ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দম্ভকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল!

দুই নম্বর সেক্টরের হেডকোয়াটার মেলাঘর থেকে ট্রেনিং নিয়ে মাত্রই ঢাকায় ফিরেছে আরবান গেরিলার প্রথম দলটি। ১৭ জন গেরিলার দলটিতে রয়েছেঃ আলী আহমেদ জিয়াউদ্দীন, মাহবুব আহমাদ (শহীদ), শ্যামল, ভাষণ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাট্যকার অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে), ফতেহ আলী চৌধুরী, আবু সাইদ খান, আনোয়ার রহমান (আনু), মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া), ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ, গাজী গোলাম দস্তগীর, তারেক এম আর চৌধুরী, নজিবুল হক, রেজা( ধানমন্ডি) আব্দুস সামাদ (আড়াইহাজার), জব্বার (রুপগঞ্জ), ইফতেখার এবং হাবিবুল আলম। এদের উপর খালেদ মোশাররফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অপারেশনের দায়িত্ব দিয়েছেন। এই অপারেশনের উপরেই নির্ভর করছে ঢাকায় গেরিলা ওয়্যারফেয়ারের ভবিষ্যৎ। ঢাকার এই অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল- হিট অ্যান্ড রান!

যদিও তাদের মূল টার্গেট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ (সাবেক হোটেল শেরাটন এবং বর্তমানে রূপসী বাংলা) অবস্থান নেওয়া বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআরের ডেলিগেট টিমকে ভয় দেখানো, তবুও তাদের বলা হয়েছে ঢাকার আশেপাশে গ্রেনেড ফাটাতে। কোনভাবেই যেন পাকিস্তানীদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে না জড়ায় গেরিলারা, সে ব্যাপারে কড়া অর্ডার দিয়েছিলেন মেজর এটিএম হায়দার এবং শহীদুল্লাহ খান বাদল। কারণ, একে তো গেরিলাদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই, দ্বিতীয়ত শুরুতেই সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তানীদের সাথে লড়াইয়ে নামার কোন পরিকল্পনা ছিল না হাই কমান্ডের। গেরিলাদের দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১২টি গাঢ় কালচে বাদামি রং-এর ‘পাইন আপেল টাইপ’ হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি করে বেয়নেট। একশ’ ষাট রূপী (তৎকালীন পাকিস্তানী মুদ্রা) নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে তারা সবাই ঢাকায় পৌঁছেছিল ৩রা জুন। 

অপারেশনের জন্য প্রাথমিকভাবে গেরিলা জিয়া, মায়া, স্বপন, ভাষণ, হাবিবুল আলম এবং ভাষণের মামা মুনির আলম মির্জা (বাদল) নির্বাচিত হলেন। স্বপন আগেই জানিয়েছিল যে তার কাছে একটা পিস্তল আছে কাভারিং ফায়ার দেওয়ার জন্য। অপারেশনের জন্য একটা গাড়ির প্রয়োজন ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো সবাই মিলে গুলশান ১ নম্বর গোলচত্ত্বর থেকে একটা গাড়ি হাইজ্যাক করা হবে। সিদ্ধান্ত মত ৭ই জুন থেকেই গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টা শুরু করে গেরিলারা। কিন্তু প্রথম দিন ভাষণের জন্য কোন গাড়িই ছিনতাই করা যায়নি। যতগুলো গাড়ি যাচ্ছিল, সেগুলোর মালিকেরা হয় ভাষণকে চেনেন, অথবা ভাষণ তাদের চেনে। হয় তাদের আত্মীয় বা বাবার সহকর্মী। দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ৮ই জুনেও একই অবস্থা, যে গাড়িই পছন্দ হয়, সেই গাড়ি দেখেই ভাষণ বলে, এটা আমার চাচা বসে আছেন, অথবা ওটায় আমার খালুর ভাই বসে আছেন, ছিনতাই করা যাবে না। বিরক্ত হয়ে সেদিনও গাড়ি ছিনতাই না করে সবাই ফিরে আসে তাদের আস্তানায়।

আবছা আলোয় ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে টুকরো টুকরো কথা। ভেতরে বসে আছে তিনজন, আলম, মায়া এবং জিয়াউদ্দিন।সবাই খুব বিরক্ত। তাদের টুকরো টুকরো কথা শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝেঃ

জিয়াঃ ঢাকা শহরে এতোগুলা সমুন্ধী রাইখা ওরে যুদ্ধে আসতে বলছে কে? মনে চাইতেছিল শালার মাথার উপ্রে…

মায়াঃ আরে থাম তো, আচ্ছা কালকে আর ওরে নিমু না, ঠিক আছে?

একটু পর দরজায় সাংকেতিক শব্দে নক হলো। জিয়া উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই স্বপন দ্রুত পায়ে ঢুকে পড়লো। আলম একটা সিগার ধরানোর চেষ্টা করছে। প্রথমবার ধরলো না, বিরক্তিতে একটা গালি বের হয়ে এলো তার মুখ দিয়ে। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সিগার ধরলো। তারপর মায়া ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে মোম ধরালো। তারপর একটা তোয়ালে ছুড়ে দিল স্বপনের দিকে। স্বপন মাথামুখ মুছে প্রথম কথাটা জিজ্ঞেস করলো, 

– ভাষণ কই?
– (জিয়া তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো) অয় যুদ্ধ করবো নাকি ওর আত্মীয়স্বজন সামলাইবো? আজকের দিনটাই মাটি হইল ওর লাইগা। যেই গাড়িরেই টার্গেট করি, সেইটাতেই তার চাচা-খালু-কাজিন-বন্ধু সহ সকল জ্ঞাতিগুষ্ঠি পাওয়া যায়। লাগে জানি ঢাকা শহরের সবাই তার দুলাভাই লাগে। আপনা আদমি। তাদের গাড়ি সে হাইজ্যাক করতে পারবে না। তা সবার লাইগা তার এতোই যখন দরদ, হালায় যুদ্ধ করতে আইছে ক্যা?

মায়াঃ আগামীকাল আর ওরে নেওন যাইবো না, বুঝলা? প্রিন্স সদরুদ্দীন আগা খান নেতৃত্বে জাতিসংঘ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডেলিগেটরা আগামীকাল সন্ধ্যায় ঢুকবো ইন্টারকন্টিনেন্টালে। এইটাই বেস্ট চান্স। বিকালের মধ্যে যেমনেই হোক একটা গাড়ি হাইজ্যাক করতে হবে। ভাষণরে নিলে দেখা যাবে কালকেও তার ফিউচার শ্বশুরবাড়ীর আত্মীয়স্বজন বাইর হবে গাড়ি থেকে। কালকেও হাইজ্যাক করা হবে না। কোন দরকার নাই। কালকে খালি আমরা চাইরজন আর গাড়ি চালানির লাইগা বাদল ভাই যাবো। ঠিক আছে?

