সিনেমা হলের গলি

‘প্রতিটা মুহূর্তে ওর উপস্থিতি অনুভব করি আমি’

“হিথের সঙ্গে আমি কথা বলছিলাম ‘ব্যাটম্যান বিগিনস’ এ অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে। হিথ আমাকে বললো, ও ব্যাটম্যান ঘরানার সিনেমায় কাজ করতে আগ্রহী নয়। খুব ভদ্রভাবেই আমাকে না বলেছিল ও, অসাধারণ একজন মানুষ ছিল সে। আমি বললাম, দেখো, আমি বোধহয় তোমাকে কনভিন্স করতে পারছি না। তবে আমার ধারণা আমরা দুজনে একত্রে কাজ করলে দারুণ কিছুই হবে সেটা। ও ব্যাটম্যান বিগিনস দেখলো, হয়তো খানিকটা বুঝতে পেরেছিল আমি কি করতে চাইছি। জোকারের রোলের জন্যে রাজী হলো সে, আমাকে নিজে থেকেই বললো জোকার ফিরলে সে এই চরিত্রে অভিনয় করতে চায়। জোকারের চরিত্রটি হিথকে দিয়েছিলাম ডার্ক নাইটের কোন স্ক্রিনপ্লে লেখার আগেই। আর সেও নিজের মত করে ব্যাপারটায় মানিয়ে নিয়েছিল বেশ। একদিন ওকে ফোন দিলাম, ‘আর ইউ প্রিপেয়ার্ড’? জবাব এলো- ‘আই এম অবসেসড!’ সত্যি বলতে, মানুষ হিসেবে ও আমাকে বেশ পছন্দই করতো বোধহয়!”

“আমি জানতাম না তাঁর আগ্রহটা সিনেমার প্রতি ছিল, নাকি আমার চাপাচাপিতেই রাজী হয়েছিল। আমি ওর সঙ্গে নিয়মিত দেখা করছিলাম, ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হচ্ছিল দুজনের। ওর মাথায় ‘জোকার’কে নিয়ে কি পরিকল্পনা আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমি। ওর ভাবনায় যাই থাকুক, সেটাকে আমি সম্মান জানাবো এরকমটা ঠিক করে রেখেছিলাম। হিথের চিন্তাভাবনার ওপর আমার ভরসা শুরু থেকেই ছিল, কেন সেটা জানি না আমি। ওর অভ্যাস ছিল চরিত্রের ভেতর ডুব দেয়া, দিন দুনিয়া ভুলে গিয়ে সেই ক্যারেক্টারে হারিয়ে যাওয়া। এজন্যে কাজও বেশী করতে চাইতো না হিথ। একটা চরিত্র থেকে উঠে আসার জন্যেও ওর পর্যাপ্ত সময় লাগতো। আমাকে বলতো, মনে রাখার মতো একটা চরিত্রের জন্যে ও খুব ক্ষুধার্ত, ও এমন কিছু করার জন্যে প্রস্ততি নিচ্ছিলো, যেটা কেউ আগে করেনি, পরেও কখনও করতে পারবে না। কিন্ত সেটা ও ছাড়া আর কেউ তখন জানতোও না!”

“এখন আমি এটা ভেবে গর্ববোধ করি যে এমন অসাধারণ একটি চরিত্রকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার পেছনে সামান্য হলেও আমার অবদান আছে, হিথের অসাধারণ সেই কাজের প্রত্যক্ষ্য সাক্ষী আমি। এই কাজের কৃতিত্বের সিংহভাগ অনেকেই আমাকে দেয়, আমি খুব বিব্রতবোধ করি। হিথ ছিল ওয়ান ম্যান আর্মি, জোকারের আজকের অবস্থানের জন্যে কৃতিত্বটা শুধু ওরই প্রাপ্য। আমরা দুজনে প্রচুর কথা বলতাম, ওর মাথার চাপটাকে খানিকটা কমানো যায় কিনা সেই চেষ্টা করে দেখতাম মাঝেমধ্যে। কিন্ত ও নিজেই ছিল এই ব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ন। আমাদের বুঝতে দিতো না যে দুটো ভিন্নধর্মী স্বত্ত্বাকে ধারণ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও। এই দারুণ জার্নিটার একটা অংশ হতে পেরেছি আমি, এটাই বিশাল প্রাপ্তি।”

“আইম্যাক্স ক্যামেরায় আমাদের শুটিং করার কথা, প্রথম সিকোয়েন্সে হিথ মুখোশ পরে অভিনয় করবে। আমি ভাবলাম এটা ওকে সাহস যোগাবে, যেহেতু চেহারার ভাবটা প্রকাশ করতে হচ্ছে না শুরুতেই। কিন্ত ও যখন মুখোশটা খুললো, আমি একদম ভড়কে গিয়েছিলাম! আমি জানি এখানে শুটিং চলছে, সব আমার চেনাজানা মানুষজন, তবুও হিথকে দেখে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল যে রক্তমাংসের জোকার বোধহয় অন্য কোন দুনিয়া থেকে আমাদের সেটে উঠে এসেছে! আমি ক্যামেরা অফ করার কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম, কখন যে ক্যামেরার ফোকাস নড়ে গেছে সেটা খেয়ালই হয়নি। তাই আমি আবার সেটা রিশ্যুট করার কথা ভাবলাম। হিথ আমাকে ফোন করলো, সেই রক্ত শীতল করা জোকারের মতো ফ্যাসফ্যাসে গলায় জানতে চাইলো আমি এটা আবার শুট করতে চাই কিনা। আমি মুখে না না বলছিলাম, কিন্ত হিথের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় হার আবশ্যক। ও আবার শুটিং করে দিলো সেই দৃশ্যটা। হিথ অসাধারণ মানের প্রফেশনাল, রিশুটটাও দারুণ হয়েছিল, কিন্ত সিনেমায় আমি সেই ফোকাস নড়ে যাওয়া দৃশ্যটাই রেখেছিলাম। কারণ সেটার কোন তুলনা হয় না, জাস্ট ম্যাজিকাল!”

