মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

গাঁজা, জনৈক পিতা এবং প্রবাবিলিটির ম্যাজিক!

এক অসহায় পিতা বাসায় গাঁজা কিনে এনেছেন। তিনটা বিড়িতে গাঁজার টুকরো ভরে ডাইনিং টেবিলে ছেলেকে ডেকেছেন৷ তিনটাতে আগুন লাগিয়ে একটা স্ত্রীকে দিয়েছেন, একটা নিজে নিয়েছেন, আরেকটা ছেলেকে দিয়ে বললেন, ”আজ থেকে আমরা ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনারের পর একসাথে গাঁজা খাবো। কেউ দেখলো না, কেউ অপমানও করল না।” যুবকের মা গাঁজায় টান দিলেন। ধোঁয়ায় কয়েকবার কাশি দিলেন, আবার গাঁজায় টান দিলেন। নাড়িভুড়ি উলটে গেল তাঁর। ছেলে চোখ বড় বড় করে দেখছে, ছেলের মা মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন৷ ছেলের বাবা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছেন, মেঝেতে পড়ে থাকা স্ত্রীর দিকে ভ্রুক্ষেপই করলেন না। স্বাভাবিক চিত্তে হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে গাঁজায় টান দিলেন, বেশ স্বাভাবিক টান। আবার টান দিলেন। ছেলের চোখ কোটরের বাইরে, হচ্ছেটা কী?

-বাবা!
-বলো বাবা।
-তুমি কী-ইইইইই?
-মানে?
-মা এভাবে পড়ে গেল খেয়াল করছ না?
-কেন করব?
-তোমার তো স্ত্রী!
-তোমার তো মা।
-মানে?
-তুমি তোমার মাকে নিয়ে চিন্তিত?
-হ্যাঁ।
-তোমার মা তোমাকে নিয়ে চিন্তিত। তুমি বাইরে গাঁজা খাও। সে সারারাত ঘুমুতে পারে না, কান্নাকাটি করে। এই কান্না তুমি না দেখলেও আমি দেখি। প্রতিদিন আমার স্ত্রী চোখে জল নিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
ছেলে নিশ্চুপ।
-তোমার মা তোমার পেট থেকে বের হয়নি, তোমার মার পেট থেকে তুমি জন্মেছ; তাই তার যন্ত্রণা তুমি বোঝো না। চিন্তা কোরো না, গাঁজার এক ধাক্কায় কিছু হবে না।

ঘটনার এখানে সমাপ্তি নয়। বাহুল্যতা বর্জনের জন্য গল্প থামিয়ে দেওয়া হল। এমন পরিস্থিতির পর কী ঘটতে পারে? প্রবাবিলিটি (সম্ভাব্যতা) বলছে- ৫০% চান্স আছে ছেলের গাঁজা ছেড়ে দেবার, ৫০% চান্স আছে গাঁজা না ছেড়ে দেবার। যদিও প্রবাবিলিটি ছোট নাম্বারের ক্ষেত্রে তার ম্যাজিক পুরোটা দেখায় না, লার্জ নাম্বারের ক্ষেত্রে দেখায়। দেখা গেল- ১০০ জন পিতামাতা তাদের সন্তানকে এভাবে একটা সাজানো পরিস্থিতির মধ্যে ফেললেন। আপনি নিশ্চিত থাকুন সেখানে ৫০ জন (বা এর কাছাকাছি সংখ্যা) ছেলে গাঁজা ছাড়বে না কিন্তু ৫০ জন (বা এর কাছাকাছি সংখ্যা) গাঁজাসেবন ছাড়বে।

রংপুর মেডিকেলে ছাত্রাবস্থায় একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়, অসম বন্ধুত্ব। একজনের বয়স পঞ্চাশের বেশি, আরেকজনের বয়স অর্ধেকের কম। আমাদের কাজ হল- রোগী না থাকলে দু’জনে আড্ডা দেওয়া, সারাদিন আবোল-তাবোল কথা বলা; ডেলিরিয়ামের (Delirium) মত। সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য হল- যে সমস্যাগুলো দেশে কমন, সেগুলোর একটা সমাধান খুঁজে বের করা। সিগারেট স্মোকিং, গাঁজা সেবন টাইপের সমস্যাগুলোকে পারিবারিকভাবে ফেইস করা। তখন দুজন অসম বন্ধু মিলে গণিতের আশ্রয় নিলাম, প্রবাবিলিটির (সম্ভাব্যতা) সাহায্যে আমরা অদ্ভুত টাইপের সমাধান দিব, কাউন্সেলিং (প্রথম অপশন) এর চাইতে দ্বিতীয় অপশনকে প্রাধান্য দিব। কেইসগুলো পুনঃপ্রকাশ (Relapse) না করে বরং একবারেই সমাধান (cure) করার চেষ্টা করব।

