মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

অধিকার

“দুই দিন বাদে নির্বাচন, আর তুই যাচ্ছিস ইন্ডিয়া বেড়াতে?” 
“নির্বাচন ধুয়ে কি পানি খাবো?” আমার কণ্ঠে বিরক্তি।
“কেন? ভোট দিবি না?” মা আবার প্রশ্ন করলো।
“ভোট দিয়ে কি লাভ?”
“বাবা শোন…” মা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো। “লাভ লোকসানের হিসেব করে কেউ ভোট দেয় না। এটা তোর দায়িত্ব নয়, এটা অধিকার!”
“বিরক্ত করো না তো মা!” আমি ব্যাগপ্যাকের ভেতর শেষ একটা কাপড় ঢুকিয়ে চেইন আটকে দিলাম। “বছরের শেষে বড় বন্ধ পাওয়া গেছে, বন্ধুরা মিলে ইন্ডিয়া ঘুরে আসি। এমন সুযোগ তো প্রতি বছর আসে না”।

মা আর কথা না বলে বের হয়ে গেলো আমার রুম থেকে। বুঝতে পারছি বেশ রাগ করেছে। কিন্তু আমার আসলে কিছুই করার নেই। ট্যুরের সব প্ল্যান করা হয়ে গেছে। নেহাল, কংকর, জ্যোতিশ, রজত, রুমানা, সুমাইরা- বন্ধুরা সবাই খুব এক্সাইটেড। প্রথমে আমরা যাবো কোলকাতা। সেখানে একদিন কাটিয়ে প্লেনে করে দিল্লি যাবো। সেখান থেকে একদিন আগ্রায় যাওয়ারও প্ল্যান আছে। বাসের টিকিট, প্লেনের টিকিট, হোটেল- সব বুকিং দেওয়া হয়ে গেছে। আগামীকাল ভোর ৬টায় রওনা দিচ্ছি।

আমি আরও কিছু গোছগাছ করে নিলাম। রুম থেকে বের হয়ে দেখলাম মা ড্রয়িং রুমে বসে চা খাচ্ছে। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম- “মা, রাগ করেছ?”

মা না-বোধক মাথা নাড়লো। এক মুহুর্ত থেমে থেকে বললো, “তোদের বয়সে ভোট নিয়ে আমরা খুব এক্সাইটেড থাকতাম। সে কি আনন্দ সবার চোখে মুখে! কাকে ভোট দিব, কেন দিব, কে জিতবে নির্বাচনে- এই সব নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে যেতো মাস দুয়েক আগে থেকেই। আর ভোট দেওয়া শেষ হতেই বসে যেতাম টিভির সামনে। একটু পর পর নিউজ আসতো কোন আসনে কোন প্রার্থী এগিয়ে আছে- কি যে ভালো লাগতো। পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনে জিতেছে শুনলে মনে হতো- আমি নিজেই জিতে গেছি!”

“সে তো আমারও মনে আছে মা”। আমি মৃদু হেসে স্মৃতি রোমন্থন করতে শুরু করলাম, “ছোট বেলা মনে হতো- নির্বাচন মানে জাতীয় উৎসব। বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল যেতে দেখলে সবাই ছুটে আসতাম রাস্তায়। বড় ভাইয়া তো মিছিলে ঢুকে গিয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করতো। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তায় রাস্তায় পোষ্টার গুনতাম। কোন প্রার্থীর পোষ্টার বেশি- তাই নিয়ে তর্ক করতাম বন্ধুরা মিলে। মসজিদ থেকে নামায পড়ে বের হওয়ার সময় বিভিন্ন প্রার্থীর কর্মীরা সবার হাতে হাতে লিফলেট ধরিয়ে দিতো। দুই ভাই মিলে সেগুলো এনে জমিয়ে রাখতাম।”

“নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য তো বদলায়নি বাবা!”

