ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

নুরুকে আর কি কি উপাধি, উপমা দিয়ে অতিমানব বানানো হবে?

নুরুল হক নুরু মাত্র একবছরে নোবডি থেকে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন। নুরু কতদূর যাবেন সেটা সময় বলে দিবে। কিন্তু, এখনই নুরুকে যেভাবে অতিমানব বানানোর চেষ্টা করে হচ্ছে সেটা অনেকাংশে হাস্যকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল নাকি নুরুর মধ্যে তরুণ বয়সের বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখতে পেয়েছেন। নুরুর মধ্যে কেউ কেউ দেখতে পায় শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ছায়া। কেউ নুরুর মধ্যে দেখতে পায় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ নুর হোসেনের ছায়া।

নুরুকে একাধিক উপাধি দিয়ে তার সমর্থকরা ভাসাচ্ছেন। কেউ তাকে বলছেন ‘বঙ্গপ্রতাপ’। আবার ইদানিং জোরে শোরে প্রচারিত হতে দেখছি ছাত্রবন্ধু উপাধি। যুগান্তর পত্রিকাটি ইতিমধ্যে ছাত্রবন্ধু নুরুল হক বলে ডাকাডাকি, লেখালেখি শুরু করেছে। আরো কেউ কেউ একই কাজ করছে। দেখতে পাচ্ছি, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে একটি গাছের মধ্যে ঝুলানো হয়েছে ‘নুর চত্বর’ সাইনবোর্ড। এখানে নুরু মার খেয়েছেন, তাই গাছে ঝুলেছে নুরের নামে চত্বর সম্বলিত সাইনবোর্ড।

নুরুল হক নুরু

কেন এই মাতামাতি, কেন উপাধি উপমা দেয়ার হুড়োহুড়ি? নুরু আগামীদিনে আরো বড় পর্যায়ে নেতৃত্বে আসবে এই ধারণা করেই কি তার প্রতি আনুগত্য দেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হলো? ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে, ক্ষমতার মসনদে থাকা মানুষকে তোয়াজ করতে সবারই ভাল লাগে। নুরুকে কেন্দ্র করে এমনই একটি চক্র বোধহয় গড়ে উঠছে। এই চক্রটিকে বলি, এসব হাস্যকর কাজ থামান। কাউকে অতিমানব বানিয়ে দেয়ার এই প্রবণতা আমাদের দেশে আছে। কাউকে পীর বানিয়ে তাকে ঘিরে চক্র গড়ে তুলে মুরিদ হওয়ার অভ্যাস আমাদের আছে। এই অভ্যাস কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ইতিহাসে অনেক ত্যাগী নেতার জন্ম দিয়েছে। অনেকে বিপ্লবীর জন্ম দিয়েছে। এই প্রাঙ্গণে বেড়ে ওঠা অনেক তরুণ আত্মত্যাগ করেছেন দেশের স্বার্থে। আন্দোলনে নেমেছেন, মার খেয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন। সবার নামে ভাস্কর্য, চত্বর নিশ্চয়ই নেই৷ নুরুর আন্দোলনমুখী ক্যারিয়ার এক বছরও হয়নি। এখনি তার নামে আস্ত একটা চত্বর বানিয়ে ফেলতে হবে? এতটা অতি উৎসাহী হবার কারণ কি?

নুরুল হক নুরু

নুরুকে উপাধি দেয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি যখন পেয়েছেন তখন তার জীবন থেকে অনেকগুলো বছর হারিয়ে গেছে কেবল কারাবরণ করে। যখন তিনি এই উপাধি পান তার আগে তিনি পার করে এসেছেন বায়ান্ন, চুয়ান্ন, বাষট্টি, ছয়দফা। একটা উপাধি আসলে বলে দিলাম, হয়ে গেল এমন না। অর্জন করতে হবে সময়ের গর্ভে ইতিহাস জন্ম দিয়ে। এমন না এটা, মন চাইলো আর একটা স্ট্যাটাস দিয়ে উপাধি ঘোষণা দিয়ে দিলাম। নুরু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে স্ট্রাগল করে এই পর্যায়ে এসেছেন। একটা বৃহৎ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। মার খেয়েছেন। ঠিক আছে। কিন্তু, এখনি তাকে উপাধি দেওয়ার জন্যে প্রতিযোগিতা শুরু করতে হবে, উপমা দিয়ে তুলনা করতে হবে, সেই সময়টা কি এসেছে?

অধ্যাপক আসিফ নজরুল নুরুর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখতে পান বলে দাবি করেছেন। অধ্যাপক আসিফ নজরুল ইচ্ছাকৃতভাবে এই তুলনা সামনে এনে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে। নুরুর সাথে বঙ্গবন্ধুর তুলনা আনাটা অর্বাচীনের মতো মন্তব্য। একজন অধ্যাপকের মুখে এরকম শিশুসুলভ মন্তব্য মানায় না, এটা কোটা সংস্কারের ফেসবুক গ্রুপের কেউ পোষ্ট আকারে লিখলে না হয় মানা যেত। কারণ, এই গ্রুপ থেকে প্রায়ই হাস্যকর কিছু কথা উৎপাদন হয়। এই গ্রুপেও অন্ধ, ইতিহাস জ্ঞানহীন এক বিশাল সম্প্রদায় আছে যারা বুঝে হোক না বুঝে হোক অদ্ভুত তুলনা টানে এবং নিজেদেরকে মহিমান্বিত করে। তারা সাম্প্রতিক আন্দোলনকে তুলনা দিতে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধকে টেনে আনে। তারা সকাল বিকাল বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সাথে তুলনা করে নুরুকে। এগুলো দিয়ে আসলে কি প্রমাণ করার চেষ্টা করে তারা?

কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ হয়েছে গত বছরই। আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতারাই এবার অংশ নিয়েছেন ডাকসুতে। যদিও এই সিদ্ধান্তের আবার সমালোচনা করেছে ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ। বলেছে আন্দোলনের আবেগকে পুঁজি করে তারা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। ডাকসু নির্বাচন কে করবে, কে করবে না এটা নিশ্চয়ই কারো ঠিক করে দেওয়ার অধিকার নেই।

যে আন্দোলনটা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনও করতে পারত, কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার তারাও চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বেকার শিক্ষিতদের পালস ধরতে পারত, সেটা তারা করেনি। উলটা কোটা সংস্কারের নেতাদের বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে, বিভিন্ন সময় আক্রমণ করে, মার দিয়ে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের অতিউৎসাহী নেতাকর্মীরা। ব্লেম দিয়ে কাউকে থামানো যায় না আবার একই সাথে অতিমানব বানিয়ে, পীর বানিয়েও কাউকে টিকিয়ে রাখা যায় না। ডাকসু নির্বাচন এটাই প্রমাণ করেছে। ড্রামা বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকতে হবে। কাজ করতে পারলে অবস্থান থাকবে, নাহয় হারিয়ে যাবে। অতিমানব বানিয়ে, ‘সহমত ভাই’ স্টাইলে কোটা গ্রুপে তেলবাজি করে অবস্থান টিকিয়ে রাখা যায় না..

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button