রক্তাক্ত একাত্তর

অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল লোডিং!

দুই নম্বর সেক্টরের হেডকোয়াটার মেলাঘর থেকে ট্রেনিং নিয়ে মাত্রই ঢাকায় ফিরেছে আরবান গেরিলার প্রথম দলটি। ১৭ জন গেরিলার দলটিতে রয়েছেঃ আলী আহমেদ জিয়াউদ্দীন, মাহবুব আহমাদ(শহীদ), শ্যামল, ভাষণ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাট্যকার অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে), ফতেহ আলী চৌধুরী, আবু সাইদ খান, আনোয়ার রহমান (আনু), মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া), ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ, গাজী গোলাম দস্তগীর, তারেক এম আর চৌধুরী, নজিবুল হক, রেজা( ধানমন্ডি) আব্দুস সামাদ (আড়াইহাজার), জব্বার (রুপগঞ্জ), ইফতেখার এবং হাবিবুল আলম। এদের উপর খালেদ মোশাররফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অপারেশনের দায়িত্ব দিয়েছেন। এই অপারেশনের উপরেই নির্ভর করছে ঢাকায় গেরিলা ওয়্যারফেয়ারের ভবিষ্যৎ।
ঠিক এই অপারেশনের প্ল্যানিং নিয়েই একটা তিন-চার মিনিটের শর্টফিল্ম বানাবার চেস্টা করেছিলাম আমরা ক’জন। একেবারেই অ্যামেচার ট্রাই, হাত মকশো করা আর কি! স্ক্রিপ্টের খসড়া রেডি করে ফেলা হলো, কাস্টিং রেডি, কিন্তু শেষ মুহুর্তে এমন কিছু জায়গা থেকে এমন কিছু ধাক্কা এল যে আর কাজটা শেষ করা হলো না। তবুও আশা ছাড়িনি, হয়তো কোন একদিন এই শর্টফিল্মটা আমরা বানাবো, বানাবোই বানাব!

যদি কেউ আগ্রহী হন এই খসড়া স্ক্রিপ্টটা ফাইনাল করে শর্টফিল্মটা বানাতে, আমাদের আপত্তি নেই। তবে অবশ্যই এই অপারেশনের অন্যতম প্রধান চরিত্র হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের “ব্রেইভ অফ হার্টস” বইটায় থাকা এই অপারেশনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণটা পড়বেন, সেইভাবে স্ক্রিপ্ট তৈরি করবেন। ধন্যবাদ।

লিখেছেন- Rahman Raad ও Anjum Shykh Utchas
***

প্রথম দৃশ্য

রাস্তার পিচের উপর কোন একটা পানি জমাট জায়গায় টপ ভিউ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা পরার একটা সিন ক্যাপচার করা হবে,যেটা ক্যামেরার ফ্রেমের লেফট সাইডে থাকবে।বাকী ফ্রেমে রাস্তাটা থাকবে।

ফ্রেমের একবারে ডান সাইডে ” টাইপ করে আস্তে আস্তে লেখা উঠবে ” ৮ ই জুন ১৯৭১ “সময়ঃ রাত ৮ঃ৩০ মিনিট (লেখার টাইপের আওয়াজ আসবে)

লেখা শেষ হবে ব্যাক গ্রাউন্ডে কুকুর ডাকার আওয়াজ এর সাথে ক্যামেরার ভিউ উপরের দিকে উঠবে,মানে সামনের রাস্তাটা পুরোটা দেখাবে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

ক্যামেরাটা আমরা ধরবো এমন কোন রাস্তার সাইডে যেটার বাম সাইড থেকে আরেকটা রাস্তার মাথা এসে জোড়া হবে, তো সেই রাস্তা থেকেই বাম দিক থেকে স্বপন চাদর গায়ে জড়িয়ে ফ্রেমে আসবে সাইড থেকে (মানে বামের রাস্তা থেকে মিটিং হাউজে যাওয়ার রাস্তায় উঠবে। ফ্রেমে সাইড ভিউ আসবে অর্থাৎ স্বপন ডানে বামে তাকিয়ে তারপর বামে মোড় নেবে এবং চাদরটা আবার ঠিক করে গায়ে দিয়ে হাটা শুরু করবে। পিছন পিছন ক্যামেরাটা ওর হাটা কিছুক্ষন ফলো করবে। তারপর হঠাৎ করেই ক্যামেরা ফোকাস হবে অন্ধকার ঘরের উপর, দরজার বাইরে থেকে অল্প আলো ভেতরে যাচ্ছে, কিন্তু পরিস্কার কিছু দেখা যাচ্ছে না। ব্যাকগ্রাউন্ডে অস্ফুট স্বরে মায়া আর জিয়াকে কথা বলতে শোনা যাবে, ভাষণকে নিয়ে তাদের টুকরো টুকরো উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়-

