ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

গেম অফ ‘প্রহসন’- তেলে জলে একাকার সবার মন!

ঘোষণা এসেছিল এ বছর এপ্রিলে মুক্তি পাবে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘গেম অফ থ্রোনস’ ফাইনাল সিজন। গেম অফ থ্রোনস নিয়ে আগ্রহের সীমা নাই। মুক্তি পাবে বৈশাখে। শেষ সিজনের ঝড় দেখবার প্রত্যাশায় আকুল অনেকে। কিন্তু, বাংলাদেশেই বাস্তবধর্মী একটা সিরিয়াল প্রযোজিত হয়ে গেল ডাকসু নির্বাচনের নামে।

ডাকসু এমন ক্ষমতার মন্ত্র যে মন্ত্রের তান্ত্রিক হওয়ার জন্য সবগুলো ছাত্রসংগঠন মাঠে নেমে গিয়েছিল। গতকাল নির্বাচনের দিন দিনভর এই গেমের কত নাটকীয় মোড় দেখেছি আমরা। নির্বাচনে অস্বচ্ছতার কারনে মেয়েদের একাধিক হলে প্রতিবাদ হয়েছে। ছেলেদের হলগুলো ভোট সেন্সরশীপের ঘটনা ঘটেছে। ভুয়া লাইন দাঁড় করিয়ে ভোটের গতি ধীর করে দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। অনাবাসিক ছাত্রদের অনেকেই ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন।

এরকম অবস্থায়, ছাত্রলীগ বাদে সব কয়টি ছাত্রসংগঠন প্রহসনের নির্বাচন আখ্যা দিয়ে নির্বাচনকে বর্জন করেছে ভোট গ্রহণ শেষ হবার এক ঘন্টা আগে। ছাত্রলীগ এই নির্বাচন বাতিলের দাবিকে হাস্যকর বলেছে মিডিয়ায়। রাত পর্যন্ত সবাই নিশ্চিত নিরঙ্কুশ আধিপত্যে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা ওভার কনফিডেন্স দেখিয়ে ফলাফল ঘোষণার আগেই কেন্দ্রীয় সংসদে তাদের প্যানেলের প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে নৈতিক রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করা শুরু করে দিয়েছিল।

হল সংসদের ফলাফল দ্রুতই ঘোষণা হলেও কেন্দ্রীয় সংসদের ফল ঘোষণার অপেক্ষায় মধ্যরাত নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাত সাড়ে তিনটায় ফল শুনে হতভম্ব ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় সংসদের শীর্ষ পদে জয়ী হয়েছে নুরুল হক নুরু। তারা সাময়িক ভুয়া ভুয়া বললেও কিছুক্ষণ পর অন্যান্য পদে যখন ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে প্রার্থীরা জিতেছে শুনেন, তখন তারা উল্লাস প্রকাশ করেন। করতালি দিয়ে স্বাগত জানান।

কিন্তু, সারাদিন ‘নির্বাচন সুষ্ঠু’ এই প্রচারণায় থাকা ছাত্রলীগ হুট করে দাবি করে ভিপি পদে তারা নতুন করে নির্বাচন চায়। নুরুকে মানে না তারা। এর মধ্যেই ছাত্রলীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, অনলাইন এক্টিভিস্ট, সবজান্তা সমশের আলীরা নুরুকে শিবির বলে ট্যাগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভোট সেন্স নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। ১১ হাজার ছাত্র কেন নুরুকে ভোট দিলো, কেন নুরুর জনপ্রিয়তা বাড়লো এটা বিশ্লেষণ না করে তারা এই ভোটারদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাদের সহজ একটি সূত্র আছে। নিজেদের বাইরে যে কাউকে তারা যুক্তি দিয়ে কথা বলার চাইতে শিবির, ছাগু ট্যাগ দিয়ে শান্তির ডাক দেন। কিন্তু তাদের অবিবেচকের মতো এসব ট্যাগ আদতে নুরুদেরই জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করছে।