“নির্বাচনের উদ্দেশ্য নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই, এটা এখন সবার কাছে একটা টিপিক্যাল ছুটির দিন হয়ে গেছে। তাই আমরাও সেভাবেই নিয়েছি। অনেক দিন পর বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাচ্ছি, সবাই খুব এক্সাইটেড।”

মা আর কথা বাড়ালো না। বুঝে গেছে আমাকে আটকানো সম্ভব না। প্রসঙ্গ করে বললো- “তোরা কে কে যাচ্ছিস?”
“মোটামুটি সবাই যাচ্ছে”।
মা গলা খাঁদে নামিয়ে আনলো, যেন ষড়যন্ত্র করছে! “রুমানা মেয়েটাও যাচ্ছে বুঝি?”
“হ্যাঁ যাচ্ছে”।
“মেয়েটাকে কিন্তু আমার খুব ভালো লাগে”। মা ভ্রু নাচিয়ে ইঙ্গিত করলো। 
আমি বুঝলাম মা কি ইঙ্গিত করেছে। ঠোঁট টিপে হেসে বললাম- “সে তো আমাকে ফ্রেন্ডজোনে ফেলে রাখছে!”
“এই সুযোগে দেখ ফ্রেন্ডজোন থেকে বের হতে পারিস কি না! দুজনেরই তো বিয়ে শাদীর বয়স হয়েছে”।

মা-ছেলে গল্প গুজব করে আরও কিছুক্ষন কাটালাম। তারপর টুকটাক কিছু গোছগাছ করে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। ভোরবেলা উঠে বেরিয়ে পড়লাম বাসা থেকে। বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখলাম প্রায় সবাই উপস্থিত। কাউন্টার থেকে সবাইকে একটু অপেক্ষা করতে বলা হলো। ঢাকা-কোলকাতা বাস আসতে দেরি হবে। অগত্যা কি আর করা? লাউঞ্জে বসে সবাই অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমি আর রুমানা পাশাপাশি বসেছি।

“কি রে? তোকে এমন মনমরা লাগছে কেন?” রুমানা জিজ্ঞেস করলো। 
আমি হেসে উত্তর দিলাম, “মা চাচ্ছিলো এখন দেশের বাইরে না যাই। দুদিন পর নির্বাচন”।
“এই জন্যই তো এখন দেশের বাইরে যেতে হবে। এই গ্যাঞ্জামের মধ্যে দেশে থাকা তো বোকামি”। 
আমি হাসলাম।

রুমানাকে আপাদমস্তক দেখলাম একবার। জিন্স আর ফতুয়া পড়েছে, তার উপরে কালো লেদার জ্যাকেট। মাথায় কান ঢাকা টুপি। ঠোঁটে হালকা লিপিস্টিক দিয়েছে আর কাজল দিয়ে চোখ এঁকেছে সুন্দর করে।

নিজের অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো, “তোকে আজ খুব সুন্দর লাগছে”।
“এই কথা তো তুই প্রতিবার দেখা হলেই বলিস”। রুমানা লাজুক ভঙ্গিতে একটু হাসলো।
“কি করবো বল? তোকে যেকোনো ড্রেসে, যেকোনো সাজে খুব সুন্দর লাগে”। 
“পটানোর ট্রাই করতেছিস মনে হয়?” রুমানা হাসিটা ধরে রেখেছে। 
“আরে না না!” আমি জিভে কামড় দিলাম।
“লাভ নেই বাছাধন”। রুমানা এক চোখ টিপে বললো, “উই আর জাস্ট ফ্রেন্ডস!” 
একটু অপ্রস্তুত বোধ হচ্ছে আমার। মেয়েটা জানে আমি তাকে পছন্দ করি। তাকে নিয়ে বন্ধুত্বের বাইরে কিছু চিন্তা করি। কিন্তু সে সব বুঝেও না বোঝান ভান করে থাকে সব সময়। আমি পারি না! অভিনয় আমাকে দিয়ে হয় না।

বাসের কাউন্টার থেকে একটা ব্যাড নিউজ শোনালো আমাদের- ঢাকা থেকে কোলকাতাগামী তাদের কোম্পানির একটা বাস নাকি এক্সিডেন্ট করেছে। তাই অনির্দিষ্ট কালের জন্য কোলকাতাগামী সকল বাস সার্ভিস বন্ধ থাকবে।

আমরা সবাই হতাশ হয়ে গেলাম। তবে কি তীরে এসে তরী ডুবল? এতো প্ল্যান প্রোগ্রাম করলাম সবাই মিলে। শেষে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে তো ছুটিটাই মাটি হয়ে যাবে! এদিকে সময়মতো কোলকাতা যেতে না পারলে বুকিং ক্যানসেল হয়ে যাবে।

