সিনেমা হলের গলি

নোবেল এবার কাঁদিয়েই ছাড়লেন!

আচ্ছা জেমসের কোন গানটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়? একটু ভাবনা চিন্তার মধ্যে পড়ে যেতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে। কারণ, জেমস এত মারাত্মক সুন্দর কিছু গান আমাদের উপহার দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট করে একটা প্রিয় গানের কথা বলা খুবই কঠিন। আমাদের প্লেলিস্টজুড়েই ছড়িয়ে থাকে জেমসের অসংখ্য গান। তবুও, কিছু গান থাকে যা বারবার আবেগ ছুঁয়ে যায়। বিশেষ করে, যারা পরিবার থেকে দূরে আছেন, কিংবা সদ্য যারা বাবা কিংবা মাকে হারিয়েছেন, যাদের বাবা-মা দূরদেশের অনন্ত সীমাহীন যাত্রায় হারিয়ে গেছেন তারা জেমসের বাবা এবং মা শিরোনামের দুটি গান শুনলে আবেগ ধরে রাখতে পারেন না। বরাবরই খেয়াল করে করেছি, এই দুইটা গান শুনলে বাবা-মাকে মিস করতে করতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অনেকেই৷

আর জেমসের এই দুটি গানের মধ্যে ‘বাবা’ গানটি দিয়ে তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী মাইনুল আহসান নোবেল গান গাইতে শুরু করেছিলেন কলকাতার জি বাংলা চ্যানেলের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো সারেগামাপার আয়োজনে। নোবেলের সেই যে শুরু, তারপর শুধু তিনি আবেগের বিভিন্ন স্তরকে ছুঁয়েই গেছেন। একবার রক গান করেন তো একবার রবীন্দ্রনাথ, একবার গেয়ে শোনান সুফি গান, করেছেন কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কারার ঐ লৌহ কপাটও! এই যে ইমোশনাল একটা রোলার কস্টারে তিনি শ্রোতাদের চড়িয়ে বসিয়েছেন, তাতে এখন নোবেলের পারফরমেন্সের দিন ভাবনা জাগে আজকে আবার কি ঘটিয়ে ফেলেন তিনি।

সারেগামাপার একটা বিশেষ দিক লক্ষনীয় যে, এখানে প্রতিটা গানের জন্য আলাদা একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। পুরো মঞ্চের লাইটিং, সহশিল্পীদের কণ্ঠ, মিউজিশিয়ানদের দক্ষতা সব মিলিয়ে দারুণ একটা পরিবেশ তৈরি হয়। আর তার মাঝখানে নোবেল চোখ বন্ধ করে ডুবে যান গানের ভুবনে। গানটাকে প্রতিটি বিটে, প্রতিটি শব্দে তিনি অনুভব করেন এমনই মনে হতে থাকে। তার গান শুনাটা এখন খুব এক্সাইটিং একটা ব্যাপার। তিনি একটা প্রতিযোগিতায় আছেন, এরকম কিছু আর মনেই হয় না। নোবেল যেরকমভাবে গেয়ে চলেছেন, তাতে তিনি নিজেকে একটা স্পেশাল জায়গায় নিয়ে গেছেন যা কিনা পুরষ্কার, প্রতিযোগিতা এসবের উর্ধ্বে।

মাইনুল হাসান নোবেল, Mainul Ahsan Noble, সারেগামাপা, নেক্সটটিউবার, সংগীত শিল্পী, Noble Man, Next Tuber

সেরকমই আরো একবার নোবেল সারেগামাপার মঞ্চকে কাঁপিয়ে দিলেন। শুধু কাঁপানো নয়, এবার তার গান শুনে কান্না আটকে রাখতে পারেননি উপস্থাপক যীশু সেনগুপ্ত। অশ্রুসজল হয়েছে বিচারক মোনালী ঠাকুরের। আর গানটা ছিল জেমসের। যার বাবা গান দিয়ে সারেগামাপায় নিজের জাত চিনিয়েছিলেন নোবেল, সেই জেমসের মা গান গেয়ে এবার সবাইকে কাঁদিয়ে ছাড়লেন তিনি। এই গানের প্রভাবেই সারেগামাপার মঞ্চে তীব্র আবেগের সৃষ্টি হলো।

এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক যীশু এমনিতেই নোবেলকে বেশ পছন্দই করেন। নোবেলকে অনেক আগেই রকস্টার বলে ডাকা শুরু করেছেন তিনি। নোবেলকে এই পর্বে মঞ্চে ডাকবার পর দুইজনই হাসিমুখে দুইজনকে জড়িয়ে ধরলেন। উপস্থাপক যীশুর মুখে বেশ উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু, কে জানত এই গান শুরু হওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই যীশু সেনগুপ্তর চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রুধারা নেমে আসবে!

নোবেলের সাথে মঞ্চে ছিলেন গৌতম হালদার। ভারতের নাট্যজগতের একজন কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব তিনি। মিউজিক শুরু হলো, তখনো বোঝা যাচ্ছে না নোবেল কি গান গাইবেন আজ। কিন্তু একি! মিহি কণ্ঠে গৌতম হালদার শুরু করলেন আবৃত্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা মাকে নিয়ে কবিতা “মাকে আমার পড়ে না মনে” আবৃত্তি করলেন। অন্যদিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে অল্প করে ভেসে আসছে জেমসের মা গানটি। গৌতম হালদার আবৃত্তি করছেন,

মাইনুল হাসান নোবেল, Mainul Ahsan Noble, সারেগামাপা, নেক্সটটিউবার, সংগীত শিল্পী, Noble Man, Next Tuber

“মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে
একটা কি সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত আমার দোলনা ঠেলে ঠেলে-
মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে..”