জিয়াঃ ঢাকা শহরে এতোগুলা সমুন্ধী রাইখা ওরে যুদ্ধে আসতে বলছে কে? মনে চাইতেছিল শালার মাথার উপ্রে…

মায়াঃ আরে থাম তো, আচ্ছা কালকে আর ওরে নিমু না, ঠিক আছে?

তারপর ক্যামেরা আবার রাস্তায় স্বপনের হাটার উপর ফোকাস হবে। এবারো পেছন থেকে। বাড়িতে ঢুকবে, সিড়িতে হালকা পাওয়ারের ফিলিপস বাতির আলোতে স্বপন সিঁড়ি টপকে উঠে দরজায় ১, ২, ১২৩ বা ১১,২২,৩৩ ফরম্যাটে সাংকেতিক আওয়াজ করবে। কিছুক্ষন পর জিয়া দরজা খুলে দেবে। দরজা খোলায় ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হবে। ক্যামেরা চলে যাবে ঘরের ভেতর।

তৃতীয় দৃশ্য

আলম সিগার ধরানোর চেষ্টা করবে। প্রথমবার ধরবে না, বিরক্তিতে একটা গালি বের হয়ে আসবে তার মুখ দিয়ে। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সিগার ধরবে। মোটামুটি ঘুটঘুটে অন্ধকারে সিগারেটের লাইটটাই প্রথম আলোর সাইন হবে। তারপর মায়া ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে মোম ধরাবে। তারপর একটা তোয়ালে ছুড়ে দেবে স্বপনের দিকে। স্বপন মাথামুখ মুছে প্রথম কথাটা জিজ্ঞেস করবে,

– ভাষণ কই?
– (জিয়া তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে) অয় যুদ্ধ করবো নাকি ওর আত্মীয়স্বজন সামলাইবো? আজকের দিনটাই মাটি হইল ওর লাইগা। যেই গাড়িরেই টার্গেট করি, সেইটাতেই তার চাচা-খালু-কাজিন-বন্ধু সহ সকল জ্ঞাতিগুষ্ঠি পাওয়া যায়। লাগে জানি ঢাকা শহরের সবাই তার দুলাভাই লাগে। আপনা আদমি। তাদের গাড়ি সে হাইজ্যাক করতে পারবে না। তা সবার লাইগা তার এতোই যখন দরদ, হালায় যুদ্ধ করতে আইছে ক্যা?

মায়াঃ আগামীকাল আর ওরে নেওন যাইবো না, বুঝলা? প্রিন্স সদরুদ্দীন আগা খান নেতৃত্বে জাতিসংঘ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডেলিগেটরা আগামীকাল সন্ধ্যায় ঢুকবো ইন্টারকন্টিনেন্টালে। এইটাই বেস্ট চান্স। বিকালের মধ্যে যেমনেই হোক একটা গাড়ি হাইজ্যাক করতে হবে। ভাষণরে নিলে দেখা যাবে কালকেও তার ফিউচার শ্বশুরবাড়ীর আত্মীয়স্বজন বাইর হবে গাড়ি থেকে। কালকেও হাইজ্যাক করা হবে না। কোন দরকার নাই। কালকে খালি আমরা চাইরজন আর গাড়ি চালানির লাইগা বাদল ভাই যাবো। ঠিক আছে?

