ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ফতোয়া জারিতে আরাম, হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া হারাম!

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একটা বিবৃতি দিয়েছেন। সেই বিবৃতির মূলভাষ্য হচ্ছে, কেন একজন মুসলমানের জন্যে পহেলা বৈশাখের উৎসব পালন করা হারাম। তার মতে, কোন মুসলমান মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পারে না। বিবৃতিতে সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের প্রসঙ্গও থাকবে বলে আশা করেছিলাম, লম্পট অধ্যক্ষের কামনার লক্ষ্যবস্তু হবার কারণে যে মেয়েটাকে নৃশংসতার শিকার হয়ে অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। আহমদ শফি যেহেতু বাংলার আপামর আলেম সমাজের নেতা, একজন আলেমরূপী জালেমের এই কর্মকাণ্ডকে তিনি কিভাবে দেখছেন, সেটা জানার ইচ্ছে ছিল।

বিবৃতিতে মুসলিম জনতার উদ্দেশে আল্লামা শফী আরও বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে যেভাবে অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ ও পাপাচার বেড়ে চলছে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের উচিত মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তার ইবাদাতে মগ্ন হওয়া। নিজেদের আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জনে চেষ্টা-সাধনা করা। কারণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পরিশুদ্ধতা ছাড়া শুধু মানবরচিত আইনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার গজব ও পাপাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না।

শাহ আহমদ শফি

বাংলা নতুন বর্ষ পালন আর মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে ফতোয়ার বাইরে তার বিবৃতিতে আর কিছুই পাওয়া গেল না। নুসরাত জাহার রাফীর গায়ে আগুন ধরিয়ে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, নুসরাত নিজে মাদ্রাসার ছাত্রী ছিলেন, তাকে যারা মেরেছে, তারাও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আর ছাত্র।

অথচ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে এখনও কোন বিবৃতি বা বক্তৃতা আসেনি, যৌন নিপিড়নকারী সেই অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত হেফাজতে ইসলাম বা ধর্মীয় সংগঠমগুলোর পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি, চাওয়া হয়নি নুসরাতের হত্যাকাণ্ডের বিচার। তারা বরং ব্যস্ত আছেন পহেলা বৈশাখে কি করা যাবে আর কি করা যাবে না সেসবের ফতোয়া জারী নিয়ে!

মঙ্গল শোভাযাত্রা

নারীদের তেঁতুল বলে অভিহিত করা আহমদ শফি অবশ্য এর আগেও মেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে একটা ফতোয়া দিয়েছিলেন, মেয়েদের ক্লাস ফাইভের বেশি পড়ালেখা করানো উচিত নয় বলে মন্তব্য ছিল তার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কিছুদিন আগে তিনি যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন তার চিকিৎসার জন্যে যে প্যানেল গঠণ করা হয়েছিল, সেখানে বেশ কয়েকজন নারী চিকিৎসকও ছিলেন। তাদের সেবা-শুশ্রূষাতে সুস্থ হয়ে উঠে তিনি আবার নারীদের ক্লাস ফাইভের বেশি না পড়ানোর অঙ্গীকার করিয়েছেন, ভাবতেই হাসি পায়।

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবীতে শাহবাগে তরুণদের জমায়েত হবার কিছুদিন পরেই আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলাম। নাস্তিক-ব্লগারেরা ইসলামবিরোধী লেখালেখির মাধ্যমে ইসলামকে অপমান করছে, এমন মনগড়া অভিযোগ তুলে তারা হাজার হাজার মানুষের জমায়েত করেছিল মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। অথচ হেফাজত যাদেরকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিল, তাদের অধিকাংশেরই ব্লগ বা ইন্টারনেট সম্পর্কেও বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না।

হাটহাজারীর কওমি মাদ্রাসাগুলো থেকে তখন ব্লগার কতলের ডাক দেয়া হতো নিয়মিতই। এরপরে একের পর এক ব্লগার খুন হয়েছে, কোন ঘটনারই বিচার হয়নি এখনও। জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় অনেক ব্লগার-অ্যাকটিভিস্টই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, অন্যদিকে জাঁকিয়ে বসেছে হেফাজত। একের পর এক দাবী তুলেই গেছে তারা, কখনও পাঠ্যবই পরিবর্তনের দাবী, কখনওবা স্থাপত্য বা ভাস্কর্য্য সরিয়ে নেয়ার দাবী তুলেছে। অথচ জনবান্ধব কোন কর্মসূচীতে তাদের কখনও দেখা যায়নি, এবারও যেমন নুসরাতের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবীতে দেখা পাওয়া গেল না হেফাজতের কারো।

যৌন নিপীড়ক সিরাজ উদ দৌলা

নুসরাতকে জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়া হলো, প্রতিবাদ করার অপরাধে মেয়েটা পাঁচদিন অসীম যন্ত্রণা ভোগ করার পরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো, অথচ দেশের শীর্ষস্থানীয় এই ধর্মীয় সংগঠনটি পুরো ঘটনায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, যেন এরকম কোন ঘটনা দেশে ঘটেইনি! কে জানে, হেফাজতের নেতারা হয়তো এখনও রেলওয়ে থেজে বরাদ্দ পাওয়া জমির ভাগাভাগিতে ব্যস্ত, তাই সময় বের করতে পারছেন না এই বিষয়ে কিছু বলার জন্যে!

হেফাজতের আমির পহেলা বৈশাখ, পান্তা ইলিশ কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিশাল বিবৃতি দিতে পারলেন, অথচ নুসরাতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটা লাইন উচ্চারণ করতে পারলেন না। দেশজুড়ে অনেক মাদ্রাসা-মক্তবে ধর্মের লেবাসধারী আলেমরা যে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে আছে, ছাত্র বলাৎকার কিংবা অপহরণের মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, সেসব নিয়ে কোন কথা বললেন না তিনি! তার বিবৃতিতে থেকে একটাবারের জন্যেও যদি লেখা দেখতাম যে, সোনাগাজীর সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা কোন আলেম নয়, সে একটা জালেম, তাহলেও আমরা মানতে পারতাম যে আহমদ শফী এবং তার হেফাজতে ইসলাম এই জঘণ্য কাজটার বিরুদ্ধাচরণ করছেন। কিন্ত সেরকম কোন নজির আমাদের চোখে পড়লো না।

ইসলাম যদি কোনদিন ধ্বংস হয়, তাহলে আমেরিকা-ইজরাইলের ষড়যন্ত্রে ধ্বংস হবে না। ইসলাম ধ্বংস হবে সেসব মানুষের জন্যে, যারা ইসলামের ধ্বজাধারী সেজে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল। ইসলাম ধ্বংস হবে সেই মানুষগুলোর জন্যে, যারা ইসলামী সংগঠনের নেতা হওয়া স্বত্ত্বেও এসব পাপাচার দেখে চুপ করে বসেছিল।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button