মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

জ্যোতি সিং নির্ভয়া হয়েছিল, নুসরাত হোক আমাদের অপরাজেয়া জয়ীতা!

যদি নুসরাতের ঘটনা থেকে আমরা এখন সকল নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হবে না। ইতিহাস, সাক্ষ্য, সময়, পরিস্থিতি- সবগুলো ফ্যাক্টর আপনাআপনি এক হয়েছে নুসরাতের শাস্তিকে কেন্দ্র করে সকল নির্যাতনের প্রতিবাদ করবার জন্য! এটাই সুযোগ!

এই মেয়েটি তাঁর সাহসিকতায় আমাদের অনেকগুলো সুযোগ করে দিয়ে গেছে যেগুলো আমরা প্রচলিত সমাজের stigma-এর জন্য এগুতে পারি না। সামাজিকভাবে একটা বড় অংশ নারী নির্যাতনের পিছনে মেয়েদের পোশাক, চলাফেরা-ইত্যাদিকে দায়ী করেন।

(ব্যক্তিগতভাবে আমি একদমই তা মনে করি না। এমনকি ইসলামেও সূরা নূরের ৩০নাম্বার আয়াতে প্রথমে পুরুষদের দৃষ্টি এবং লজ্জ্বাস্থান সংযত রাখতে বলা হয়েছে। সেটাই পুরুষ হিসেবে আমার করার কথা। সেভাবে না চললে আল্লাহর আমার বিচার করার কথা। নারীরা কীভাবে চললেন সেই নির্দেশনা তাঁরা না মানলে আল্লাহ তাঁর বিচার করবেন। পুরুষ হিসেবে যেহেতু আমি আগেই দৃষ্টি নামিয়ে ফেলার কথা তাই আমার তা জানারই কথা না!)

যাই হোক, মূল কথায় আসি। নুসরাতের ব্যাপারে আমাদের সমাজের কোন অজুহাতই খাটবে না। তাঁর পরিবার ধার্মিক। সে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। এবং মাদ্রাসার ভিতরেই তাঁর বিরূদ্ধে নির্যাতন-অগ্নিকাণ্ড সব করা হয়েছে। তনুর মতো সে হিজাব করেও ‘গান গাইতে গেসিলো কেন’- এইরকম কথা বলারও সুযোগ নাই। মোটকথা ভিক্টীম ব্লেইমিং এর কোন সুযোগই নুসরাত রাখে নাই।

এখন একটু ইতিহাসে যাই। কাল যখন ভিডিও দেখছিলাম তখন ওসি সাহেবকে নুসরাত বলছিলো যে তাঁর নামে আগের রেকর্ড নিয়ে সিরাজ উদ দৌলা তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করে। আমি ভাবছিলাম কীসের রেকর্ড! পরে পত্রিকায় পড়লাম, নুসরাতের ঘটনা শুধুমাত্র গত ১৫ দিনের ঘটনা নয়। আজ থেকে ২ বছর আগে নুসরাত যখন এসএসসি (আলিম) পরীক্ষা দেয় তখনও নূর আলম (যিনি সিরাজ উদ দৌলার পক্ষে মিছিল করেছে) নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, এবং নুসরাত তাতে রাজি না হওয়ায় চোখে চুন মাখিয়ে দেয়। তখনই এই ঘটনাটা পত্রিকায় আসে, এমনকি সেখানকার ইউএনও নুসরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এর বিচার হবে। দুই বছরে যে কিছুই হয় নাই, সেটা তো জানিই। নুসরাতের গায়ে আগুন না দিলে এটারও কিছু হতো না। আগুন দেয়ার পরেই না আমরা সাধারণ মানুষেরা এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিলাম। নাহলে নারী নির্যাতন আমাদের দেশে আবার চিন্তা করার কোন বিষয় নাকি?

দিল্লীর নির্ভয়ার নাম কিন্তু নির্ভয়া ছিল না। সে নির্ভীকভাবে ডেথ বেডে সাক্ষ্য দিয়েছিলো বলেই তাঁকে দিল্লীর জনগণ ‘নির্ভয়া’ ডেকেছিলো! সে হিসেবে আমাদের নুসরাত প্রচণ্ড সাহসী, অপরাজেয় নারী! অন্যান্য নির্যাতন বা খুনের কেসে যেটি হয় যে সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকে না; নুসরাতের কেসে কিন্তু সেটার অভাব নেই! সে নির্যাতিতা হবার পরেই পুলিশের কাছে গিয়েছে। পুলিশ অনৈতিকভাবে ভিডিও ধারণ করলেও সে সব কথা বলে গিয়েছে, সে তাঁর বান্ধবীকে দুই পৃষ্ঠার চিঠি লিখেছে সেখানে ঘটনার বর্ণনা করেছে, আগুন দেবার পরে তাঁকে যখন হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিলো তখন অ্যাম্বুলেন্সে সে তাঁর ভাইকে রেকর্ড অন করতে বলে জবানবন্দী দিয়েছে, হাসপাতালে ডাক্তারদের কাছে জবানবন্দী দিয়েছে! প্রত্যেকটি স্তরে সে তাঁর উপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে।

