মতামত

হিপোক্রেসি নয়, খোলামেলা আলোচনা দরকার এই বিষয়গুলো নিয়ে…

আমিনুল ইসলাম

বিষয় গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবার প্রয়োজন আছে। এই লেখা লেখার সময় ভাবছিলাম-আমার পাঠকদের মাঝে এমন অনেকে’ই আছে, যারা হয়ত পুরো পরিবার মিলে সবাই আমার লেখা পড়ে। বাবা-মা, পুত্র-কন্যা সবাই। তাই ভাবছিলাম লেখা ঠিক হবে কিনা। এরপর মনে হলো সবার’ই বরং খোলামেলা ভাবে এই নিয়ে আলোচনা করা উচিত। পৃথিবী জুড়ে নানান দেশ ঘুরে বেড়ানো’র সুবাধে এক ধরনের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা গুলো থেকে অল্প কিছু না হয় শেয়ার করা যাক।

ঘুরতে গেলে সব সময় তো আর ভালো হোটেলে থাকার সুযোগ হয় না; কারন অর্থ এবং সামর্থ্যে’র একটা ব্যাপার আছে। তাই অনেক সময় কম খরচে’র হোস্টেল খুঁজে বের করতে হয়। এইসব দেশে এই ধরনের হোস্টেল গুলো’কে মুলত ব্যাকপ্যাক হোস্টেল বলে। এই সব হোস্টেলে দেখা যায় এক রুমে কোথাও এক সঙ্গে আট কিংবা বারো’টা বেড থাকে। কোথাও আবার এর চাইতেও বেশি বেড! কোথাও কোথাও বাঙ্ক বেড’ও থাকে। অর্থাৎ দুই’তলা, তিন’তলা বেড।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এইসব রুমে কি ছেলে-মেয়ে এক সঙ্গে থাকে?

হ্যাঁ, ছেলে-মেয়ে এক সঙ্গে’ই থাকে। কেউ কাউকে চেনে না, জানে না। সবা’ই হয়ত ঘুরতে এসছে।
ছেলে’টা হয়ত উপরের বেডে থাকছে, আরেক মেয়ে হয়ত নিচের খাটে।কিংবা মেয়ে’টা উপরের বেডে, ছেলে’টা নিচে। কিংবা উপর নিচ যদি না থাকে; তাহলে ছেলে-মেয়ে সবাই এক রুমে বেডে’র মাঝে ঘুমাচ্ছে। তো, এই মেয়েরা কি সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ছেলেপেলে গুলো’র সঙ্গে এক’ই রুমে ঘুমাতে অনিরাপদ বোধ করে? মোটে’ই না। এরা মহা আনন্দে, মনের সুখে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের সময় হয়ত কারো কাপড়-চোপর ঠিক না’ও থাকতে পারে। ছেলেদের ব্যাপারেও সেটা হতে পারে। তো, তখন কি ছেলে গুলো গিয়ে ওই মেয়ে গুলো’র উপর হামলে পড়ে?

না, পড়ে না। এর মানে কি এই- ওই ছেলে গুলো কিংবা মেয়ে গুলো’র মাঝে যৌন তাড়না কিংবা কামনা জেগে উঠতে পারে না? উত্তর হচ্ছে-অবশ্য’ই পারে। এটা তো অস্বাভাবিক কিছু না। মানুষজনের মাঝে যৌন তাড়না কিংবা কামনা থাকা তো অস্বাভাবিক কিছু না। তাহলে পৃথিবী জুড়ে যে এমন হাজারো হোস্টেল আছে, সেখানে কেন ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে না? কারন হচ্ছে- এরা এদের ইচ্ছে গুলো’কে দমন করতে পারে। এবং অতি অবশ্য’ই এরা হিপক্রেট না।

সকাল বেলাতে’ই হয়ত ঘুম থেকে উঠে অপরিচিত ছেলে’টা, মেয়ে’টাকে বলে বসবে
-তুমি তো বেশ সুন্দরী, রাতের বেলায় তোমাকে দেখছিলাম। মেয়েটাও এতে কিছু মনে না করে হয়ত বলে বসবে -ধন্যবাদ তোমাকে। এইসব দেশে সামারে তো ছেলে-মেলে’রা জামা-কাপড় অর্ধেক খুলে রাস্তায় ঘুরাফেরা করে। এর মানে কি এই- এই সব দেশে ছেলে মেয়েদের যৌন কামনা নেই; কিংবা এদের মাঝে এমন প্রবৃত্তি জেগে উঠে না? তাই বলে কি তারা কারো গায়ে খানিক হাত দেয়ার চেষ্টা করবে? কিংবা যা ইচ্ছে তাই বলে দিবে?

না, এরা হয়ত তাকাবে, ভালো লাগলে হয়ত আরেকবার তাকাবে; কিন্তু গিয়ে হাত লাগাবে না কিংবা উল্টো-পাল্টা কিছু বলতে যাবে না। আমরা যেহেতু মানুষ, সবাই তো পশু শ্রেণী’র। সুতরাং এই প্রবৃত্তি যেমন বাংলাদেশের একটা ছেলে’র থাকতে পারে, ঠিক তেমনি ইউরোপের একটা ছেলেরও থাকবে। তবে সভ্যতা’র পার্থক্য’টা হচ্ছে- এরা এদের ইচ্ছে’টাকে দমন করতে পারে। এরা জানে কারো গায়ের সঙ্গে লেগে যাওয়া কিংবা বিনা অনুমতিতে যে কোন ধরনের শারীরিক সংস্পর্শ অন্যায় ও অসভ্যতা।