স্বপনঃ কি আর করা, এইটা ছাড়া তো আর কোন উপায় নাই। ও থাকুক, পরে অন্য কোন অপারেশনে যাবে।

মায়াঃ হ, সেইটাই। এইটা প্রথম হিট, খুব সিরিয়াসলি নিতে হইব। পাইক্কারা দুনিয়া জুড়ে বইলা বেড়াচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান পুরা কন্ট্রোলে, পরিস্থিতি পুরা স্বাভাবিক। ২০০ কোটি টাকা ঋণ পাইবো ইয়াহিয়া সরকার যদি এই প্রোপ্যাগান্ডা পাকিস্তান গর্ভমেন্ট ডেলিগেটগুলারে খাওইয়াইতে পারে। বুঝতেই পারতেছ অর্থনৈতিক সাহায্যের কথা বইলা এই টাকাটা নিয়া শালারা আরো অস্ত্র কিনবো আমাগোরে মারার লাইগা। এইটা হইতে দেওয়া যাবে না। যেমনেই হোক এদের ভয় দেখাইতে হবে। ডেলিগেটদের গাড়ি উড়ায়া দিবো আগামীকাল আমরা।

স্বপনঃ কিন্তু মেলাঘর থেকে না খালেদ মোশাররফ বলছিলেন ঢাকার আশেপাশে তিন চার কিলোমিটারের মধ্যে গ্রেনেডগুলা ফাটাইতে?

মায়াঃ আরে ধুর, যদি ভয় দেখাইতেই হয়, অতদূরে যাবো কেন? সরাসরি হোটেলে অ্যাটাক করবো আর ডেলিগেটদের গাড়ি উড়ায়া দিমু, যেন কয়েকটা মরে আর বাকিগুলা জান নিয়া পালায়া যায়।

(জিয়া মাঝপথে থামালো মায়াকে) ডেলিগেটগুলারে পালাইতে দিমু ক্যান? সবগুলারে নগদে ফালায়া দিমু, কাহিনি খতম।গ্রেনেডে যেগুলো মরবে না, দরকার হইলে স্বপন পিস্তল দিয়া গুলি কইরা মারবে সেইগুলারে।

মায়াঃ আরে না না, সবগুলারে মাইরা ফেলার সময় কই? পাইক্কারা ঘিরা ফালাইবো না? রিস্ক আছে বহুত। মনে নাই মেলাঘর থেকে কি অর্ডার দেওয়া হইছে? খালেদ মোশাররফ এই অপারেশনের দায়িত্ব আলমরে দেওয়ার আগে বারবার করে বলছেন, সম্মুখ যুদ্ধে জড়াবা না, অপারেশনটা জাস্ট হিট অ্যান্ড রান টাইপ হবে।সম্মুখ যুদ্ধে জড়ানোর মত ট্রেইন্ড না আমরা, আর কোনভাবে আমাদের মধ্যে কেউ ধরা পড়ে গেলে বিশাল ক্ষতি, ঢাকার গেরিলা ওয়ারফেয়ার তিন মাসের জন্য পিছায়া যাবে। সুতরাং আমরা স্রেফ গ্রেনেডগুলা দিয়া গাড়ি ঊড়ায়াই রিট্রিট করবো, এতে কতগুলা মরবে আর বাকিরা এমন ভয় পাবে যে জিন্দেগীভর স্মরন রাখবে। 

স্বপনঃ এইটা অবশ্য ভালো বলছো। ঠিক আছে, এইটাই সই। গ্রেনেড নিমু কয়টা করে আমরা?

মায়াঃ আলম আমারে একটু আগে পুরা প্ল্যানটা বুঝায়া বলছে।শুনো, আমি, আলম আর জিয়া গ্রেনেড থ্রো করবো। প্রত্যেকের কাছে তিনটা করে “পাইন অ্যাপেল” থাকবে। তুমি পিস্তল দিয়া কাভার দিবা বাই এনি চান্স কোন গড়বড় হইলে। বিকালে বাদল ভাই তার মাজদা গাড়িটা দিয়ে যেকোন একটা গাড়ি আটকাবে সামনে দিয়ে আর পেছন থেকে আলম তার ট্রায়াম্ফ হেরাল্ড দিয়ে ব্যারিকেড দেবে। তারপর গাড়িটা নিয়ে আমরা রাত আটটার আগেই চলে যাবো ইন্টারকন্টিনেন্টালে,প্রেসিডেন্ট ভবনের ডানে মোড় নিয়ে তিন রাস্তার মাঝখানের বড় গাছ পার হয়ে সরাসরি হোটেল সাকুরার সামনে দিয়ে হোটেলের গেইটের সামনে পজিশন নিমু। গাড়ি থামার পর আলম সংকেত দিলে একলগে সবার গ্রেনেড চার্জ করবো গাড়িটার উপর। এনি কোশ্চেন?

স্বপনঃ হোটেলের সামনে কি সবগুলা গ্রেনেড চার্জ করা হবে?

মায়াঃ না। আমাদের কাছে থাকবে মোট নয়টা গ্রেনেড, প্রত্যেকের কাছে তিনটা করে। হোটেলের সামনে চার-পাঁচটা ফাটানোর পর যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি নিয়ে বেইলি রোড হয়ে মতিঝিলে মর্নিং নিউজ অফিসের কাছে চলে আসবো। অফিসের বাউন্ডারির ওপর দিয়ে দুইটা গ্রেনেড থ্রো করেই সটকে পড়বো। রমনা থানার পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে মগবাজার কাজী অফিসের উল্টা দিকে গোলাম আজমের বাড়ির দুই তলায় বাকি দুইটা গ্রেনেড মারা হবে। মোট নয়টা পাইন অ্যাপেল গ্রেনেডে কালকে ঢাকা কাঁপায়া দিমু। ঠিক আছে?

(পেছন থেকে আলমের ভারী গলা শোনা গেলো)

আলমঃ টাইমিং ইজ এভ্রিথিং। এক চুল এদিক ওদিক হলেই কিন্তু আমরা বিপদে পড়ে যাবো। হেজিটেট করা যাবে না, কনফিউজড হওয়া যাবে না। আহত হলেও সমস্যা, ধরা তো পড়া যাবেই না। সুতরাং খুব বেশি রিস্ক নেবো না আমরা। ঠিক আছে?