“শিকাগোর রাস্তায় ভরা ট্রাফিকের মধ্যে রাতের বেলা আমরা কাজ করতাম, সঙ্গে থাকতো ক্যামেরা আর প্রোডাকশনের টিম, গাড়ি, স্ট্যান্টম্যান। আর থাকতো হিথ। ওর কাজ ছিল না কোন, আমি বলতাম তুমি বোর হবে, রেস্ট নাও বরং। ও হাসতো। আমার সঙ্গে ক্যামেরার কারে বসতো ও, নিজের ল্যাপটপটা নিয়ে আসতো সঙ্গে করে, ওর অংশের শুটিংগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতো, ভুল খুঁজে বের করতো। ডার্ক নাইটের কিছু অংশে ডিরেক্টর্স চেয়ারে হিথই ছিল আমার জায়গায়। ওর পাশে বসে থেকে আমার মনে হতো, এত অল্প বয়সে এই মানুষটার সঙ্গে থেকে থেকে আমার মনের বয়স শত বছর বেড়ে যাচ্ছে!”

“আমার জীবনের বড় একটা আফসোস, সিনেমাটা আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে পারলাম না। আনকাট ভার্সনগুলো আমরা একত্রে বসেই দেখেছি, কিন্ত এডিটোরিয়াল প্রিন্ট আসার আগেই ও চলে গেল। আমাদের চেষ্টা ছিল, ও যে অমানুষিক পরিশ্রমটা করেছে এই চরিত্রের জন্যে, সেটাকে সর্বোচ্চ সম্মানটা যাতে জানানো যায়। ওর চলে যাওয়াটা মেনে নেয়ার মতো ছিল না। ওর পরিবারের জন্যে তো নয়ই, আমাদের জন্যেও না। আমি নিজেই অনেকটা সময় ট্রমার মধ্যে পার করেছি। ওর সাথে কাজ করতে পেরে আমি অবশ্যই গর্বিত, নিজেকে ভাগ্যবান ভাবি। কিন্ত অকালে ওকে হারিয়ে ফেলাটা এর চাইতে অনেক বেশী পীড়া দেয় আমাকে।”

“শুটিং এর সময়টায় আসলে পুরোপুরি বোঝা যায়নি, এডিটিংয়ের কাজ যখন শুরু হলো, তখন খানিকটা বুঝলাম হিথ কি অসাধারণ কাজটা করে ফেলেছে! সিনেমায় নায়ককে দেখার জন্যে মানুষ আসে, এই লোক যেটা করেছে, নায়ককেই এখন দর্শকের কাছে পানসে লাগবে! এডিটিং রুমে ওর পেছনে বসে আমি দৃশ্যগুলো দেখতাম, তারচাইতে বেশী দেখতাম নিজের অভিনীত কোন একটা দৃশ্যে সন্তুষ্ট হয়ে ওর মাথা ঝাঁকানো। এই দৃশ্যটা আমার জীবনের বিশাল এক প্রাপ্তি। আমি জানি বাস্তবে এমন কিছু হয় না, কিন্ত এখনও আমি এডিটিং রুমে হিথকে দেখতে পাই, ওর মাথা ঝাঁকানোটা আমার চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ে যেন… প্রতিটা মুহূর্ত ওর উপস্থিতি অনুভব করি আমি।”

সিনেমার পর্দায় সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিলেন, ‘দ্যা ডার্ক নাইট’ এর জোকার হিথ লেজারকে নিয়ে বলছিলেন সিনেমার পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান। ডার্ক নাইটের পর ইনসেপশন, ডার্ক নাইট রাইজেস, ইন্টাস্ট্রেলার আর সবশেষ ডানকার্ক দিয়ে যিনি জিতে নিয়েছেন দর্শক সমালোচকদের মন। তাঁর স্পর্শে বক্স অফিস ফুলেফেঁপে ওঠে, তাঁর ছোঁয়ায় সিনেমার গল্পেরা অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার করে রঙ্গিন পর্দায়।

তবুও কোথাও যেন খানিকটা বিষাদের সুর বাজে। জোকার রূপী হিথ লেজারকে ছাড়া ক্যামেরার পেছনে এক অদ্ভুত মুগ্ধতার আবেশ ছড়ানো মানুষটাকে কেন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। দুর্ভাগ্য আমাদের, অসাধারণ একটা জুটি থেমে গিয়েছিল অকালে, হিথের বিদায়ে… ভিন্নধর্মী দুজন মানুষকে এক সুতোয় বেধেছিল সিনেমা, ক্যামেরার সামনে আর পেছনের দুটো মানুষ হয়েছিলেন বন্ধু, অসাধারণ একটা জুটি। হিথ লেজার চলে গেছেন অজানা এক অভিমানে, নোলান বেঁচে আছেন বন্ধুর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে। নিজের মেধা আর মননশীলতায় একের পর এক উপহার দিয়ে চলেছেন দারুণ সব সিনেমা। 

তথ্যসূত্র- 

  1. https://moviepilot.com/posts/2423637
  2. uproxx.com
  3. http://www.telegraph.co.uk/films/2016/04/14/in-2006-nobody-wanted-heath-ledger-to-play-the-joker/
  4. ইউটিউবে ক্রিস্টোফার নোলানের সাক্ষাৎকার।
Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button