এই ট্যাগবাজ ও তেলবাজরা আওয়ামীলীগের নিবেদিতপ্রাণ মনে করে নিজেদের, কাউকে ট্যাগ দেয়াকে ঈমানী দায়িত্ব মনে করে, এরা জানে না এরাই অবচেতনভাবে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা হ্রাসে সবচেয়ে বেশি দায়ী। এরা কিসের লোভে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগকে হাসির পাত্র করে তুলছে এরা কি নিজেরা জানে? কেউ ভিন্নমত দিলেই এরা যেভাবে অন্ধের মতো তাকে ডিফেন্ড করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাতে সরকারের প্রতি মানুষের মন আরো বিষিয়ে যাওয়ার বীজ এরাই বুনে দেয়। এদেরকে কেন পালা হয় কে জানে! এদের কারণে নুরুরা যখন কোটা গ্রুপে সরকার বিরোধী কথা বলে সেটা মানুষ লুফে নেয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটাক্ষ হয় তাতে মানুষ আমোদ পায়। এই কটাক্ষের সুযোগ এই অন্ধ এক্টিভিস্টরাই করে দিচ্ছে। অন্ধ দলকানা যারা নুরুদের আক্রমণ করে তারাই উশকে দিচ্ছে মানুষকে। মানুষের কাছে নুরুরা তাই হয়ে যায় ‘নির্যাতিত নেতা’। আর সরকার, আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের ইমেজ দাঁড়ায় নির্যাতনকারী হিসেবে। এই অতি উৎসাহী এক্টিভিস্টদের ব্যাপারে ভাবার সময় এসেছে।

এত কিছু করে লাভ কি হলো! শেষবেলায় এসে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন জড়িয়ে ধরলেন নুরুকে। যাকে এতক্ষণ শিবির বলা হচ্ছে, বলা হচ্ছে ভিপি নুরুকে তারা মানবেন না, সেই ‘শিবির’ নুরুকে জড়িয়ে শোভন বললেন তারা একসাথে কাজ করবেন, সহযোগিতা করবেন একে অপরকে। নিশ্চয়ই এখন আবার দলকানা অন্ধদের কথা বদলে যাবে, স্ট্যাটাস বদলে যাবে। বলবেন বৃহত্তর স্বার্থে তারা ত্যাগ করেছেন। কিন্তু, স্বার্থ কত বৃহত্তর হলে ‘শিবির’কে জড়ানো লাগে? এখন যে নিজের আঙ্গুল গলায় ঢুকিয়ে নিজের আগের কথাগুলোকে বমি করে বের করতে হবে, নতুন করে সহমত ভাইগিরি করতে হবে, নতুন লজিকে এই সিদ্ধান্তকে ডিফেন্ড করতে হবে সেটা খুব সুন্দর হবে? খুব বিশ্বাসযোগ্য হবে, তাই না?

ত্যাগ যদি আসলে কেউ করেই থাকেন, তাহলে শোভনের সেই ক্রেডিট প্রাপ্য। এত কিছুর পরেও নিজের হারকে এভাবে সরলভাবে মেনে নেয়া, কর্মীদের শান্ত হবার আহ্বান এসব অনেক বড় ম্যাচুরিটির প্রমাণ। শোভনের যে ‘জনপ্রিয়তা’র ঘাটতি ছিল বলে তিনি ভিপি হননি অনেকের মতে, আজকের কাজের মধ্য দিয়ে সেই জনপ্রিয়তা তিনি অর্জন করলেন। এতে করে তার গ্রহণযোগ্যতা কমেনি একটুও, তিনি হারেননি, তিনিই জিতেছেন। তার এই ছোট্ট একটা স্টেপে নুরুও শান্ত হলো। নুরু বললো, শোভন তার হলের বড় ভাই। শোভনের উদারতায় সে খুশি৷ হাওয়া বদলে গেল শোভনের পক্ষে। এই হাওয়া পুরোটাই ছাত্রলীগের পক্ষেই থাকত। যদি ছাত্রলীগের মধ্যে ভাইলীগ না থাকত। ছাত্রলীগ পুরোটা হতো ছাত্রদের লীগ৷ ছাত্রলীগ প্যানেল দেওয়ার একদিন পর বিদ্রোহী প্যানেল দেয়া হয় ছাত্রলীগের। নিজেদের এই কোন্দল, নিজেদের ভাইপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি, এলাকাপ্রীতি এসবের বাইরে ছাত্রলীগ থাকলে দৃশ্যগুলো অন্যরকম হতো।