মায়াঃ অপারেশন শেষ কইরাই আমরা অতি দ্রুত যার যার বাসায় ফিরা যাবো। পরেরদিন সকালেই আমি, মায়া আর জিয়া মেলাঘর চলে যাবো। স্বপন, তুমি চুল্লু ভাইয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবা। এদিকে খেয়াল রাখবা। টু আইসি শহীদরে দেওয়ার লাইগা আলম একটা চিঠি রাইখা যাবে তার বোনের কাছে। সে বাকিদের খোজখবর রাখবে। ইজ এভ্রিথিং ক্লিয়ার?

পরদিন ৯ই জুন, ১৯৭১। ঠিক আগের দিনের প্ল্যানমত সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে একটা নীল ডাটসান ১০০০ গাড়ি ছিনতাই করলো ওরা। ড্রাইভিং শুরু করলেন ক্যামেরাম্যান বাদল, পাশেই পিস্তল হাতে বসে ছিলেন স্বপন। পিছনের আসনের বাম দিকে জানালার পাশে মায়া, ডান দিকের জানালার পাশে হাবিবুল আলম আর দুজনের মাঝখানে জিয়া। এই অপারেশনের জন্য পেছনে বসা তিনজন তিনটা করে সবমিলিয়ে নয়টা পাইন অ্যাপেল গ্রেনেড নিয়েছিল। গাড়িটি প্রেসিডেন্ট ভবন (বর্তমানে সুগন্ধা) ছাড়িয়ে ডানে মোড় নিয়ে তিন রাস্তার মাঝখানের বড় রাস্তা পেরিয়ে বাম দিকে মোড় নেয়। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সীমানা দেয়াল। ধীর গতিতে গাড়িটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বাদল, গেরিলারা দেখতে পেলো হোটেলের দেয়ালের উপর বসা নানা ধরণের টুপি পড়ে অনেক মানুষ অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে হোটেলের দরজার দিকে। যেন নামীদামী কোন মানুষকে দেখতে বা স্বাগত জানাবার অপেক্ষায় আছে তারা। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এগুলো হচ্ছে চাটুকার শ্রেণীর বাঙ্গালী, বিহারী কিংবা রাজাকার!

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ঠিক মাঝ বরাবর পৌঁছে হঠাৎ গেরিলারা সাইরেনের শব্দ পেল এবং দেখলো সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের একটি এস্কর্ট দল ময়মনসিংহ রোড হয়ে আসছে। আর পেছন পেছন আসছে পুলিশের আরও দু-তিনটি গাড়ি। শেষ গাড়িটি ছিল ৬০ দশকের মাঝামাঝি মডেলের একটি শাদা শেভ্রোলেট, যার মাঝ বরাবর চকলেট রঙ-এর ডোরা দাগ। প্রচণ্ড নিরাপত্তা দেখেই বোঝা গেল এ গাড়িতেই আছে ডেলিগেটেরা, যাদের জন্য মতিনগর থেকে পাঠানো হয়েছে গেরিলাদের। পাহারার মাঝ দিয়ে গাড়িগুলো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে ঢুকে পড়লো।

সাথে সাথে বাদল মিন্টো রোডের দিক থেকে একটা শার্প ইউটার্ন নিয়ে ফুটপাত সংলগ্ন হোটেলের ছোট গেটে এসে থামালো গাড়িটা। তখনকার নিয়ম ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দহলিজ বা টেরেস এবং তার রিভলভিং এনট্রান্স বা ঘুর্ণায়মান প্রবেশ পথ বরাবর ছোট গেটটি দিয়ে পথচারীরা হোটেলে ঢুকতে পারতেন। গাড়িবহর দেখা মাত্রই হোটেলের দেওয়ালের উপর বসে থাকা বা হাঁটতে থাকা বেঈমান বাঙ্গালীরাহাত তালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে উঠলো। তারা খেয়ালি করেনি যে একটা সাদা ডাটসান থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে চারজন মুক্তিযোদ্ধা হেঁটে তাদের পেছনের ছোট গেটটির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য খেয়াল করলেও তারা কিছু বুঝতো কিনা সন্দেহ, কারণ এই আরবান গেরিলাদের বেশ দামী পোশাক পড়া সভ্য ভব্য চলাফেরা দেখে নবোঝার কোন উপায় ছিল না যে কি দুর্দমনীয় সাহসী এরা!

যাই হোক, ততক্ষণে হোটেলের টেরেস বরাবর এবং রিভলভিং এনট্রান্সের পাশেই সাবধানে নিঃশব্দে ৩ থেকে ৪ ফুট দূরে দূরে পজিশন নিয়েছে আলম,মায়া ও জিয়া। আর একটু দূরে স্বপন শার্টের নিচে পিস্তলের বাঁটে হাত রেখে অপেক্ষা করছিল।  গাড়িটা থামতেই আলম গ্রেনেড থেকে পিন খুলে দেখে যে জিয়া ততক্ষণে তার গ্রেনেড ছুঁড়ে মেরেছে, প্রচন্ড বিস্ফোরণের প্রকট আওয়াজের পর ওরা দেখলো গাড়িটা উল্টে গিয়ে টেরেসের কোণায় গিয়ে পড়েছে। গাড়ি থেকে দুজন বের হবার চেষ্টা করছে। ঠিক সে মুহুর্তে আলম তার গ্রেনেড ছোঁড়ে, সেটা গিয়ে পড়লো রিভলভিং দরজার কাছে, সাথে সাথে মায়ার ছোঁড়া তৃতীয় গ্রেনেডটাও পড়লো একই জায়গায়!

ততক্ষণে চারদিকে প্রচণ্ড শোরগোল আর হতবিহবল পাকিস্তানী সেনাদের মাঝেই নিজের দ্বিতীয় এবং সবমিলিয়ে চতুর্থ গ্রেনেড ছোঁড়ে জিয়া। উল্টে যাওয়া গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে গ্রেনেডটা ভেতরে পড়েই বিস্ফোরিত হয় এবং আলম দেখতে পায় শেভ্রোলেট গাড়িটির পেছন দিকটা হঠাৎ তিন-চার ফুট উপরে উঠে গিয়ে আবার নিচে পড়লো। সম্ভবত মায়া তারপর আরও গ্রেনেড ছুঁড়েছিল, ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তুপে অন্ধকার হয়ে যায় চারদিক।

সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! প্রচন্ড শোরগোলের ভেতর সবাই নিজের চোখে প্রথমবারের মত ভয়ংকর পাকিস্তানীদের উপর অসমসাহসে আক্রমণ দেখলো। সাথে সাথেই গেরিলা চারজন গাড়িতে উঠতে না উঠতেই এক্সিলেটরে পা দাবিয়ে গাড়ি টান দিল বাদল। ঘুরিয়ে মিন্টো রোড ধরে ফেরার পথে গেরিলারা দেখলো যে হোটেলের সীমানা দেয়ালে বসে থাকা সব বেইমানগুলো প্রাণভয়ে পালিয়েছে, চারপাশে স্যান্ডেল, লুঙ্গি আর মাথার টুপি পড়ে আছে অনেক। এরপর গাড়িটা সুগন্ধার পাশ দিয়ে বেইলী রোডে ঘুরিয়ে ডানদিকে সামরিক জান্তা সরকারের অন্যতম দৈণিক পত্রিকা মর্নিং নিউজ অফিসের পাশে নিয়ে আসে বাদল। গাড়িটা একটু স্লো করে পত্রিকা অফিসের সীমানাদেওয়ালের উপর দুটো গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে আলম, প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে আশপাশ। এরপর দ্রুত সেখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে রমনা থানার পাশ দিয়ে মগবাজারের কাজী অফিসের পাশে জামায়াতের আমীর ও গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড গোলাম আজমের বাসভবনের পাশে আসে ওরা, বাড়ির উপর দুটো পর পর দুটো গ্রেনেড ছোঁড়ে মায়া। গ্রেনেড দুটো গিয়ে বাড়ির ভেতরে আঘাত হানলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন বাসায় গোলাম আজম ছিল না। সেদিনি গোলাম আজম শেষ হয়ে গেলে হয়তো আজ আমাদের ইতিহাসটা অন্যরকম হতেও পারতো।

দ্রুতগতিতে সেখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে প্ল্যানমত যে যার বাসায় চলে যায়। পরবর্তীতে তারা মেলাঘরে ফেরার পর গেরিলারা এই অপারেশনের সাফল্য সম্পর্কে জানতে পারে। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ আগেই বিবিসি এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও’র খবরে অপারেশনের কথা জানতে পেরেছিলেন। এই অপারেশন করার কথা ছিলো ইন্টার কন্টিনেন্টালের আশেপাশের এলাকায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা হোটেল ইন্টাকন্টিনেন্টালে আক্রমণ করে তুলকালাম বাঁধিয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাসীই শুধু বিস্মিত হয়নি। বিস্মিত হয়েছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ এবং ক্যাপ্টেন হায়দারও। বিশেষ করে খালেদ তো বিবিসিতে এই খবর শুনে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল! বললাম, ঢাকার বাইরে বিস্ফোরণ ঘটাতে আর ওরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছে।’

সেই থেকেই এই মুক্তিপাগল আরবান গেরিলা দলের নাম ক্র্যাক প্লাটুন।

৯ই জুন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে চালানো গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঠিক যে জায়গাটা প্রকম্পিত হয়েছিল, মাত্র দুই মাসের মাথায় ঠিক একই জায়গায় আবারো চালানো হয় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। আগস্টের ১১ তারিখ পরিচালিত সেই অভিযানে পাকিস্তানীদের নাকের ডগার সামনে দিয়ে উড়ে যায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের লাউঞ্জ এরিয়া, ভেঙ্গে পড়ে একাংশ।  আন্তঃমহাদেশীয় আভরণ আর অবয়বে পাশ্চাত্যের জৌলুস নিয়ে তৎকালীন ঢাকার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল রাষ্ট্রীয় সম্মানিত অতিথি তথা তাবৎ পৃথিবীর পর্যটক, সফরকারী সরকারী-বেসরকারী প্রতিনিধি, বিদেশী সাংবাদিক-শিল্পীদের কাছে ভীষণ সমাদৃত ছিলো । সংক্ষেপে কেউ কেউ একে “ঢাকা ইন্টারকন” নামেও ঢাকতো । অধিকৃত ঢাকা নগরীতে এই হোটেলটি ছিলো আন্তর্জাতিক কর্মপ্রবাহের অন্যতম প্রাণ-কেন্দ্র । আর এখানেই ক্র্যাক-প্লাটুনের দুর্ধর্ষ গেরিলাদের অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’দুবার চালানো আক্রমণে হতবিহবল হয়ে পড়ে পাকিস্তানী সাম্রিক জান্তা। পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয় পাকিস্তানীদের অক্ষমতা আর গেরিলাদের অসমসাহসী শক্তিমত্তা!

মাত্র ১৮ বছর বয়সী ক্র্যাক-প্লাটুনের সর্বকনিষ্ঠ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবু বকর ছিলেন ঢাকা ইন্টারকনে দ্বিতীয় দফায় বিস্ফোরণ ঘটানোর মূল নায়ক । ঢাকা ইন্টারকনে দ্বিতীয় দফায় আরো একবার ঝাঁকুনি দেবার ইচ্ছাটা বেশ কিছু দিন থেকে মুক্তিবাহিনীল গেরিলারা মনের মধ্যে পোষণ করছিলো । কিন্তু ৯ই জুন রাতে বিস্ফোরণের ঘটনার পর হোটেলের চারপাশে বসেছিলো কড়া পাহারা। মোতায়েন করা হয়েছিলো খানসেনা, পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ, হোটেলের তিন কোণে ছিল বালির বস্তায় তৈরি চেকপোস্ট এবং বাংকার, সেখানে সার্বক্ষণিক লাইট মেশিনগান, এস.এল.আর বা জি-৩ এর নল উঁচু হয়ে রয়েছে । এছাড়াও হোটেলের নিজস্ব গার্ড তো ছিলোই । হানাদার খানসেনা ও পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ হোটেলেকে বলতে গেলে রীতিমত দুর্ভেদ্য দুর্গ বানিয়ে ফেলেছিলো । এমতাবস্থায় হোটেল ইন্টারকনে অকারণে বা মোটামুটি প্রয়োজনে প্রবেশ করা তখন একথায় দুঃসাধ্য কাজ ছিলো ।

