে পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে নিজ থেকে এগিয়ে আসেন। তিনি নুরুকে জড়িয়ে ধরে ফলাফল মেনে নিয়ে একসাথে কাজ করার কথা বলেন। এরপর সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি গিয়েছিলেন স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খানের কাছে। শোভন কুশল বিনিময়ের জন্য হাত বাড়ালে অরণি হ্যান্ডশেক করলেও তারপর একজন শোভন-অরণির একসাথে ছবি তুলার কথা বললে, অরণি সরাসরি প্রত্যাখান করেন। বলেন সন্ত্রাসীদের সাথে তিনি ছবি তুলেন না। শোভনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘না ভাই কালকে রোকেয়া হলে এই লোক নিজে আমাদের বলছে মারধর করতে। এর সঙ্গে ছবি তুলব না। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ছবি তুলি না।’

অরণি সেমন্তি খান

এই ঘটনার পর এক পক্ষ অরণির ‘সাহসে’র প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাদের কাছে অরণি হয়ে যান আইকন। শোভনকে মুখের উপর সন্ত্রাসী বলাটাকে গৌরবের এবং সাহসের প্রতীক হিসেবে ভাবছেন তারা। অনেকেই ফেসবুকে লিখছিলেন, এমন নেতাই চেয়েছিলাম, অরণি আমার ভিপি। অরণিকে এভাবে আইকন বানিয়ে দেওয়ার কাউন্টার যে আসবে সেটা অনুমিতই ছিল। ছাত্রলীগের অনেকেই এই ঘটনাকে বেয়াদবি হিসেবে আখ্যা দিয়ে লিখেছে, অরণির এধরণের আচরণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে পড়ে না। এইটুকু ঠিক ছিল। ছাত্রলীগের কর্মীদের আবেগের জায়গা থেকে তারা ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারবেন না সহজে, এটাই স্বাভাবিক। একই কাজ অরণির সাথে কেউ করলেও অরণির সমর্থকরাও কষ্ট পেতেন হয়ত।

যাইহোক, এরপর যা হলো সেটা রীতিমতো অকল্পনীয়। এই কাজগুলো যারা করেছে তারা ছাত্রলীগ কিনা নাকি নারী বিদ্বেষী নাকি মানসিকভাবে অসুস্থ তা জানি না। অরণি শোভনের সাথে কেন ছবি তুলেননি এটাকে ইস্যু করে তারা একদম অরণির চৌদ্ধগোষ্ঠী উদ্ধার করে ফেলেছেন। অরণিকে কেন্দ্র করে যৌন কল্পনা পর্যন্ত করে ফেলেছেন। অরণিকে বানিয়ে দিয়েছেন পতিতা। অরণিকে আক্রমণ করতে দুনিয়ার যত খারাপ ভাষা ব্যবহার করা যায় সেটাই করেছেন। অরণির চেহারা নিয়ে কথা বলেছেন, শরীর নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন, পরিবার নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন। ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রিত একটি গ্রুপ আছে যার নাম “গুজবে কান দিবেন না”, এই গ্রুপটিতে অরণিকে নিয়ে এইধরণের বেশ কিছু পোষ্ট লক্ষ্য করা গেছে।

অরণি সেমন্তি খান

এরা কিভাবে ছাত্রলীগ হয়? এরা কিভাবে শোভনের সমর্থক হয়? এরা কিভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মী হওয়ার যোগ্যতা রাখে? অরণির শিষ্টাচার নেই এটা প্রমাণ করার জন্য তাকে নিয়ে যৌন সুড়সুড়ি মার্কা কথা বলা, তাকে পর্নস্টারের সাথে তুলনা দেয়া, আরেকজন বাম নেতার সাথে তাকে জড়িয়ে ট্রল করা, তার শরীর নিয়ে কথা বলা কি রকম শিষ্টাচার? এই শিষ্টাচার কে শিখিয়েছে এদের? অনলাইনে এভাবে যৌন হয়রানিমূলক কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের শিষ্টাচারের ট্রেনিং এদের কে দিয়েছে? অরণি ছবি তুলেননি, এটা বেয়াদবি, পারিবারিক অশিক্ষা হলে তাকে পতিতা বলাটা কোন ধরণের পরিবারের শিক্ষা?  