ছাত্রলীগের কিছু অনলাইন এক্টিভিস্ট আবার এটাও প্রশ্ন তুলেছেন ছাত্রলীগকে ভোট না দিলে কেন শিক্ষার্থীরা প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীদের ভোট দেয়নি। তাদের এই প্রশ্নও কতটা হাস্যকর তারা জানেন না। কারণ, বামদলগুলোকেও তারা ডিফেম করে আস্ত রাখেননি। ব্যক্তি আক্রমণও কম হয়নি। এক লিটন নন্দীকে নিয়ে কত গল্প তারা বানিয়েছেন। লিটন নন্দী ন্যুড ছবি মেয়েদের দিয়ে বেড়ান বলে তার চরিত্রহননের চেষ্টাও করা হয়েছে। তথাকথিত এক্টিভিস্টরা কি বলেন, কি চান তারাও জানেন না। তাদের মেকি গল্পকে প্রতিষ্ঠা করতে তাদের যা করার দরকার তারা সেটাই করেন। অন্য সব দল বাদ, খোদ ছাত্রলীগ যখন ছাত্রলীগের নামে গুজব ছড়ায়, সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় কিভাবে!

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি হবার আগে হট ক্যান্ডিডেট হিসেবে প্রচার পাওয়া গোলাম রাব্বানী, শোভন, আদিত্য নন্দী, সাদ্দাম এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তখনকার অন্ধ, ছাগু এক্টিভিস্টরা প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়েছে। এই ক্যান্ডিডেটরা বিবাহিত, এদের পরিবার জামাত শিবিরের সাথে জড়িত, এদের কেউ কেউ মাদকের সাথে জড়িত এমন প্রোপাগাণ্ডা পর্যন্ত ছড়ানো হয় যেন এরা নেতৃত্বে আসতে না পারে। এই অন্ধদের চেহারা পালটায়, এই গোড়া এক্টিভিস্টদের রুপ বদলায় কিন্তু এদের চরিত্র একরকম। এদের পক্ষের লোক ছাড়া ভিন্নমতের কাউকে এরা সহ্য করতে পারে না। ভিন্ন মত হলেই এরা জামাত শিবির বলে চালিয়ে দিতে চায়।

শোভনের আজকের ত্যাগ এসব ‘গুটি খেলা’ এক্টিভিস্টদের প্রতিই সবচেয়ে বড় প্রহসন হয়ে থাকলো। শোভন শিখিয়ে দিলেন আগুন উশকে না দিয়ে আগুন কিভাবে নিভাতে হয়। হেরে যাওয়া পরাজয় নয়, এটাও তিনি জানিয়ে গেলেন তার উদারতা দিয়ে। একটা অচল অবস্থার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাওয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হলো, সেটাই যেন শান্ত হওয়ার পথে ধাবিত হলো শোভনের একটা ছোট্ট পদক্ষেপে। এই দ্বন্দ্ব বাড়লে অনেকে এটাকে বিশাল করার জন্য ওঁত পেতে আছে সেটা কে না জানে। শোভনই পুরো ব্যাপারটাকে শোভনীয় করলেন তিনি শেষ পর্যন্ত! 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button