কিভাবে আক্রমণ চালানো যায় তা নিয়ে অনেক ভেবেও অখন উপায় পাওয়া যাচ্ছে না, তখন এগিয়ে এলেন অন্যতম জ্যৈষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা   নিওন সাইন এবং গ্লো-সাইন এর মালিক জনাব আবদুস সামাদ। হোটেল ইন্টারকনের বিভিন্ন দোকানে নিওন সাইন এবং গ্লো-সাইন এর কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা সামাদের ছিল। অর্ডারের কাজ করবার জন্য প্রায়ই তাকে হোটেল ইন্টারকনে যেতে হত। জুলাই মাস থেকেই নানা সূত্রে মুক্তিযোদ্ধারা খবর পেতে থাকে যে, পাকিস্তানী বড় বড় সেনা কর্মকর্তারা এই হোটেলের “সাকী বার”-এ বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নিয়মিত ড্রিংকস করে, ফুর্তি করে। খবরটা ক্রসচেক করার জন্য জুলাই মাসে স্বপন, বদি, চুল্লু, শাহাদাত চৌধুরী  ও হাবিবুল আলম রেকি করতে যায়। তারা সুইমিং পুল, টেনিস কোর্টসহ হোটেলটির নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখে। ঘনঘন ওয়াশরুমটি ব্যবহার করতে গিয়ে ভালোভাবে জায়গাটি পরীক্ষা করে। এই ওয়াশরুমটিই পরবর্তীতে এক্সপ্লোসিভ মজুদের কাজে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। এছাড়াও ওয়াশরুমের উল্টোদিকের দোকানে সিগারেট কেনার ছলে অনেক সময় নষ্ট করতো ওরা এবং বারে কোন কোন আর্মি অফিসার যাওয়া যাওয়া আস আকরছে, সেইদিকে খেয়াল রাখতো। সাধারণত মেজর, কর্ণেল পদমর্যাদার অফিসার এবং বিদেশীরা সেখানে আসতো।

এভাবেই একদিন ওয়াশরুমের কমোডে বসে চিন্তা চিন্তা করতে হঠাৎ আলমের মাথায় আসে, এক্সপ্লোসিভগুলো তো কমোডেই বসানো যায়। ওয়াশরুমের দরজাগুলো হোটেলের অন্যান্য দরজার মত না। ডানদিকের তিনটি টয়লেটের কাঠের পার্টিশনগুলো পাঁচ ফুটেরও কম উচু এবং প্রতিটির নীচে ১২ থেক ১৪ ইঞ্চি ফাঁকা। বাকি দুটো টয়লেটেও একই অবস্থা। সেখানে ইটের দেওয়াল সিলিং পর্যন উঠে গেছে। এই ফাঁকা জায়গা দিয়ে টয়লেট ব্যবহারকারীর পা দেখা যেত। আলম ভেবে দেখলো যে, ভেতরের ছিটকিনি আটকে দিয়ে যে কেউ এই দুই টয়লেট থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। আগের তিনটা থেকে এই দুটো টয়লেট আরো ভেতরের দিকে এবং আরো সুবিধাজনক। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো এই দুটো টয়লেটই ব্যবহার করা হবে।

এখন মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়াল, টয়লেটে বসাবার জন্য এক্সপ্লোসিভগুলো হোটেলের ভেতর নিয়ে যাওয়া। তখন জুলাইয়ের শেষ দিক। সামাদ যেহেতু নিওন সাইন বানাতেন, তার হাতে তখন সুইস এয়ারের একটা নিওন সাইন তৈরির অর্ডার ছিল। কাজ প্রায় শেষের দিকে, দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই সাইনবোর্ডটা হোটেল ইন্টারকনে সুইস এয়ারের অফিসে ডেলিভারী দেওয়া হবে। এটা জেনে পরেরদিনই আলম আর শাহাদাত চৌধুরী গেলো সামাদের বাসায়। তাকে বলা হলো, ডেলিভারীটা পরে দিতে এবং এই অপারেশনে তার সরাসরি সহায়তা দরকার। সামাদ জানালেন, তিনি সুইস এয়ারের ম্যানেজারকে চেনেন এবং এ ব্যাপারে ম্যানেজারকে রাজি করিয়ে সাহায্য করবেন। পরেরদিন মিট করবে কথা দিয়ে সেদিনের মত আলম আর শাচৌ ফিরে আসে।

পরেরদিন বিকেলে হোটেল ইন্টারকনের লবিতে মায়া আর আলম গিয়ে সামাদের সাথে দেখা করে। সামাদ তাদের হোটেলের ইস্টার্ণ উইং-এ সুইস এয়ারের অফিসে নিয়ে ম্যানেজার হাকিম সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। মূল গেট দিয়ে হোটেলে ঢুকে হাতের বায়ে প্রথমে কনফেকশনারি, তারপর বেনারসী শাড়ির দোকান তার পরের দুট রুমে পিআইএর অফিস। এই অফিসের পরেই মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত বিস্তৃত কাঁচের বড় জানালা এবং জানালার মাঝখানে কাঁচের একটি রিভলভিং ডোর। এই দরজার পরে ছিল শাটার দরজা। তার ভেতরে আরো তিনটি অফিস। এই তিনটি অফিসের মধ্যে সুইস এয়ারের অফিসটি ছিল দ্বিতীয়। এই অফিসের সামনে পিছনে ছিল কাচে ঢাকা। এর অর্থ, উত্তর দক্ষিণ দিকটা কাচে ঢাকা এবং পূর্ব পশ্চিম দিকটা  ইটের দেয়াল দিয়ে বন্ধ। যে কেউ সামনে পেছনে উভয় দিক দিয়েই এই অফিসে আসা-যাওয়া করতে পারতেন। এই অফিসে ঢোকার আরেকটি দরজা ছিল পশ্চিম দিকে।

সেই পেছনের দরজা দিয়ে মায়া আর আলমকে নিয়ে সামাদ সুইস এয়ারের অফিসে ঢুকলেন। ম্যানেজার হাকিমের সাথে পরিচয়ের পর চা খেতে খেতে আলম বলে, “ম্যানেজার সাহেব, আমাদের আপনার সাহায্য দরকার। এক রাতের জন্য আপনার অফিসে আমাদের একটা ব্রিফকেস রাখতে চাই।” ম্যানেজারের মুখভঙ্গিতে কোন পরিবর্তন না দেখতে পেয়ে আলম আবারো একই ভঙ্গিতে কথাটা বলে গেল। এবার ম্যানেজার খুব অনিচ্ছাসত্ত্বে বলতে বাধ্য হলেন, “বিপদজনক কিছু না থাকলে সমস্যা নাই। আমি রাজি”।

সেদিন ধানমন্ডির হাইডআউটে ফেরার পর মায়া বললো, সে আগামীকাল একটা ব্রিফকেস আনবে। কিন্তু আলম তাকে দুটো ব্রিফকেস আনতে বলে। এর একটায় হাবিজাবি কাগজপত্র ভরে রেখে আসা হবে সুইস এয়ারের অফিসে। এরপর ঠিক একইরকম আরেকটা ব্রিফকেসে পিকে এক্সপ্লোসিভ ভরে ঠিক একইভাবে গিয়ে সুইস এয়ারে অফিসে রেখে আগের ব্রিফকেসটা ফিরিয়ে আনতে হবে। যেন কোনভাবেই সন্দেহ না হয় পাকিস্তানীদের। এভাবেই প্রতিদিন যাওয়া আসার অনুশীলন করে স্বচ্ছন্দ হতে হবে এবং হোটেলের ভেতর ব্রিফকেস হাতে যাওয়া আসা সবার চোখে স্বাভাবিক করে তুলতে হবে। যেন মূল অপারেশনের দিন পর্যাপ্ত এক্সপ্লোসিভ ব্রিফকেসে বহন করে আনা যায় কারোর সন্দেহের উদ্রেক না করেই।