বন্ধু নেহাল জানালো অল্টারনেটিভ একটা উপায় জানা আছে তার। সে খোঁজ খবর নিতে চলে গেলো।

এর মধ্যে মায়ের ফোন! আমি রিসিভ করলাম- “হ্যালো মা”।
“কি রে? বাসে উঠে না আমাকে ফোন দেওয়ার কথা?”
“বাসে তো উঠতে পারিনি, মা। একটা ঝামেলা হয়ে গেছে”। 
“কি ঝামেলা?” 
“কোথায় যেনো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। তাই ঢাকা টু কোলকাতা বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে”।
“বলিস কি? কি করবি এখন?”
“নেহাল গেছে খোঁজ নিতে।” 
“আমি বলি কি নাজিম… তুই বাসায় চলে আয় বাবা”। মা বললো, “একটা বাঁধা পড়েছে যখন, আর না যাওয়াই ভালো”। 
আমি কিছু একটা বলতে যাবো, এ সময় নেহাল দৌড়ে এসে বললো- “ব্যবস্থা হয়েছে! চল সবাই”।
আমি ফোনে বললাম, “মা, নেহাল বলছে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে”।
“বাবা শোন… দূরের রাস্তায় যাচ্ছিস, বাঁধা পড়লে অলক্ষন হয়। না যাওয়াই ভালো হবে”।
“ভয় পেও না মা। কিচ্ছু হবে না”।

আমি ফোন রেখে দিলাম। নেহাল ব্যাখ্যা করছে কিভাবে যাবে- “আমরা প্রথমে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা যাবো। সাতক্ষীরা পৌঁছানোর পর একটা টেম্পুতে করে বর্ডার যাবো। পায়ে হেঁটে বর্ডার ক্রস করে ঐ পাড় থেকে গাড়ি নিয়ে কোলকাতা পৌঁছে যাবো”।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সময় লাগবে না অনেক?”
নেহাল বললো, “সময় বরং আরও কম লাগবে। অনেকেই এভাবে যায়। কিন্তু একটা সমস্যা আছে… সাতক্ষীরাগামী কোন টিকিটের বাস চলছে না আজ। গাবতলি গিয়ে একটা লোকাল বাসে চড়তে হবে”।

অগত্যা কি আর করা। সবাই দলে দলে গাবতলি রওনা হলাম। সেখানে গিয়ে দেখি বাসের সংখ্যা একেবারেই কম। দুই তিন ঘন্টা পর একটা করে বাস আসছে। ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করার পর একটা বাস পেলাম। সবাই উঠে পড়লাম। বাসে অনেক লোক, বেশ গাদাগাদি করে বসা লাগলো সবাইকে। আমি বসলাম একেবারে সামনে গিয়ে ড্রাইভারের পাশের ছোট একটা সিটে।

বাসের ড্রাইভার খুব রসিক মানুষ। স্টার্ট দিয়েই সে আমার সাথে খোশ-গল্পে মেতে উঠলো। বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে বাস যাচ্ছে আর ড্রাইভার সেই রাস্তা নিয়েই আমার সাথে গল্প করছে।

ঘন্টা দুয়েক কেটে গেছে। ব্যস্ত নগরী ঢাকাকে পেছনে ফেলে অনেক দূর চলে এসেছি আমরা। ড্রাইভার আশে পাশের রাস্তাঘাট দেখিয়ে বললো, “ভাইজান, আমার বাড়ি এই এলাকায়”। 

