খেলা ও ধুলা

একটু উনিশ বিশ হলেই…

ঠিক যেন ভিডিও গেমসের কোন দৃশ্য! জিটিএ ভাইস সিটি কিংবা মরটাল কমব্যাট, অথবা হালের পাবজি! আততায়ী এক বন্দুকধারীর মাথায় ক্যামেরা বসানো, অটোমেটিক সেই বন্দুক তাক করে সে ছুটে যাচ্ছে সামনের দিকে। ভিডিওতে দেখে প্রথমে বোঝা যায়নি, পরে দৃশ্যমান হলো, এটা আসলে একটা মসজিদ। দরজায় দাঁড়িয়েছিল পাঞ্জাবী আর টুপি পরিহিত একজন, একটানা ঠাস ঠাস শব্দ শোনা গেল বার তিনেক, বন্দুকের নল থেকে ছিটকে বেরুতে দেখা গেল আগুনের স্ফুলিঙ্গ! দরজার সামনেজ লুটিয়ে পড়লেন একজন, গুলিবিদ্ধ আরেকজন কাতরাতে কাতরাতে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ঠান্ডা মাথায় একাধিকবার গুলি করা হলো তাকেও, নিস্তেজ হয়ে গেল শরীরটা!

অ্যাকশন সিনেমার কোন চিত্রনাট্য পড়ে শোনাচ্ছি না আপনাদের, এই ঘটনাটাই আজ বাংলাদেশ সময় সকালে ঘটে গেছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে। বন্দুকধারী এক ব্যক্তির হামলায় সেখানকার একটা মসজিদে নিহত হয়েছে কমপক্ষে পঁচিশজন! আরও ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, দুপুরে জুম্মার নামাজ আদায়ের জন্যে সেই মসজিদে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্যরা। তারা যখন মসজিদের সামনে, তখনই ঘটেছে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। সেখান থেকে দৌড়ে সরে গিয়েছেন তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। টুইটারে তামিম জানিয়েছেন, ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তারা, তবে দলের কারো কোন বিপদ হয়নি।

বিপদ হয়নি, কিন্ত হতে পারতো, ঘটতে পারতো খুব খারাপ কিছু। যেটা ঘটে গেছে নিরীহ কিছু মানুষের সঙ্গে। উন্মাদ এক ফ্যানাটিকের খুনে মানসিকতা প্রাণ নিয়েছে প্রায় পঁচিশজনেরও বেশি মানুষের। একটা ভিডিওতে দেখা গেছে, অটোমেটিক বন্দুক হাতে পাখি শিকারের মতো করে মানুষকে গুলি করে মারছে এক মানসিক বিকারগ্রস্থ!

একের পর এক ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, মানুষগুলো লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। তাতেও ক্ষান্ত দিচ্ছে না আততায়ী, নিথর শরীরের ওপরেও একটানা গুলি চালিয়ে যাচ্ছে সে, কেউ প্রাণে বেঁচে যাক, এটা যেন কোনভাবেই চায় না সে! সবার মৃত্যু নিশ্চিত করাটাই যেন তার লক্ষ্য!

জানা গেছে, স্থানীয় সময় দুপুরে ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভাল মাঠের পাশের এক মসজিদে এই হামলা হয়। শুক্রবারের জুম্মার নামাজ আদায়ের জন্যে মুসল্লিরা তখন মসজিদে সমবেত হয়েছিলেন। প্র‍্যাকটিসে বিরতি দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটারেরাও তখন মসজিদের পথে ছিলেন। মসজিদে প্রবেশের আগমুহূর্তে স্থানীয় এক ভদ্রমহিলা তাদের মসজিদে ঢুকতে নিষেধ করেন। বলেন, এখানে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তার গাড়িতেও গুলি লেগেছে!

এরইমধ্যে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত এক মহিলা বেরিয়ে আসেন মসজিদের ভেতর থেকে, স্থানীয় কয়েকজন দ্রুত তাকে সরিয়ে নেন সেখান থেকে। আতঙ্কিত খেলোয়াড়েরা তখন দৌড়ে হ্যাগলি ওভালে ফেরত আসেন। আর কয়েকটা মিনিট আগে ক্রিকেটারদের গাড়ি মসজিদ প্রাঙ্গনে ঢুকলে সারি সারি লাশের মধ্যে তারাও স্থান পেতেন হয়তো! হ্যাগলি ওভাল থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় ক্রিকেটারদেরকে হোটেলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তামিম ইকবাল সঙ্গে সঙ্গেই টুইট করে জানিয়েছেন, ভীতিকর এক অভিজ্ঞতা থেকে বেঁচে ফিরেছেন তারা, দলের কারো কোন ক্ষতি হয়নি। মুশফিকুর রহিম পরে ফেসবুকে পোস্ট করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন।

হতাহতের সংখ্যাটা এখনও পরিস্কার নয়, একেক গণমাধ্যম একেক রকমের সংখ্যা বলছে। শুরুতে ছয়জন নিহত হবার কথা বলা হলেও, মসজিদে হামলার পরে ক্রাইস্টচার্চ শহরের আরও কয়েকটা জায়গায় হামলার খবর আসতে থাকে। তাই নিহতের সংখ্যা বিশজনের বেশি হতে পারে বলে দাবী করছে গণমাধ্যমগুলো। এমনকি সেটা অর্ধশতক ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও অনেকের ধারণা!

২০০৯ সালে পাকিস্তানে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলকে বহনকারী বাসের ওপরে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল, সেই হামলার লক্ষ্যবস্তুই ছিলেন ক্রিকেটারেরা। ক্রাইস্টচার্চে বাংলাদেশী ক্রিকেটারেরা লক্ষবস্তু ছিলেন না, কিন্ত সময়ের ব্যবধানটা একটু উনিশ-বিশ হলেই এতক্ষণে হয়তো জাতীয় দলের কোন ক্রিকেটারের লাশ পড়ে থাকতো ক্রাইস্টচার্চের সেই মসজিদের ভেতরে! ভাগ্যিস, সেরকম কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টটা বাতিল ঘোষণা করা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেট খেলার কোন মানেই হয় না, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের যতো দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে আনাটাই এখন সবচেয়ে জরুরী কাজ।

আপডেট- বাতিল করা হয়েছে ক্রাইস্টচার্চ টেস্ট, দেশে ফিরছে বাংলাদেশ দল।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button