এই আবৃত্তির পরই নোবেল গাইতে শুরু করলেন, মিউজিকের শব্দ বেড়ে গেল। নোবেল গলা চড়িয়ে গাইতে শুরু করলেন,

“দশ মাস দশ দিন ধরে গর্ভে ধারণ,
কষ্টের তীব্রতায় করেছে আমায় লালন,
হটাত কোথায় না বলে হারিয়ে গেলো
জন্মান্তরের বাধন কোথা হারালো?

সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে,
খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে,
রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস?
কোথায় আছে কেমন আছে মা?
ভোরের তারা রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস…
অনেক কেঁদেছি, আর কাঁদতে পারি না…”

আবৃত্তির পর মিউজিকের সাথে নোবেলের গলায় গানটা শুনেই ধাক্কা লাগলো। মা’কে নিয়ে জেমসের এই গানটার এমনিতেই আলাদা একটি আবেগ আছে। যে আবেগটা সবারই ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। টেলিভিশনের সামনে যারা ছিলেন তারাও অবাক হয়ে খেয়াল করছিলেন, নোবেলের কণ্ঠে দারুণভাবে মানিয়ে গেছে গানটা। হয়ত, আবৃত্তি আর গানের কম্বিনেশনে সবাই সবার মায়ের কথা স্মরণ করছেন, মস্তিষ্কে মায়ের ছবিটা এসে যাচ্ছে বার বার। উপস্থাপক যীশু সেনগুপ্তর চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে। তিনি চোখ বারবার মুছছেন। মুখের অভিব্যাক্তি একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে, এই মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গান শুনছেন বটে, তবে মনে মনে তিনি এখন বহুদূরে, যেখানে শুধু মায়ের কথাই আছে, আর কিছু নেই। আর কিছু নয়।

নোবেলের কণ্ঠে মা গানের প্রথম আট লাইনের পর আবার গৌতম হালদারের আবৃত্তি। তিনি যেন এবার আবেগের পারদ আরো চড়িয়ে দিলেন। গলায় আটকে যাওয়া কান্না কিংবা হাসি কিংবা মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের সাথে মিশে থাকা দুঃখ সব যেন একসাথে মিলেমিশে অদ্ভুত হৃদয় ছোঁয়া আবৃত্তি! পুরোটা পারফরমেন্সজুড়ে নোবেল এবং গৌতম হালদার যা করলেন, খুব কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও একটু হলেও থমকে যেতে হবে।

গানের মাঝখানে যীশুর কান্না থামছেই না দেখে বিচারক শান্তনু উঠে যীশুর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাকি গান শুনলেন। মোনালী ঠাকুরের চোখের কোনায়ও জল। গান শেষে তিনি তো স্ট্যান্ডিং ওভেশনও দিলেন। তবে, এই প্রাপ্তিটা এখন আর নোবেলের পারফরমেন্সকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করে না। শান্তনু যেমন বললেন, গান নিয়ে তার কিছু বলার নেই একদমই। নোবেল এবং গৌতম হালদার যে এম্বিয়েন্সটা তৈরি করলেন, যে আবেগের জন্ম হলো, সবাই ফিরে গেল স্মৃতির দুয়ারে, সবার একটা ছবি ভেসে উঠলো সামনে, তখন গান ছাপিয়ে যে মাকে মনে পড়ে এবং মনে হয় যে মাকে একটা ফোন করা দরকার। হয়ত অনেকের জন্য সেটাও আর সম্ভব না। কিন্তু, ব্যাক্তিগত স্মৃতি যা নিয়ে হয়ত কথা বলার সু্যোগ হয় না, সেটাই হলো নোবেলের আর্টিস্টিক পারফরমেন্সের কারণে।

বাকি বিচারকরাও এদিন বোধহয় নিজস্ব স্মৃতিকাতরতায় মোহগ্রস্ত হলেন এই পারফরমেন্সের পর। তাদের কাছে মনে হলো, গান না আসলে একটা অনুভূতির তৈরি হয়েছে এখানে। তারা যেন চোখের সামনে একটা ফিল্ম দেখলেন। নোবেলের গানের সাথে সবাই নিজের স্মৃতিকে কানেক্ট করতে পেরেছে। এর চেয়ে ইউনিক কি হতে পারে!

রবীন্দ্রনাথের কবিতার সাথে আমাদের নগরবাউল জেমসের গান মিলে এমন কিছু তৈরি হবে সেটা কখনো কল্পনা করেনি কেউ। সারেগামাপার মঞ্চের এই পারফরমেন্স নিয়েও হয়ত কারো কারো প্রশ্ন থাকতেই পারে, কেন রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে ব্যবহার করা হলো, কেন গানের মাঝখানে আবৃত্তি আনা হলো, কিন্তু এই এক্সপিরিমেন্টের মাধ্যমে যে নতুন কিছু দেখার সুযোগ হলো, যে আবেগতাড়িত নিখাদ অনুভূতির জন্ম হলো তাকে অস্বীকার করা যাবে না। আর নোবেল দিন দিন যে ক্ষুরদার পারফরমেন্স দিচ্ছেন, তাতে মুগ্ধতার সীমা ছাড়িয়ে এখন বিস্মিতই হতে হয়! নোবেলের এমন ম্যাজিক্যাল পারফরমেন্স চলতে থাকুক, গানের পাশাপাশি অদ্ভুত অনুভূতির এই ভ্রমণও শেষ না হোক!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button