“বাহ, সুন্দর যায়গা তো!” আমি বললাম।
“হ, সুন্দর! তয় তিন-চার বছর আগে আইলে এমন দেখতে পাইতেন না! সব রাস্তা ছিলো ভাঙ্গা। যায়গায় যায়গায় গর্ত। দুইবেলা এক্সিডেন্ট হইতো। বর্ষাকালে খানা খন্দ ভইরা যাইতো পানিতে!” 
“তাই নাকি? রাস্তার এই রুপ বদলে গেলো কি করে?” আমি তো অবাক! 
“আমাগো এমপি সাব খুব ভালা মানুষ। পাবলিকের দুঃখ কষ্ট বুঝে। হেয় কইছিল নির্বাচনে জিতলে সবার আগে এই রাস্তা ঠিক করবো। লোকটা কথা রাখছে। রাস্তা ঠিক করছে, ওভারব্রিজ বানাইছে, দুইটা নতুন স্কুল দিছে, মসজিদ দিছে, আরও কত কিছু করছে। এলাকার রুপ বদলায় দিছে। এইবার নির্বাচনেও আমরা তারেই ভোট দিমু ঠিক করছি”। 
“বাহ! শুনে ভালো লাগলো”।

আমার মনে পড়ে গেলো আমাদের বাড়ির সামনের ভাঙ্গা রাস্তার কথা। রাস্তাটা দীর্ঘদিন যাবত অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। বড় বড় বাস ট্রাক যায় ওদিক দিয়ে। প্রায়ই দূর্ঘটনা ঘটে। অথচ কারো কোন বিকার নেই! একটা ওভারব্রিজ আছে, সেটাও কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে আছে। উঠলেই মনে হয় ভেঙে পড়বে। বর্ষাকাল এলে রাস্তায় হাঁটু পানি জমে, চলাচল মুশকিল হয়ে যায়! এই একালার মতো একজন ভালো এমপি থাকলে হয়তো এই বাজে অবস্থা আর দেখতে হতো না!

ড্রাইভার গাল ভরে হেসে বললো, “ভাইজান! একটু সামনে আগাইলেই ম্যাজিক দেখতে পাইবেন”।
“ম্যাজিক?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
ড্রাইভার কোন জবাব না দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গেলো।

একটু সামনে আসতেই বুঝলাম ম্যাজিক বলতে ড্রাইভার আসলে কি মিন করেছে! সামনের রাস্তাটা দেখে মনে হচ্ছে এটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র ছিলো! পাহাড়ি এবড়ো-থেবড়ো রাস্তাও মনে হয় এতোটা খারাপ হয় না। বিশাল বিশাল গর্তে মধ্যে পড়ে আমাদের বাসটা ফুটবলের মতো বাউন্স খেতে খেতে এগিয়ে চললো। ড্রাইভার স্টিয়ারিং হুইলের সাথে রীতিমত কুস্তি লড়ছে।

“এই এলাকার… রাস্তার… এই অবস্থা কেন ভাই…” ঝাঁকি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“আর কইয়েন না ভাই… এক বদমাইশ এমপি হইছে এইখান থেইকা… শালায় ভোটে জিতার পর সেই যে ঢাকায় গেছে… আর মনে হয় না নিজের এলাকায় আইসা উঁকি দিয়া দেখছে… এখন নির্বাচন দেইখা আবার আসছে… ভোট চাইতাছে… জিতলে বলে রাস্তা ঠিক করবো… মানুষের আক্কেল থাকলে আর ওরে ভোট দিবো না!”

ভালো আর মন্দের পাশাপাশি অবস্থান দেখলাম আজ! নির্বাচনে একজন ভালো মানুষের বিজয়ী হওয়াটা যে কত জরুরী, তা আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই ভাঙ্গা রাস্তাটা। তখনও জানিনা একটু পরে কি ঘটতে চলেছে…

আমাদের বাসের সামনে একটা রিক্সা ঝাঁকি খেতে খেতে যাচ্ছিলো, হঠাৎ তাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে পড়ে গেলো। রিক্সায় একটা অল্প বয়সী বাচ্চাকে কোলে নিয়ে মা বসেছিলো। রিক্সা থেকে বাইরে ছিটকে পড়লো তারা। রাস্তার লোকজন- বাসের ভেতরের যাত্রীরা- সবাই আতংকে চিৎকার করে উঠলো। আমাদের বাসটা তেড়ে যাচ্ছে মাটিতে পড়ে থাকা মা আর সন্তানের দিকে। মায়ের চোখে মুখে মৃত্যুভয় স্পষ্ট দেখলাম আমি, সে নিজের শরীর দিয়ে বাচ্চাটাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম।

