মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আমি নুসরাতের বিচার দাবী করছি!

শিরোনামটা ভুল পড়েননি, আমি নুসরাত জাহান রাফির বিচারই দাবী করছি। পাঁচদিন ধরে পোড়া শরীরে দগদগে ঘা নিয়ে মৃত্যুর সাথে প্রাণপণ লড়াই করে হেরে যাওয়া নুসরাতের বিচার চাইছি আমি, তার খুনীদের নয়, তাকে যে অমানুষটা যৌন হয়রানি করেছে, তার বিচারও চাইছি না। এদের বিচার চেয়ে কি হবে? আজ পর্যন্ত ক’টা ধর্ষক-নিপীড়কের বিচার হয়েছে বাংলাদেশে? তারচেয়ে বরং নির্যাতিতা নারীর বিচার চাওয়া যাক, তাতে যদি মেয়েগুলো একটু শোধরায়!

একদম শুরু থেকেই হিসেব কষা যাক চলুন। ছাব্বিশে মার্চ ২০১৯, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানী করেছিলেন নুসরাতকে। এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এটাই কিন্ত লম্পট আচরণের প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে শিশু বলাৎকারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে, অন্য এক মাদ্রাসা থেকে একারণে বহিস্কৃতও হয়েছিল সে। সিরাজ উদ দৌলার কিছুই হয়নি, সেই শিশুটি ভয়াবহ এক স্মৃতিকে সঙ্গী করে হয়তো বেঁচে আছে এখনও, তবে তার পরিণতি তো নুসরাতের মতো ভয়ঙ্কর হয়নি, শরীরের আশিভাগ পুড়িয়ে দেয়নি কেউ! নুসরাত শিশু হলে হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেও পারতো। দোষ তো নুসরাতেরই!

এবছরই আরেক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছিল লম্পট অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে। এর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছে অভিযোগ, কিন্ত অধ্যক্ষ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় সব ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। বড় পরিসরে কেউ প্রতিবাদ করেনি, মান-সম্মানের কথা ভেবে কেউ থানা-পুলিশ পর্যন্ত যায়নি। নুসরাত গিয়েছিল, আর সেটাই কাল হয়েছিল তার জন্যে। দোষ তো মেয়েটারই! কি হতো যদি সে চুপ করে মুখ বুজে থাকতো? কেউ তার গায়ে আগুন দিতো না, নির্যাতনের শিকার হলেও, মেয়েটা বেঁচে তো থাকতো, তাই না?

নুসরাতের সহপাঠীদের কারো সঙ্গেই হয়তো অসভ্য লোকটা বাজে আচরণ করেছে, করেছে আরও অনেকের সঙ্গেই। কই, তাদের কারও নামও তো আমরা জানিনা, তারা বেঁচে আছে বহাল তবিয়তে। নুসরাত চলে গেল, কারণ সে চুপ থাকতে চায়নি, মেয়েটা প্রতিবাদ করেছিল। কি হতো, যদি সেদিন ছাদের ওপরে চাপের মুখে মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ার হুমকিটা মেনে নিতো নুসরাত? হয়তো কেরোসিন নিয়ে আসা হায়েনাগুলো ওর গায়ে আগুন দিতো না! কিন্ত নুসরাত অন্য ধাতুতে গড়া একজন ছিল, আর দশজন নির্যাতিতা নারীর মতো মুখ বুজে থাকাটাকে সে সমাধান হিসেবে ভাবেনি।

যৌন নিপীড়ক সিরাজ উদ দৌলা

নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হতো না, বিভৎস ক্ষত নিয়ে পাঁচটা দিন অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে হতো না তাকে, মরে যেতে হতো না এই অসময়ে, যদি সে মুখটা বন্ধ রাখতো, কিংবা মামলাটা তুলে নিতো। জেল থেকে বেরিয়ে ওই লম্পট অধ্যক্ষ হয়তো নতুন শিকারে নামতো, কিন্ত নুসরাত তো বেঁচে থাকতো! দোষ তো নুসরাতের, সে কেন ‘হুজুর’ পদবীধারী ওই অমানুষটার সাথে বেয়াদবি করলো? সিরাজ উদ দৌলা তো আগেও অনেকের সাথে লম্পট আচরণ করেছে, তাদের কেউ তো মরেনি, নুসরাত কেন মরলো? নিশ্চয়ই দোষ নুসরাতের!

টাঙ্গাইলের রূপার কথা মনে আছে? চলন্ত বাসের ভেতরে ধর্ষণ করা হয়েছিল মেয়েটাকে। তারপর ঘাড় মটকে হত্যা করে লাশ ফেলে পুঁতে রাখা হয়েছিল শালবনের রাস্তার পাশে। ধরা পড়ার পরে জবানবন্দীতে বাসের ড্রাইভার-হেল্পার জানিয়েছিল, লোকালয় দেখে বাসের জানালা দিয়ে মাথা বের করে সাহায্যের জন্যে চিৎকার করেছিল রূপা, আর সেকারণেই ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে খুন করেছিল অপরাধীরা। কে জানে, রূপা সেদিন চিৎকার না করে ধর্ষণটাকে মেনে নিলে হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেও পারতো! ধর্ষণ করাটা তো দোষ না, চিৎকার করাটাই দোষ! রূপার মৃত্যুর জন্যে আসলে সে নিজেই দায়ী ছিল!

এদেশে প্রতিবাদীর ভাত নেই, প্রতিবাদীরা নুসরাতের মতো বার্ন ইউনিটের বিছানায় শুয়ে কাতরায়, মৃত্যুর সাথে অসম এক লড়াই শেষে বরাবরের মতোই হেরে যায়। এখানে মুখ বুজে থাকলে বরং প্রাণে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা আছে, মুখ খুললেই গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেবে কেউ। যে দেশে ধর্ষক-নিপীড়কের মুক্তির জন্যে শত শত লোক ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করতে পারে, যে দেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় শত শত খুন আর ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত লোকেদের ‘ধর্মীয় নেতা’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়, যে দেশে ধর্ষণের বিচার পাবার জন্যে বছরের পর বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, সেদেশে প্রতিবাদী নুসরাতেরা এভাবেই মরে যায়, মরে যাওয়াটাই ওদের নিয়তি।

আমরা যদি দ্রুততম সময়ে ধর্ষকের বিচার করতে না পারি, তাহলে বরং নুসরাতদেরই বিচার করা যাক, কেন তারা মুখ খুললো, কেন তারা প্রতিবাদ করলো!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button