তাই বলে এমন না, এরা মেয়েদের দিকে তাকায় না, কিংবা এদের মাঝে কামনা-বাসনা জাগে না!
আর আমাদের দেশের দিকে তাকালে মনে হবে- এই সমাজে এক দল হচ্ছে ধর্ষক শ্রেণী’র; আরেক দল হচ্ছে একদম পুত-পবিত্র। যারা হয়ত কোন মেয়েদের দিকে তাকায় না, তাদের মনে হয় কোন কামনা-বাসনাও জাগে না। এরা সবাই হচ্ছে মহাপুরুষ টাইপের মানুষ। এদের মাঝে আবার আরেক দল আছে- যারা মেয়েদের জামা-কাপড় নিয়ে দিন রাত চিন্তায় থাকে।

এমন’ই এক দল সরকারি কর্মকর্তা ক্যাডার বেশ কয়েক বছর আগে এসছিল বিদেশে ট্রেনিং এ। আমার সঙ্গে বিদেশে’ই পরিচয়। প্রথম পরিচয়ে’ই ভদ্রলোক জানতে চাইলেন -ভাই আপনাদের এখানে ন্যুড বীচ আছে না? আমাকে একটু নিয়ে চলেন ভাই! ন্যুড বীচে যেতে চাওয়া খারাপ কিছু না। সে যেতে’ই পারে। তবে আমি অবাক হয়েছিলাম- প্রথম পরিচয়ে’ই সে আমাকে ন্যুড বীচে যাবার কথা বলেছে।

এর চাইতেও অবাক হয়েছি, দেশে ফিরে যাবার পর এই এক’ই ভদ্রলোক বছর কয়েক পরে একটা স্ট্যাটাসে লিখেছেন -মেয়েদের উচিত জামা- কাপড় ঠিক মতো পড়া। নইলে তো ধর্ষণের জন্য দায় তাদেরও থাকে। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। হিপক্রেসি বোধকরি একে’ই বলে! কিছু কিছু বিষয় মনে হয় আমাদের সমাজে খোলামেলা ভাবে আলোচনা করার সময় হয়েছে।
একটা ছেলে একটা মেয়ের দিকে তাকাতে’ই পারে। সেটা একটা মেয়ের ক্ষেত্রেও হতে পারে। সে একটা ছেলের দিকে তাকাতেই পারে। সেখানে কামনা-বাসনাও থাকতে পারে।

আমরা তো কেউ মহাপুরুষ নই, আমরা অতি সাধারণ মানুষ। এই ব্যাপার গুলোকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে আমাদের শিখতে হবে-কোথায় থামতে হয়। ভালো লাগতে পারে, কামনা-বাসনাও জাগতে পারে। কিন্তু কোন ভাবে’ই সেটা’কে কারো বিনা অনুমতিতে শারীরিক সংস্পর্শে আনা যাবে না; এক’ই সঙ্গে মৌখিক ভাবে কারো সম্পর্কে কোন খারাপ মন্তব্য করা যাবে না।
আপনার যদি কাউকে সুন্দর লাগে, আপনি তাকে গিয়ে বলতে পারেন- তোমাকে আজ সুন্দর লাগছে।

কাউকে যদি ভালো লাগে, গিয়ে বলতে পারেন- তোমাকে আমার ভালো লাগে। এর বেশি কোন ভাবে’ই এগুনো যাবে না অন্য পক্ষে’র অনুমতি ছাড়া। এই বিদেশেও বাংলাদেশিদের আয়জনে নানান পার্টি’তে গেলে দেখা যায়- ছেলে’রা এক দিকে বসে আছে, মেয়েরা আরেক দিকে বসে আছে! কেন? ছেলে’রা-মেয়েরা এক সঙ্গে বসে আড্ডা দিতে সমস্যা কোথায়? এর মাঝে যদি কারো- কাউকে ভালো লাগে, সুন্দর লাগে; সেটা বলে দিতে’ই বা সমস্যা কোথায়?

ব্যাপার গুলো’কে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। আমরা এখন বিশ্বায়নের যুগে বাস করছি। দেশের একটা প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে বসে ছেলেটা কিংবা মেয়েটা হলিউড কিংবা বলিউড মুভি দেখছে। তার হয়ত হলিউড কিংবা বলিউড তারকাদের মতো ফ্যাশন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। তার হয়ত সেভাবে চুল কাটতে ইচ্ছে হচ্ছে। আর আপনাদের চেয়ারম্যান আর পুলিশ অফিসার কিনা ঘোষণা করছে- ফ্যাশন করে চুল কাটলে জরিমানা দিতে হবে। যে কোন সমাজে নানান অস্থিরতা তৈরি হয় এই ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থার জন্য। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে আমাদের সমাজ। এখন আপনি যদি পুরনো সংস্কৃতি গুলকে এভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান, সেটা আপনি পারবেন না। বরং অস্থিরতা আরও বাড়বে। হত্যা, ধর্ষণ বাড়তে’ই থাকবে।

তার চাইতে বরং আমাদের সবার জানা উচিত এবং আমাদের শেখানো উচিত -কোথায় থামতে হয়! ইচ্ছে হবে, খুব ইচ্ছে হবে; সেই ইচ্ছেটা’কে আমরা খারাপ চোখে দেখবো না। কারন আমরাও মানুষ। আমাদের মাঝে কামনা-বাসনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের বরং শিখতে হবে- সেই ইচ্ছেটাকে কিভাবে দমন করা যায়।
এখানে’ই সভ্যতা এবং অসভ্যতা’র মাপকাঠি!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button