এই অপারেশনের জন্য তুলনামূলক সরল মুখাবয়াবের তরুণ ১৮ বছর বয়সের বকরকে সিলেক্ট করা হলো। বেশ ক’দিন কোন অপারেশন না করতে পেরে বকর একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছিল, তাই এই অপারেশনের কথা শুনেই লাফ দিয়ে উঠলো। তাকে পুরো প্ল্যানটি বুঝিয়ে বলা হলো যে, আগামীকাল যে কোন দুজন ব্রিফকেস নিয়ে যাবে, সুইস এয়ারের অফিসে রেখে আসবে এবং বকর পরদিন আরেকটি ব্রিফকেস নিয়ে যাবে সেখানে এবং সেটা রেখে ভুয়া ব্রিফকেসটা নিয়ে আসবে। বকরকে নিয়ে আলম প্রাকটিস শুরু করলো এবং তাকে দেখিয়ে দিতে লাগলো, কী করে টাইম ডিলেইড পেন্সিল এক্সপ্লোসিভে লাগাতে হয়। এভাবে আস্তে আস্তে বকর পুরো প্ল্যানের অংশ হয়ে গেল।

পরদিন প্রথমে মায়া আর শাহাদাত চৌধুরী ব্রিফকেস নিয়ে চলে যায় সুইস এয়ারের অফিসে। তারপর আলম আর বকর আরেকটা ব্রিফকেস নিয়ে যায় এবং ম্যানেজার হাকিমের অফিসে বসে চা খেয়ে ব্রিফকেস রেখে আগের ব্রিফকেস নিয়ে ফিরে আসে। এরপর থেকে বকরই সামাদের অ্যাসিস্টেন্ট হয়ে প্রতিদিন সুইস এয়ারের অফিসে যাওয়া আসা করতে শুরু করে। যাওয়া আসা করতে করতে বকর চেক পোস্টের সেন্ট্রিদের কাছে খুবই পরিচিত মুখ হয়ে গেল,  প্রথমদিকে গেটে চেকিং করে ঢুকানো হলেও, পরবর্তীতে বিনা চেকিংয়েই ওদের ঢুকতে দিতো । বকরের উপর থেকে সন্দেহের চোখ কিছুটা নমনীয় হবার আরও একটি কারণ ছিল ওর অল্প বয়সী আলাভোলা চেহারা। বকর আবার ভাল উর্দূও বলতে পারতো, যাওয়া আসার সময় পাহারারত পাকিস্তানীদের সাথে উর্দূতে কথাবার্তা এমনি ইয়ার্কিও করতো । এসব কারণেই ওদের চলাচলের উপর সন্দেহের চোখটা অপারেশনের দিনক্ষণের আগেই চলে গিয়েছিলো।

ইতিমধ্যে ৮ই আগস্ট ফার্মগেটে অপারেশন হয়েছে, একেবারে পাগলা কুত্তা হয়ে গেছে পাকিস্তানী আর্মি। সামাদ ম্যানেজার হাকিমের সাথে দেখা করে তাকে জানালেন, গেরিলারা সরাসরি হোটেলের ভেতরে অপারেশন চালাবে। ১০ই আগস্ট এসে বকর আলমের কাছে আরো ১০ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ চাইলেন। এতে করে সব মিলিয়ে এক্সপ্লোসিভের পরিমাণ হবে ২৫ পাউন্ড। গোপন হাইডআউট থেকে বাকি ১০ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ আনা হলো। এবং তাকে শেষবারের মত পুরো প্ল্যানটা বুঝিয়ে বলা হলো। প্রথমে আধা ঘন্টার টাইমার সেট করার কথা ভাবলেও আধা ঘন্টা টয়লেটের ভেতর থাকলে তা সেন্ট্রিদের সন্দিহান করে তুলতে পারে ভেবে সে পরিকল্পনা বাদ দিয়ে চূড়ান্ত করা হলো যে ১৫ মিনিটের একটি টাইমার ফিউজ লাগানো হবে এবং বকরকে এই ১৫ মিনিটের মধ্যেই ফিউজ লাগিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে। ফিউজ এবং টাইমারটি শেষবারের মত পরীক্ষা করে ব্রিফকেসসহ তা বকরের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। এখন অপেক্ষা কেবল ব্রিফকেস ব্রিফকেস আদানপ্রদান খেলায় এই এক্সপ্লোসিভগুলো হোটেলে ভেতর জায়গামত নিয়ে যাওয়া।

পরিকল্পনা অনুযায়ী মায়া এবং আলম ব্রিফকেস হাতে ম্যানেজার হাকিমের সাথে দেখা করতে যায় এবং ব্রিফকেসটা খোলা কেবিনেটের পাশে রেখে চা খেতে খেতে আবহাওয়া, গান-বাজনা এবং ট্রাফিক পরিস্থিতির মত হাবিজাবি বিষয়ে কথা বলতে থাকে। কথা বলতে বলতেই এক পর্যায়ে বকর আসল ব্রিফকেসটা যেটায় ২৫ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ এবং বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ১৫ মিনিটের টাইমার পেন্সিল আছে, সেই ব্রিফকেসটা নিয়ে আসেন এবং কেবিনেটের পাশে রেখে আগে থেকেই রাখা ব্রিফকেসটা নিয়ে নিঃশব্দে সেখান থেকে বেরিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষ বা লাউঞ্জে চলে যান। পুরো ঘটনাটি আলম-মায়া এবং ম্যানেজারের চোখের সামনে ঘটলেও তারা না দেখার ভান করেন। একটু পর আলম উঠে দাঁড়িয়ে ম্যানেজারের কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতে জানান, আগামীকাল বকর এসে এই ব্রিফকেসটা নিয়ে যাবে। সন্ধ্যায় হাইডআউটে ফেরার পর সবাই আবার প্ল্যানটা রিভাইজ দিতে বসেন এবং বকরকে সবকিছু বুঝিয়ে এবং মনে করিয়ে দেয়। বকর বলে, সে টাইমারটা চেক করে দেখেছে, কোন সমস্যা নেই। অভিযানের সময় সবাই ধারেকাছেই থাকবে বলে বকরকে নিশ্চিত করা হয়।