একেবারে শেষ মুহুর্তে আমাদের ড্রাইভার বাসটা থামিয়ে ফেলতে সক্ষম হলো। বাস থেকে আমরা বন্ধুরা সবাই হুরমুর করে নেমে পড়লাম। দৌড়ে গেলাম বাচ্চাটা আর তার মায়ের দিকে। তাদের তুলে নিয়ে গেলাম স্থানীয় একটা ফার্মেসিতে। দুজনের শরীরের অনেক জায়গায় ছিলে গেছে। রিক্সাওয়ালাও মারাত্মক জঘম হয়েছে। বাচ্চাটার বয়স আড়াই তিন বছর হবে। আতংকে যেনো জমে গেছে। এই শোক কাঁটিতে উঠতে তার অনেকদিন লাগবে।

ড্রাইভার আমাদের বাসটাকে রাস্তার একপাশে নিয়ে দাড় করালো। যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললো- “এইখানে একটা বড় হোটেল আছে। আপনারা নাইমা কিছু খাইয়া দাইয়া রেস্ট নেন। বিশ মিনিট পর আবার রওনা দিমু আমরা”।

আমরা স্থানীয় হোটেলে গিয়ে বসলাম। সবাই এখনও একটা শকের ভেতর আছি। আমাদের সাথে বাস থেকে একজন বয়স্ক ব্যক্তি নেমেছেন। তিনি আমাদের কাছাকাছি এসে বসলেন। সুন্দর করে হেসে বললেন- “বাবারা কই যাচ্ছেন আপনারা?” 
“ইন্ডিয়া যাচ্ছি চাচা। বেড়াতে”। আমি বললাম। 
“ওমা! এই সময়ে দেশের বাইরে যাবেন? একদিন পরেই না নির্বাচন? ভোট দিবেন না?”
“ভোট দিয়ে লাভটা কি?” বন্ধু জ্যোতিষ বললো। “যে দলই ক্ষমতায় আসুক, নিজেদের পকেট ভরতে মন দেয়। দেশের উপকারে কাজ করে কে?”
“কথাটা ঠিক না বাবা”। ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। “দেশের সব লোক খারাপ হয়ে গেলে দেশ আগাইতো কি করে? ভালো লোক এখনও আছে। আমাদের কাজ হচ্ছে তাকে নির্বাচিত করা”। 
রুমানা বললো, “ঐ রকম ভালো লোক হাতে গোণা চাচা! আমার এলাকায় যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে তাদের একজনও ভালো না। ভোট কেন দিব বলুন?” 
লোকটা নাছোড়বান্দার মতো বললো, “তাইলে যে দল তোমার ভালো লাগে, সেই দলের প্রার্থীকে ভোট দিবা”। 
“কোনো দলের আদর্শ আমার ভালো লাগে না, চাচা”। রুমানা বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললো। 
ভদ্রলোক এবার মুচকি হাসলেন। বললেন, “তাহলে যে প্রার্থী সবচেয়ে কম খারাপ, তাকে ভোট দিবা। কিন্তু ভোট তো তোমাকে দিতেই হবে”।

রুমানা এবার আর বলার মতো কথা খুঁজে পেলো না।

মিনিট বিশেক পর আমরা আবার বাসে উঠে এলাম। ড্রাইভার এবার বেশ আস্তে আস্তে বাস চালিয়ে ভাঙা রাস্তাটা পার হয়ে এলো। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। কিন্তু আমি পারলাম না। আমার মনটা ভার হয়ে আছে। আমরা নাহয় দূর্ঘটনা এড়িয়ে বেঁচে আসতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের পর যে গাড়িগুলো আসছে তারা যে দূর্ঘটনায় পড়বে না, তার কি নিশ্চয়তা আছে? নিজে বাঁচতে পারাটাই কি সব? মানুষের কথা ভাবতে হবে না? দেশের কথা ভাবতে হবে না? আতংকে জমে যাওয়া ঐ বাচ্চাটার মুখ আমার মনের চোখে এখনও ভাসছে। কিছুতেই তাড়াতে পারছি না।

আমি কঠিন গলায় বললাম- “ড্রাইভার সাহেব, বাস থামান”। 
“কি কইলেন ভাইজান?”
“বললাম- বাস থামান! আমি নামবো!”

