রিডিং রুমলেখালেখি

পেটের ক্ষুধা উপেক্ষা করেও মনের ক্ষুধা মেটাতে যিনি বই লেখেন!

এই মানুষটা বড় নিভৃতচারী। নিজের ভিটাবাড়ি বিক্রি করা জায়গায় এখন তিনি একটু মাথা গুঁজবার ঠাই পেয়েছেন। অথচ, জীবন এমন হবার কথা ছিল না। বলছি, নাটোরের বড়াই উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের নারী অলোকা ভৌমিকের কথা। ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল তার। কিন্তু, সংসার সুখ কাকে বলে সেটা এজন্মে খুব বেশি তার জানা হলো না। জমিজিরাত ছিল ১৬ বিঘার মতো। ‘বিজ্ঞ’ স্বামী অজ্ঞের মতো সেইসব জমি বিক্রি করে দিয়েছে একের পর এক। যখন সেই ভদ্রলোক আর নেই, অলোকা ভৌমিক যখন বিধবা হলেন তখন তার ভিটেমাটি পর্যন্ত নেই। সব বিক্রি হয়ে গেছে। ভাগ্য একটু সহায় বলে, যাদের কাছে ভিটেবাড়ি বিক্রি হয়েছে সেই হামেদা বেগমের বাড়িতে তারা তাকে এককোনে থাকতে দিয়েছে। এই থাকাটা হয়ত অস্তিত্ব রক্ষার বেঁচে থাকা। এতে করে জনমভর তাকে যে যাতনায় দিনযাপন করতে হয়েছে তার ভাষান্তর করে বোঝানো যাবে না।

এখন অলোকা ভৌমিকের বয়স ৭৩। এই বয়সটাতে জীবন থেকে তার চাওয়া পাওয়ার আর কি আছে! তার গল্পটা পুরোটাই হারানোর গল্প বোধহয়। তবুও, নিজের জন্য একান্তে কিছু সৃষ্টি তিনি নিভৃতে বসেই তৈরি করে যাচ্ছেন। ৫৭ বছর ধরে লেখালেখি করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু, লেখক হবার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞ্যানের চেয়ে জীবনবোধই বেশি দরকার। জীবন তাকে যেসব চরাই উৎরাই দেখিয়েছে, তাতে অলোকা জীবনের বিবিধ রঙ দেখেছেন নিবিড়ভাবে। সাদা কালো জীবনকে কলম দিয়েই আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন তিনি। যেসব দিন ভীষণ কষ্টে যেত, কিছুই ভাল লাগত না, অন্তর ফুঁড়ে বেদনার চর জেগে উঠত, সেসব দিনে তিনি খাতা কলম নিয়ে বসতেন। লিখতেন কবিতা। এলাকার লোকে তাকে বলে চারন কবি।

অলকা ভৌমিক

যেবছর দেশভাগ হয় সেবছর নাটোর জেলার শ্রীরামপুর গ্রামে বাবা জোতিষ চন্দ্র সরকার ও মা চমৎকারিনী সরকারের সংসারে জন্ম গ্রহণ করেন অলোকা। সে এক এমন সময় ছিল নারীদের পড়ালেখার সুযোগ ছিল না খুব একটা। অলোকা তাই অক্ষরজ্ঞ্যান শিখতে পারলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি এই সমাজের প্রতিবন্ধকতায়। তবে, অক্ষর চিনে তিনি যেন মনের খাদ্যের রসদ পেয়ে গেলেন। বই পড়ার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছিলেন। পুরাণের কাহিনী থেকে শুরু করে কাব্যের বই যা পেতেন সামনে সবই পড়তেন।

বিয়েটা অল্পবয়সে হলো৷ স্বামীহারা হয়েছেন বহু আগে। নিঃসন্তান বলে আঁকড়ে ধরার, স্বপ্ন দেখবারও কিছু ছিল না তার৷ তিনি যেন এক সর্বহারা নারী। যার নিজের ভিটেমাটি পর্যন্ত নেই, তার আবার খাবার! অলোকার তাই এমন বহুদিন গেছে, যখন খাবারও জুটত না কপালে। প্রতিবেশিরা একটু আধটু সাহায্য করেছে মাঝে মধ্যে। হয়ত একারণেই টিকে গেছেন। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া সাহায্যের অর্থ তিনি না খেয়ে জমাতেন। পেটে ক্ষুদা আছে, এটা বুঝতে দিতেন না কাউকে। ততদিনে মজে গেছেন লেখালেখিতে। মনের ক্ষুদা মিটিয়েই যেন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় খুঁজলেন তিনি।

রুলটানা কাগজে কলম নিয়ে তিনি লিখেন। একটু একটু করে উঠে আসে অন্তরের অন্তস্থল থেকে উৎসারিত কথকতা। একটা প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করে বই প্রকাশ করছেন প্রতিবছর। বই প্রকাশের অর্ধেক খরচ তিনি যোগান দেন। এযাবত তার ১২টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। তার বইয়ে আছে অসাম্প্রদায়িকতার ছাপ। মহানবীর জীবনী, রাধা কৃষ্ণ নিয়ে লেখা এবং নাটোরের রানী ভবানী ও রানী রাসমনীর জীবন কাহিনী নিয়ে অলোকা ভৌমিকের লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে।

তবে, অখ্যাত বলে তিনি এখনো অবহেলিত আছেন। নাটোরে বইমেলা হয়, সেখানে তিনি আরেকটু বেশি সম্মান আশা করেন। এই ছাড়া আর কিইবা আশা করবেন! এই মানুষটার এমন সংগ্রামে একটু সম্মান যদি রাষ্ট্র, প্রশাসন দেন তাতে হয়ত এই মহিয়সী নারীর সারাজীবনের দুঃখ বেদনার ক্ষতে একটু শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়া হবে। সরকার এবং নাটোর প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, এই নারীকে সম্মানিত করুন। এমন সংগ্রামের গল্পকে সম্মানিত করতে পারলে রাষ্ট্রও সম্মানিত হবে নিশ্চিতভাবে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button