এরপর এলো ১১ই আগস্ট। আকাশ পরিষ্কার ছিল, বর্ষাকাল হওয়া সত্ত্বেও সেদিন বৃষ্টি ছিল না, বিকেলের দিকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।রাস্তার পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। যানবাহন ছিল, কিন্তু রাস্তায় বেশি লোকজন ছিল না। মিন্টো রোড দিয়ে আর্মির বেশ কিছু আধা টনের ট্রাক উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে যাচ্ছিল। সাকুরা মার্কেটের দোকানপাট খোলা ছিল, এবং দু-তিনটি গাড়ি এই মার্কেটের পাশে ইসো গ্যাসোলিন স্টেশনে তেল নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন হোটেল ইন্টারকনের ভেতরে কোন অস্বাভাবিক কার্যক্রম চলছিল না। পিজি হাসপাতালকে বেশ কর্মচঞ্চল মনে হচ্ছিল, পাশের রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রে নিরাপত্তার জন্য আরো দুই ফুট উঁচু করে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে। সাত ফুট উঁচু দেওয়ালের উপর আরো দুই ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াই প্রমাণ করছিল, পাকিস্তান সরকার এই বিচ্ছুর দলকে কতটা ভয় পেয়েছে। গত দুই মাস টানা গেরিলা অপারেশনে একটা সেকেন্ডের জন্যও স্বস্তিতে নেই পাকিস্তানীরা, বরং ভয় পাওয়া ইঁদুরের মত উদ্ভ্রান্ত দেখায় তাদের।

ক্রমেই সেই জিরো আওয়ার এগিয়ে আসছে। যেসব মুক্তিযোদ্ধারা জানতেন আজ হোটেল ইন্টারকনে অপারেশন হবে, তারা চাপা উদ্বেগের ভেতর থাকলেও সেটা গেরিলা বকরকে দেখে বোঝার উপায় নাই। এই সুদর্শন তরুণ চুল আঁচড়ে, চমৎকার একটা পোশাক পরে কেতাদুরস্ত হয়ে হাজির হলেন এবং শেষবারের মত রেকি করে এলেন হোটেল ইন্টারকনের সামনে থেকে। এরপর নির্দিস্ট সময়ে বকরকে সাআমাদ তার গাড়িতে করে নামিয়ে দিয়ে এলেন হোটেলের ঠিক সামনে। ডানে-বায়ে একবার ভালোমত দেখে নিয়ে বকর গাড়ি থেকে নেমে পড়ে এবং ধীরস্থির গতিতে হেঁটে সুইস এয়ারের অফিসের সামনে গিয়ে পৌঁছায়। ব্রিফকেস অদলবদলের খেলা আজ শেষ, বদল ,করার মত কোন ব্রিফকেস বকরের হাতে নেই। বকর সুইস এয়ারের ম্যানেজারকে সালাম দেয় এবং নিজের ঘড়ি দেখে। ঘড়িতে তখন ৪টাক বেজে ৫ মিনিট। ব্রিফকেসটা নিয়ে চলে আসার সময় ম্যানেজার হাকিম বকরকে জিজ্ঞেস করে, সবকিছু ঠিক আছে তো? বকর কয়েক মুহুর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদুহেসে জবাব দেয়, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে।

এরপর ডান হাতে ব্রিফকেসটা নিয়ে বাম হাতে দরজা খুলে বকর সুইস এয়ারের সেলস অফিস থেকে বেরিয়ে যায়। তার ব্রিফকেস ভর্তি এখন ২৫ পাউন্ডের এক্সপ্লোসিভ। সাবধানে হোটেলের লাউঞ্জে সরাসরি চোখ রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চারিদিক দেখে নেয় বকর। সময় বয়ে চলেছে। এবার সে পা বাড়ায় সাকী বারের দিকে। পাঁচ কদম এগোলেই লিফট পার হবে সে। ঠিক তখনই কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বকর দেখতে পেলো, তার বাম দিকিএ দুজন ক্লিনার মেঝে পরিষ্কার করছে। হার্টবিটটা একটু দ্রুত হয়ে গেল বকরের, নিজেকে সান্ত রাখারজন্য একটা একটা করে পদক্ষেপ গুনছিল সে।

সাকী বারে ঢুকে সেখানে কোন আর্মি অফিসার না দেখে আরো দু’গজ সামনে এক দুই তিন চার করে ছয় কদম স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে বকর তার লক্ষ্যস্থলে এলো। ওয়াশরুমে ঢোকার আগে কোন চিন্তাই আসতে দেয়নি বকর তার মনে। দরজার সমানে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে বড় একটা শ্বাস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকে সে, দেখতে পেলো একজন ব্যক্তি মাত্রই প্রসাব করে প্যান্টের চেইনটা উপরের দিকে টেনে তুললো, এরপর হাত ধুতে পাশের বেসিনে গেল। বকর এবার দুপায়ের ফাকে ব্রিফকেসটি চেপে ধরে প্রস্রাব করার ভঙ্গিতে দাঁড়ালো। কান পেতে শুনছে সে, লোকটা হাত ধুয়ে ওয়াশবেসিনের কল বন্ধ করলো, তারপর চলে গেল। বকর এখন একা!

সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে বকর ইটের দেয়ালে ঘেরা টয়লেট দুটো দেখলো। ঢুকলো দ্বিতীয় টয়লেটে, ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর ব্রিফকেসটি উল্টোদিকের কমোডে উপর রাখলো। গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আস্তে আস্তে ব্রিফকেসটা খুলে দেখলো, সব ঠিকঠাক আছে কিনা! হঠাৎ বাইরে একটা শব্দ হতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করলো, কেউ ঢুকলো কিনা ওয়াশরুমে। কোন শব্দ না পেয়ে সে তাড়াতাড়ি নিজের শরীর বাঁকিয়ে মেঝে দিয়ে টয়লেটের দরজার নিচের সেই ছোট্ট ফাঁকটা দিয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। দ্রুত ওয়াশ বেসিনের গিয়ে আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখে নেয় এবং ওয়াশরুমের দরজা খুলে পা বাড়ায় লাউঞ্জের দিকে।

লাউঞ্জ পেরিয়ে রিভলভিং ডোরের ঠিক সামনে এসে বকর দেখে একজন গার্ডের সাথে একজন গেরিলা খোশগল্প করছে। বকর টের পেল, তাকে কাভার দেওয়ার জন্য আশেপাশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রস্তুত হয়ে আছে। ঠিক সেই মুহুর্তে হঠাৎ বকরের মনে পড়লো, সে ১৫ মিনিটের টাইমার পেনসিল, যেটা কিনা বোমাটা ফাটাবে, সেটা অন করতে ভুলে গেছে!