(স্বপনকে মাথা ঝাকাতে দেখা যাবে। জিয়াকে দেখে বোঝা যাবে না সে সায় দিয়েছে কিনা, পেছনে আলম চুপচাপ সিগারেট টানতে থাকবে।)

স্বপনঃ কি আর করা, এইটা ছাড়া তো আর কোন উপায় নাই। ও থাকুক, পরে অন্য কোন অপারেশনে যাবে।

মায়াঃ হ, সেইটাই। এইটা প্রথম হিট, খুব সিরিয়াসলি নিতে হইব। পাইক্কারা দুনিয়া জুড়ে বইলা বেড়াচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান পুরা কন্ট্রোলে, পরিস্থিতি পুরা স্বাভাবিক। ২০০ কোটি টাকা ঋণ পাইবো ইয়াহিয়া সরকার যদি এই প্রোপ্যাগান্ডা পাকিস্তান গর্ভমেন্ট ডেলিগেটগুলারে খাওইয়াইতে পারে। বুঝতেই পারতেছ অর্থনৈতিক সাহায্যের কথা বইলা এই টাকাটা নিয়া শালারা আরো অস্ত্র কিনবো আমাগোরে মারার লাইগা। এইটা হইতে দেওয়া যাবে না। যেমনেই হোক এদের ভয় দেখাইতে হবে। ডেলিগেটদের গাড়ি উড়ায়া দিবো আগামীকাল আমরা।

স্বপনঃ কিন্তু মেলাঘর থেকে না খালেদ মোশাররফ বলছিলেন ঢাকার আশেপাশে তিন চার কিলোমিটারের মধ্যে গ্রেনেডগুলা ফাটাইতে?

মায়াঃ আরে ধুর, যদি ভয় দেখাইতেই হয়, অতদূরে যাবো কেন? সরাসরি হোটেলে অ্যাটাক করবো আর ডেলিগেটদের গাড়ি উড়ায়া দিমু, যেন কয়েকটা মরে আর বাকিগুলা জান নিয়া পালায়া যায়।

(জিয়া মাঝপথে থামাবে মায়াকে) ডেলিগেটগুলারে পালাইতে দিমু ক্যান? সবগুলারে নগদে ফালায়া দিমু, কাহিনি খতম।গ্রেনেডে যেগুলো মরবে না, দরকার হইলে স্বপন পিস্তল দিয়া গুলি কইরা মারবে সেইগুলারে।

মায়াঃ আরে না না, সবগুলারে মাইরা ফেলার সময় কই? পাইক্কারা ঘিরা ফালাইবো না? রিস্ক আছে বহুত। মনে নাই মেলাঘর থেকে কি অর্ডার দেওয়া হইছে? খালেদ মোশাররফ এই অপারেশনের দায়িত্ব আলমরে দেওয়ার আগে বারবার করে বলছেন, সম্মুখ যুদ্ধে জড়াবা না, অপারেশনটা জাস্ট হিট অ্যান্ড রান টাইপ হবে।সম্মুখ যুদ্ধে জড়ানোর মত ট্রেইন্ড না আমরা, আর কোনভাবে আমাদের মধ্যে কেউ ধরা পড়ে গেলে বিশাল ক্ষতি, ঢাকার গেরিলা ওয়ারফেয়ার তিন মাসের জন্য পিছায়া যাবে। সুতরাং আমরা স্রেফ গ্রেনেডগুলা দিয়া গাড়ি ঊড়ায়াই রিট্রিট করবো, এতে কতগুলা মরবে আর বাকিরা এমন ভয় পাবে যে জিন্দেগীভর স্মরন রাখবে।

স্বপনঃ এইটা অবশ্য ভালো বলছো। ঠিক আছে, এইটাই সই। গ্রেনেড নিবো কয়টা করে আমরা?

মায়াঃ আলম আমারে একটু আগে পুরা প্ল্যানটা বুঝায়া বলছে।শুনো, আমি, আলম আর জিয়া গ্রেনেড থ্রো করবো। প্রত্যেকের কাছে তিনটা করে “পাইন অ্যাপেল” থাকবে। তুমি পিস্তল দিয়া কাভার দিবা বাই এনি চান্স কোন গড়বড় হইলে। বিকালে বাদল ভাই তার মাজদা গাড়িটা দিয়ে যেকোন একটা গাড়ি আটকাবে সামনে দিয়ে আর পেছন থেকে আলম তার ট্রায়াম্ফ হেরাল্ড দিয়ে ব্যারিকেড দেবে। তারপর গাড়িটা নিয়ে আমরা রাত আটটার আগেই চলে যাবো ইন্টারকন্টিনেন্টালে,প্রেসিডেন্ট ভবনের ডানে মোড় নিয়ে তিন রাস্তার মাঝখানের বড় গাছ পার হয়ে সরাসরি হোটেল সাকুরার সামনে দিয়ে হোটেলের গেইটের সামনে পজিশন নিমু। গাড়ি থামার পর আলম সংকেত দিলে একলগে সবার গ্রেনেড চার্জ করবো গাড়িটার উপর। এনি কোশ্চেন?