ড্রাইভার ব্রেক কষে বাস থামালো। আমি সিট থেকে উঠে এলাম। যাত্রী সিটের উপর থেকে ব্যাগপ্যাকটা নামিয়ে নিলাম। কাঁধে চড়ালাম। আমাকে উঠতে দেখে নেহাল আর রুমানা এগিয়ে এলো।

“কি ব্যাপার নাজিম? তুই করছিস কি?” নেহাল জিজ্ঞেস করলো। 
“আমি ফিরে যাচ্ছি ঢাকায়”।
রুমানা আমার হাত ধরলো। “কেন?” 
“দুদিন বাদে নির্বাচন। ভোট দিতে হবে।”
মেয়েটা আমার হাত ধরে টান দিলো- “তুই একটা ভোট না দিলে নির্বাচনের ফলাফল চেঞ্জ হয়ে যাবে?”

“তোর আর আমার মতো আরো হাজারো লোক এমনটাই ভাবছে। কিন্তু আজ যদি আমাদের ভোট না পাওয়ার কারনে একজন ভালো মানুষ নির্বাচনে হেরে যায়, আর একজন বদ লোক নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে, তার দায়ভার আমাদেরই হবে!”

আমি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নামতে গেলাম। রুমানা আবার হাত ধরলো আমার। আমি ঘুরে তাকালাম। রুমানার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। 

“নাজিম শোন… এই টুরটা আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সারপ্রাইজ প্ল্যান করে রেখেছি। আগ্রার তাজমহলের সামনে তোকে আমি প্রপোজ করবো”।

কথাটা শুনে আমি চমকে উঠলাম। রুমানার চোখের কোনে অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে, আমার খারাপ লাগছে মেয়েটির জন্য। নিশ্চয়ই কয়েক মাস আগে থেকে এই দিনটার জন্য প্ল্যানিং করছে মেয়েটা। আমি নিজের মনকে প্রবোধ দিলাম- 
“রুমানা, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহণ করাটা। এটা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এই অধিকার এনে দেওয়ার জন্য একাত্তরে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলো। আজ আমরা যদি এই অধিকারকে তুচ্ছ ভাবি, তাহলে তাদের আত্মা কষ্ট পাবে…”

“আমি কিচ্ছু বুঝি না… তুই আমাদের সাথে যাবি… ব্যাস!”
আমি রুমানার চোখে চোখ রেখে বললাম, “তুইও চল আমার সাথে। বেঁচে থাকলে ট্যুরে যাওয়ার সুযোগ জীবনে বহুবার আসবে”।
রুমানা কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। তারপর হ্যাঁ-বোধক মাথা ঝাকালো। 
আমি মৃদু হাসলাম। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললাম- “তোরা ঘুরে আয়। আমরা অপেক্ষায় থাকবো”।

আমি আর রুমানা হাত ধরে নেমে পড়লাম বাস থেকে।

হাইওয়ে রোডের পাশে ঘন গাছ পালা। আমরা খানিকটা এগিয়ে এসে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। সিদ্ধান্তটা নিতে পেরে কেমন যেনো ফুরফুরে লাগছে! নিজেকে মনে হচ্ছে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক!

একটা বাস আসছে দেখে হাত তুললাম। বাসটা থামলো। উঠে পড়লাম আমরা। পাশাপাশি দুটো সিট ফাকা পেয়ে বসে পড়লাম।
রুমানাকে জিজ্ঞেস করলাম- “রাগ করেছিস?”
রুমানা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো, “নাহ!”
“একটা খেলনা তাজমহল কিনে দেবো তোকে। ওটার সামনে দাঁড়িয়ে প্রপোজ করিস…”
রুমানা লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো আবার।

পকেট থেকে মোবাইল বের করে মায়ের নম্বরে ফোন দিলাম আমি। রিসিভ হতেই বললাম, “যাচ্ছি না মা! আমি ঢাকায় ফিরে আসছি…”
“সত্যি?” 
মায়ের কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারছি কতোটা খুশী হয়েছে! আমি মৃদু হেসে বললাম, “আচ্ছা মা… আমাদের এলাকা থেকে এবার কে কে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে যেনো…”

(সমাপ্ত)

…………

গল্প : অধিকার
নাজিম উদ দৌলা
২৮/১২/২০১৮

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button