সাথে সাথে বকর ঘুরে গিয়ে কি যেন হারিয়ে ফেলেছে, এমন একটা ভঙ্গি করতে করতে লাউঞ্জ ধরে আবার এগিয়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে। ধারণাটা আরো শক্ত করার জন্য সে কয়েকবার তার জানা-কাপড়ের নানা পকেটে হাত ঢুকিয়ে খোঁজাখুজি করতে লাগলো। এদিকে তাকে বেরিয়ে আসতে দেখে আশেপাশে ছদ্মবেশে থাকা যে মুক্তিযোদ্ধারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিলেন, তারা হঠাৎ করেই থমকে গেলেন। বাইরে অপেক্ষামাণ আরো মুক্তিযোদ্ধারা অস্থির ভঙ্গিতে হাঁটাচলা করছেন, সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, বকর আবার কোথায় যাচ্ছে?

এদিকে খোঁজাখুঁজির ভান করতে করতে ওয়াশরুমে ঢুকে বকর দেখতে পেলো, সৌভাগ্যক্রমে ওয়াশরুমে কেউ নেই।  দ্বিতীয় টয়লেটের চারপাশে সাবধানে ঘুরে কেউ নেই শিউর হয়ে টয়লেটে ঢুকে ব্রিফকেসটা বের করলো বকর, দেখলো ঠিক যেভাবে রেখে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই পেনসিল টাইমটা পিকে এক্সপ্লোসিভের পাশে আছে। কোনরকম ইতস্তত না করেই বকর টাইমারটি স্পর্শ করলো, ঠিক সে মুহুর্তে  হঠাৎ তার মায়ের মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে, মা যেন মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময়ে যেভাবে বলেছিল, সেভাবে বলছে, দেরী করছিস কেন বকর, উড়িয়ে দে!

সকল শক্তি দিয়ে বকর টাইমারটি চাপ দিয়ে অন করে দিল। ব্রিফকেসটি বন্ধ করে যে পথে টয়লেটে ঢুকেছিল, জামাকাপড় ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে  ঠিক সেই পথে আবার ওয়াশরুম থেকে বেরোলো। বাম হাত প্যান্টের পকেটে, ডান হাতে বকর ঠাণ্ডা শান্ত চোখে রিভলভিং ডোরের সমানে থেকে সেন্ট্রিকে সরে যাবার ইঙ্গিত দিল।

এরপর সজোরে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে হোটেলের বাইরে চলে এল বকর। কোনদিকে না তাকিয়ে হোটেলে ঢোকার বাম পথ দিয়ে বেরিয়ে মিন্টো রোড পার হয়ে লাফিয়ে ফুটপাতে উঠলো। এতোক্ষণে সে একটা সেকেন্ডের জন্য থামলো এবং পাশের দেয়ালে হাত রেখে বড় করে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। ফুটপাতের যে অংশে দাঁড়িয়ে ছিল বকর, সেটি ছিল হোটেলের উল্টোদিক, সেখান থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে সাকুরা শপিং কমপ্লেক্সের দিকে হাটতে থাকে বকর। অপর দিকের রাস্তায় যাওয়ার জন্য মাঝখানের রোড ডিভাইডারে যেই না মাত্র উঠেছে, সাথে সাথে প্রকবল প্রচন্ড গর্জনে যেন বিস্ফোরিত হলো হোটেল ইন্টারকোন। কেঁপে উঠলো আশেপাশের রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর সব!

প্রশিক্ষণের সময় মেজর এটিএম হায়দার ঠিক যেভাবে পেনসিল টাইমারটি কাজ করবে বলেছিলেন, ঠিক সেভাবেই অসম্ভব শক্তি নিয়ে পেনসিল টাইমারটি পিকে এক্সপ্লোসিভে বিস্ফোরণ ঘটায়! দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই প্রতাপশালী বিস্ফোরণের গর্জন যেন সুমধুর সঙ্গীত বর্ষণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্ণকুহরে। বিস্ফোরণটা এতোটাই প্রচন্ড ছিল যে,  এদিকে ফার্মগেট-কারওয়ানবাজার অন্যদিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স পর্যন্ত শোনা গিয়েছিল এই আওয়াজ।  বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে ঘটা এই বিস্ফোরণে হোটেল লাউঞ্জ, শপিং আর্কেড এবং আশ পাশের কক্ষের কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়লো, ছিটকে যায় কক্ষের দরজা, ভেঙ্গে পড়লো কক্ষের ভেতরকার এবং লাউঞ্জের লাগোয়া দেয়াল। পুরো লাউঞ্জটাই পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে। আহত হয় বেশ কয়েজন । বিশ্ব সংবাদপত্রসমূহ বাংলাদেশে মুক্তি বাহিনির তৎপরতার আরেকটি রোমাঞ্চকর সচিত্র সংবাদ গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। সবাই স্তব্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। বাঙ্গালীরা বেশ মজা পাচ্ছিলেন পাকিস্তানী এবং বিহারীদের প্রাণভয়ে এদিক সেদিক ছুটতে দেখে। পাকিস্তানী বর্বরতা আর বীভৎস গণহত্যার মাঝে, গিজগিজে পাকিস্তানী সেনাদের মাঝে, প্রবল ভয়ের এই উপত্যকায় দুর্দান্ত সাহসী বিচ্ছুদের এই অকল্পনীয় আক্রমণ নিজের চোখে দেখতে পারাটা অসম্ভব আনন্দের তো বটেই!

পরিশিষ্টঃ নিওন সাইনের মালিক আবদুস সামাদ ক্র্যাক প্লাটুনের অনেকগুলো অপারেশনে অংশ নিয়ে যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও ২৯শে আগস্ট ধরা পড়ার পর পাকিস্তানীদের নির্যাতনের মুখে সহযোদ্ধাদের তথ্য বলে দেন। তাকে স্ত্রী-সন্তান মেরে ফেলা হবে এই ভয় দেখিয়েছিল পাকিস্তানীরা। সামাদের তথ্যে ধরা পড়েন আলতাফ মাহমুদ, রুমি, জুয়েল, আজাদ, বকর। যুদ্ধে তার বীরত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন না থাকলেও যেখানে বদি-রুমি-আজাদ-আলতাফ মাহমুদ কেউ শত নির্যাতনেও মুখ খোলেননি, সেখানে তিনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন সহযোদ্ধাদের। তবুও তাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এটাই নির্মম সত্যি!

তথ্যসূত্র: ব্রেইভ অফ হার্ট – হাবিবুল আলম বীর প্রতীক

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button