স্বপনঃ হোটেলের সামনে কি সবগুলা গ্রেনেড চার্জ করা হবে?

মায়াঃ না। আমাদের কাছে থাকবে মোট নয়টা গ্রেনেড, প্রত্যেকের কাছে তিনটা করে। হোটেলের সামনে চার-পাঁচটা ফাটানোর পর যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি নিয়ে বেইলি রোড হয়ে মতিঝিলে মর্নিং নিউজ অফিসের কাছে চলে আসবো। অফিসের বাউন্ডারির ওপর দিয়ে দুইটা গ্রেনেড থ্রো করেই সটকে পড়বো। রমনা থানার পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে মগবাজার কাজী অফিসের উল্টা দিকে গোলাম আজমের বাড়ির দুই তলায় বাকি দুইটা গ্রেনেড মারা হবে। মোট নয়টা পাইন অ্যাপেল গ্রেনেডে কালকে ঢাকা কাঁপায়া দিমু। ঠিক আছে?

(পেছন থেকে আলমের ভারী গলা শোনা যাবে)

আলমঃ টাইমিং ইজ এভ্রিথিং। এক চুল এদিক ওদিক হলেই কিন্তু আমরা বিপদে পড়ে যাবো। হেজিটেট করা যাবে না, কনফিউজড হওয়া যাবে না। আহত হলেও সমস্যা, ধরা তো পড়া যাবেই না। সুতরাং খুব বেশি রিস্ক নেবো না আমরা। ঠিক আছে?

(স্বপনকে মাথা ঝাঁকাতে দেখা গেল। জিয়া বরাবরের মতই নির্লিপ্ত, তবে চোখদুটো চকচক করে উঠলো ওর। মায়া মুখ খুললো আবার)

মায়াঃ অপারেশন শেষ কইরাই আমরা অতি দ্রুত যার যার বাসায় ফিরা যাবো। পরেরদিন সকালেই আমি, মায়া আর জিয়া মেলাঘর চলে যাবো। স্বপন, তুমি চুল্লু ভাইয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবা। এদিকে খেয়াল রাখবা। টু আইসি শহীদরে দেওয়ার লাইগা আলম একটা চিঠি রাইখা যাবে তার বোনের কাছে। সে বাকিদের খোজখবর রাখবে। ইজ এভ্রিথিং ক্লিয়ার?

( স্বপন আর জিয়া দুজনেই মাথা ঝাঁকাবে এবার। মায়া পেছনে ঘুরে আলমের দিকে তাকাবে, জিজ্ঞেস করবে, “কোন পয়েন্ট বাদ গেছে?” আলম বলবে, “না, আগামীকাল সবাই বিকালের মধ্যে গুলশান মোড়ে হাজির থাকবা। দেরি যেন না হয়। বিদায়।” এরপর মায়া ফু দিয়ে মোমটা নিভিয়ে দেবে)

পর্দা অন্ধকার হয়ে যাবে। হঠাৎ একটা পত্রিকা ফোল্ডেড হয়ে পর্দার উপর এসে পড়বে, ধীরে ধীরে সেটার শিরোনামটা স্পষ্ট হবে। দেখা যাবে, সেটা ১০ই জুন,১৯৭১ সালের দৈনিক বাঙলা পত্রিকার শিরোনাম, বিচ্ছুদের অপারেশনের খবর বড়বড় হরফে ফুটে উঠেছে। এর নিচে আস্তে আস্তে লেখা খালেদ মোশাররফের ডায়ালগটা লাল বড় বড় হরফে উঠতে থাকবে, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল! বললাম, ঢাকার বাইরে বিস্ফোরণ ঘটাতে আর ওরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছে।’

সবার শেষে তারিখটা উঠবে। ৯ই জুন, ১৯৭১…

পর্দা পড়বে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button