যৌন নিপীড়ক সিরাজ উদ দৌলা

এবং তাঁর কোন জবানবন্দীতেই কোন নতজানু ভাব নেই। সে চিঠিতে লিখেছে, “আমি লড়বো শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।”- কী বলিষ্ঠ কথা! সে বাঁচতে চেয়েছে, বিচার চেয়ে বাঁচতে চেয়েছে।

এবারে আসি এই পুরো ঘটনাটার সময় নিয়ে! আমাদের প্রজন্মের বিরূদ্ধে একটা অভিযোগ এই যে আমরা রাস্তায় নামি না, ফেসবুকে হ্যাশট্যাগে বিপ্লব করি। নুসরাত এমন এক সময়ে মরেছে যে আমরা এমনিতেই রাস্তায় নেমে তাঁর বিচার চাইতে পারি। আজকেই শুক্রবার। মোটামুটি সবাই জুম্মায় যায়। বায়তুল মোকাররম সহ জেলা শহরগুলোর মসজিদগুলোতে অন্তত একটা করে বিক্ষোভ জমায়েত করার জন্য লোকও ডাকতে হবে না! শাহবাগ তো আছেই। শুক্রবারে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ মাহফিলগুলো হয়। আজকে ওয়াজ মাহফিলগুলোতে হুজুরেরা নুসরাত হত্যার বিচার চান। তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া করুন।

বড় একটা সুযোগ আছে কারণ দুইদিন পরেই পহেলা বৈশাখ। এবার চারুকলায় পহেলা বৈশাখের মূলমন্ত্র হচ্ছে, ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে!’- মস্তক তোলার এইতো সময়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়। সেখানে কয়েকটা প্ল্যাকার্ড থাকতে পারে না নুসরাত সহ সকল নির্যাতনের হত্যার বিচার চেয়ে? যে লাখো মানুষ এদিন সকালে ঢাকায় থাকে তাঁর কয়েক হাজারও যদি হাতে একটা ‘বিচার চাই’ প্ল্যাকার্ড ধরে রাখে তাহলেও তো হয়!

রবীন্দ্র সরোবর থেকে শুরু করে বিভিন্ন খোলা মাঠের ওপেন এয়ার কনসার্টে- আমাদের দেশের প্রায় সব শিল্পীই পুরো দেশজুড়ে, জেলায় জেলায় কনসার্ট করেন। বিভিন্ন চ্যানেলে সেগুলো লাইভ দেখানো হয়। সেখানে মানুষেরও অভাব হয় না! নুসরাতের মৃত্যুর তিনদিনের মধ্যে সারাদেশজুড়ে এমন লাখ লাখ মানুষের একসাথে হবার সুযোগই বা এমনিতে কোথায় পেতাম আমরা? শিল্পীরা তাঁদের গান গাইবার সময় বা আগে একবার করে নুসরাতের হত্যার বিচার চান, কনসার্টে উপস্থিত হাজার মানুষ তাতে একমত প্রকাশ করুক!

Image Credit- The Daily Star

দেশের বাইরে আমরা যারা আছি তাঁরা যদি বৈশাখ উপলক্ষ্যে কোন অনুষ্ঠান উপস্থিত হলে, সেখানে নিজেদের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি! হত্যার বিচার চাই!

মিডিয়ার ভূমিকা ভালো লাগছে। তাঁরা যেভাবেই হোক নুসরাতের ঘটনাটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। ছবিতে দেখছি চিরায়ত দ্বন্দ্বে থাকা ধর্ম নিরপেক্ষ প্রগতিশীলেরা যেমন নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে ব্যানার নিয়ে নেমেছেন, ঠিক তেমনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় আলেম সমাজ ধর্মীয় জায়গা থেকেও শাহবাগে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছেন! সোনাগাজীতেই শুধুমাত্র প্রথমদিন ওই সিরাজ উদ দৌলার পক্ষে মিছিল হয়েছে। সেটা যে স্থানীয় আওয়ামী-বিএনপি-জামাত তিন নেতার একত্র প্রয়াস তাও মিডিয়ায় দেখা গেছে। সে কারণে সেই মিছিলকে আমি সেখানকার জনসাধারণের স্বাভাবিকতা বলতে আমি রাজি না। সেটা স্থানীয় প্রভাবের ভয়ের ফসল শুধুমাত্র। বরং নুসরাতের জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল প্রমাণ করে নুসরাতের পক্ষেই এলাকার মানুষ ছিল।

অনেকদিন পরে নুসরাত ইস্যুতে দল-মত-ধর্ম-অধর্ম নির্বিশেষে আমরা সবাই এক হতে পারছি।

আমাদের অনুকূলে এবার সবগুলো ফ্যাক্টর আছে। নুসরাত যে সাহস নিয়ে সব জায়গায় জবানবন্দী দিয়ে গিয়েছে, সেই সাহসের প্রতি সম্মান দেয়া এখন আমাদের দায়িত্ব! সকল স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়-পাড়া-মহল্লার নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরূদ্ধে সমাজের এক paradigm shift হবে নুসরাত হত্যার বিচার দিয়ে, এটাই কামনা!

জ্যোতি সিং যেভাবে নির্ভয়া হয়েছিলো সেভাবে নুসরাত জাহান রাফি হোক আমাদের অপরাজেয়া জয়ীতা!

#JusticeForNusrat

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button