ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এভাবে পুড়ে মরে যাওয়াটাই হয়তো আমাদের নিয়তি!

আমার মনে আছে, নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটার পরে ক্ষতিগ্রস্থ দুইটা মেয়েকে প্রধানমন্ত্রী নিজে দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। এইটুকু বদান্যতা প্রদর্শনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি যদি একটু কঠোর হয়ে সেদিন আদেশ দিতেন পুরো ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করার, যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার, এবং তাঁকে সেটার আপডেট জানানোর- তাহলে নয়বছর পরে এসে এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে হতো না। এই যে সত্তরটা মানুষ লাশ হয়ে ঢাকা মেডিকেলে শুয়ে আছেন, তাদের মৃত্যুর পেছনে এলাকার বাড়িওয়ালা, সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সবার দায় রয়েছে। সেই দায় কি কেউ এড়িয়ে যেতে পারবেন?

বাড়িওয়ালার লোভ, সে ভাড়া বেশি পাবে। সিটি কর্পোরেশনের লোকজন নাক গলায় না, কারণ জায়গামতো সিস্টেম করা আছে। সিস্টেমে আরও অনেকেই জড়িত। আর তাই প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই চলছে এই মচ্ছব। কেমিক্যাল কারখানার মালিক যিনি, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তার ফ্ল্যাট হয়তো গুলশান-বারিধারায়, এই আগুনে তার সন্তান পোড়েনি, তার পরিবারের কেউ পুড়ে কয়লা হয়নি।

নিমতলীতে একশোর বেশি, চকবাজারেও সংখ্যাটা তিন অঙ্ক ধরবে। তবে তাতে নিহত পরিবারগুলো ছাড়া আর কারোই কিছু আসবে যাবে না। আমরা দু-চারদিন শোক পালন করবো, প্রোফাইল পিকচারে কালো ছবি ঝুলিয়ে রাখবো, তারপর থেকে যে লাউ, সেই কদু। এভাবেই তো চলছে! আজকের দুর্ঘটনার পরে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা সরে যাবে? না। একটাও সরবে না। মানুষগুলোর কথা আমরা মনে রাখবো না, আবার যখন এরকম কোন ঘটনা ঘটবে পাঁচ/সাত বছর পরে, তখন আমরা একটা সংখ্যা হিসেবে স্মরণ করবো তাদের। সেটা হতে পারে সত্তর, আশি, কিংবা একশো…

বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় তরতর করে উঠে এসেছে ঢাকা, নগর পরিকল্পনাবিদেরা বারবার সতর্ক করেছেন, কেউ কানে তোলেনি সেসব কথা। বছর বছর বিভিন্ন সংস্থার জরিপে যখন ঢাকার নাম এসব তালিকার শীর্ষে ওঠে, তখন আমরা হাসাহাসি করি, ফেসবুকে শেয়ার দেই, নিজেদের এলিয়েন বলে দাবী করি। বিষয়টা মোটেও মজার কিছু নয়, সেটা চকবাজার ট্র‍্যাজেডি আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো আমাদের। আমরা এভাবেই মরে যাই, মিনিটের মধ্যে পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়াটাই আমাদের নিয়তি! এই শহরে প্রাণের কোন নিশ্চয়তা নেই। ব্যস্ত শহরে যানজটের ভেতরে বসে থাকা অবস্থাতেই জীবন্ত পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতে পারেন আপনি, বিশ্বাস হয়?

সরু গলি, ঘিঞ্জি এলাকায় কেন কেমিক্যাল কারখানা থাকবে, এই প্রশ্নের উত্তর কি কেউ দিতে পারবেন? একটা আবাসিক ভবনের নিচতলায় কেন বডি স্প্রে তৈরির কারখানা ভাড়া দেয়া হবে, এই প্রশ্নের উত্তরটাই বা কে দেবেন? বিশ্বের আর কোন জনবান্ধব শহরে এমন নজির আছে কিনা আমাদের জানা নেই। লাশের সংখ্যা বাড়ছে, আরও বাড়বে। আমাদের সচেতনতা বাড়বে না কখনও। ক’টা বাড়তি টাকার আশায় আবাসিক ভবনের নিচে কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দেবো আমরা, ডেকে আনবো শত শত মানুষের মৃত্যু। কর্তৃপক্ষও থাকবে উদাসীন। ক’দিন গেলেই আবার সব ভুলে যাবো, ভুলে যাওয়াটাই তো নিয়তি! মৃত মানুষগুলো তো একেকটা সংখ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয় আমাদের কাছে!

এসব ঘটনায় দারুণ একটা ব্যবসা অবশ্য হয়, সাহায্যের ব্যবসা। রাজনৈতিক নেতারা এখন জড়ো হবেন আহত-নিহতদের পাশে, অনুদান দেয়া হবে, পাওয়া যাবে অর্থসাহায্য। কর্পোরেট সংস্থাগুলোও এগিয়ে আসবে হয়তো। কিন্ত মানুষগুলো, যারা মারা গেলেন, তাদের কি ফিরে পাওয়া যাবে? হাজারটা বুলি না কপচিয়ে কোন মন্ত্রী কি ঘোষণা দেবেন, আজ থেকে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় একটাও রাসায়নিক কারখানা থাকতে পারবে না, এগুলো অন্য কোথায় স্থানান্তর করতে হবে এই মুহুর্তে- এই ঘোষণা দেয়ার মতো কলিজা কি কারো আছে? লাখ টাকার সাহায্য তো চাই না আমরা, আমরা চাই গ্যারান্টি। আজকের পরে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গোডাউনের কারণে আগুন লেগে একটা মানুষও মারা যাবে না- এই গ্যারান্টিটা কেউ দিতে পারবেন?

তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি হবে হয়তো। মাসের পর মাস ধরে চলবে নামকাওয়াস্তে তদন্ত। কোন একদিন হয়তো জানতে পারবো, রিপোর্ট এসেছে। তাতে কি? রিপোর্ট তো নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডেও এসেছিল, কি লাভ হয়েছে তাতে? চকবাজার ট্র‍্যাজেডি তো ঘটেছে। এরপরে অন্য কিছু একটা ঘটবে, এই ঢাকার বুকেই কোথাও হয়তো আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে জীবন্ত কিছু মানুষ। আমরা আবার শোক পালন করবো তখন, বয়ান ঝাড়বো, এটা তো ক্লাস এইটে পড়া ব্যাঙের জীবনচক্রের মতোই একটা ব্যাপার, একটা সার্কেলে চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে… এই সার্কেলটা এবার ভাঙুন প্লিজ। স্ট্যান্টবাজী, ডায়লগবাজী অনেক হয়েছে। মৃত্যুর মিছিলটা বন্ধ করার উদ্যোগ নিন দয়া করে। প্রতিটা মানুষের বাঁচার অধিকার আছে, সেই অধিকারটা নিশ্চিত করুন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button