আবার, অরণি শোভনকে ছবি তোলার কথায় ফিরিয়ে দিয়ে কিছু মানুষের বাহবা পেয়েছেন। তার সংজ্ঞা কিংবা তার দেখা চোখে তিনি যাদের সন্ত্রাসী ভাবেন তাদের প্রতি তার ঘৃণা থাকাটা অমূলক নয়। কিন্তু, ঘৃণার প্রতিকারে ঘৃণা দেখানো কখনো কাজের কথা না। আজকে যদি তিনি ভিপি হয়ে যেতেন, তাহলে তিনি কার ভিপি হতেন? তিনি কি বলতেন আমি ছাত্রলীগের যারা সমর্থক তাদের ভিপি না। তারা আমার কাছে আসবা না। আমি ‘সন্ত্রাসী’দের ভিপি না? এমনটা তো নিশ্চয়ই হতো না। আপনি যেখানে একটা গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিনিধি হওয়ার পদে নির্বাচন করছেন, আপনাকে এই গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছুকে ধারণ করতে হবে, সবাইকে ধারণ করতে হবে।

অরণির সাহসের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে এই ভিপি পদে দাঁড়ানোটাই সবচেয়ে বড় সাহসের কাজ ছিল। স্বতন্ত্র একটি জোট করে, পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে নির্বাচন করা, একটি ইশতেহার প্রস্তুত করা, একটা স্বপ্ন নিয়ে ছাত্রদের হয়ে কাজ করার ইচ্ছা রাখা এইসব কিছুই আসলে সাহসের পরিচায়ক। এত ভাল রেজাল্ট করা, ডীনস এওয়ার্ড পাওয়া একজন তরুণী চাইলে যেতে পারতেন বিদেশে, চাইলে এখন বিসিএস নিয়ে মেতে থাকতে পারতেন, চাইলে ভাল বেতনের একটা চাকরি খুঁজতেই পারতেন। নিরাপদ একটা জীবন যাপনের জন্য যা মেধা, যা যোগ্যতা একজনের থাকা উচিৎ, সবই আছে তার।

অরণি সেমন্তি খান

তার যোগ্যতা থাকার পরেও তিনি যে ছাত্রদের হয়ে কথা বলবেন, অন্যায়ের বিপক্ষে লড়াই করবেন সেই কারনে নির্বাচন করতে আসলেন এটা সাহসের পরিচায়ক। আই হেইট পলিটিক্স না বলে, অরণি মাঠে নেমেছেন। এটাই সাহস। অরণি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে অংশ নিয়ে মার খেয়েছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শিক্ষকদের মানববন্ধনের সামনে গিয়ে ক্যাম্পাসে হামলা কেন এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এটা সাহস। প্রশ্ন করতে পারা, অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ানোর শিরদাঁড়া থাকাটা সাহস। সেই সাহসের জন্য অরণিকে সাহসী বলা যায়।

আজকে যারা অরণিকে পতিতা বলে, বেয়াদব বলে একাকার করে ফেলছেন দুনিয়া তাদের এই পর্যন্তই। তাদের সাহস এই পর্যন্তই যে পর্যন্ত গেলে ধাক্কাধাক্কি করে ভাইয়ের সাথে একটা সেলফি তুলা যায়। তাদের সাহস এই পর্যন্তই কপি পেস্ট বক্তব্য দিয়ে সকালে এক কথা, বিকালে এক কথা বলে ভাইয়ের মন যোগানো যায়। তাদের সাহস এই পর্যন্তই একজন নারীকে আদব শেখাতে গিয়ে তাদের যৌন সুড়সুড়ি জেগে উঠে। তারা দুনিয়ার সব পর্নস্টারদের খবর রাখেন, এটাই তাদের সাহস। তারা আই হেইট পলিটিক্স প্রজন্ম নিয়ে হাসাহাসি করবেন, আবার কেউ রাজনীতি করতে চাইলে তার চরিত্রহনন করে থামিয়ে দিতে চাইবেন, এটাই তাদের সাহস।

এদের এই আদব শিক্ষার আয়োজনে কি শোভনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে নাকি শোভন যে হাসিমুখে সৌজন্যতার বার্তা নিয়ে এসেছেন, তার গুরুত্ব খাটো হয়েছে? তাদের এই আদব শিক্ষার পোষ্টে কি প্রধানমন্ত্রীর সম্মান বেড়েছে নাকি নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তিনি যে কাজ করছেন সেটাকে অপমান করা হয়েছে? অরণি শুধু ছবিটাই তুলেনি বলে বেয়াদব, কিন্তু আপনারা যে একেকজন তাকে কথা দিয়েই ধর্ষণ করে ফেলছেন, আপনারা কি তাহলে? একটা অনুরোধ করি, এই ধরণের ‘আদব’ অন্তত নিজ মা-বোন, স্ত্রীর সাথে দেখায়েন না প্লিজ…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button