উপরের কেইসটি স্যারের হাতে আসার পর আমরা আড্ডা দিলাম। দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম রোগীর বাবা-মার চিকিৎসা আগে করব। তাদের শিখিয়ে দেওয়া হল কী করতে হবে তাদের। আমি নিজে রংপুরের অলিগলি খুঁজে গাঁজা কিনে আনলাম, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হল তা। পরবর্তীতে ছেলের বাবা আবার এসেছিল, আমাদের ঝাড়ি দিতে। তাদের ধারণা আরো সহজ কোন সমাধান দেওয়া যেত। স্যার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ”ছেলে এখনও গাঁজা খায়?” বাবা উত্তর দিলেন, ”খায়, এখন আরো বেশি খায়। নিজের ঘরে খায়।”

যাই হোক, সব সিস্টেম সবার ক্ষেত্রে কাজ করবে না। বালতির মুখ বোতলের ছিপি দিয়ে আটকাতে পারবেন না, আবার বোতলের মুখ বালতির ঢাকনা দিয়ে আটকালেও কাজ হবে না। তবে মানুষ হবার যন্ত্রণা হল DNA এর ভেতর ‘ব্রুস জ্বিন’ থাকে, যা আপনাকে কোন কিছু খুব সহজে ছাড়তে দিবে না। কচ্ছপের মত কামড়ে পড়ে থাকা শেখাবে, বেল পড়ে মাথা ফেটে গেলেও সহস্রবার আপনাকে বেলতলায় দাঁড় করাবে। আমরা আরেকবার বেলতলায় গেলাম, নতুন ও অদ্ভুত কৌশলে। ছেলেটা নেশা ছেড়ে দিল এবার, উইলিংলি!

কথা শেষ করা যাক- সবক্ষেত্রেই এই লেভেলের নাটক করা প্রায় অসম্ভব। আপনি কি সত্যিই চান আপনার সন্তান সিগারেট এর মত ছোট্ট নেশাটিও ছেড়ে দিক? আপনি গণিতের (প্রবাবিলিটি) সাহায্য নিতে পারেন। অর্ধেক অসফল হবার রিস্ক আছে জেনেও আপনাকে রিস্ক নিতে হবে, চিন্তাভাবনা করে অদ্ভুত কৌশল প্রয়োগ কর‍তে হবে, সন্তানের জন্য দুশ্চিন্তা-কান্নাকাটি না করে ব্রেইনকে খাটাতে হবে। বের করতে হবে সমাধানের ইউনিক কৌশল। তাকে কখনোই নিষিদ্ধ জিনিসের কাছ থেকে আকস্মিক টান দিয়ে টেনে আনবেন না। প্রেমে নিষেধ করলে সেই সন্তানের ঘর ছাড়া কিংবা আত্মহত্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, সিগারেট নিষিদ্ধ করলে তার গাঁজা-ইয়াবা সেবনের সম্ভাবনা আগের চাইতে দ্বিগুন বেড়ে যাবে। বরং তাকে ডিসেন্সটিটাইজড করুন, যেভাবে এলার্জির ট্রিটমেন্ট করে ডাক্তাররা। সন্তানকে ডেকে বলতে পারেন, ”বাসার বাইরে সিগারেট খেয়ো না। মানুষ খারাপ বলে। বাসায় নিজের রুমে খাও।” সাথে বেশ উৎসাহী হয়ে ছেলেকে এক প্যাকেট সিগারেটও কিনে দিলেন, নিউমার্কেট থেকে সোনালি রঙ এর একটা লাইটারও দিলেন।

খেয়াল রাখবেন- আপনার অভিনয়ের উপর সবটা নির্ভর করছে। সিগারেট ও লাইটার কিনে দেবার সময় চোখমুখে এমন এক্সপ্রেশন দিবেন, যেন আপনার সন্তান মনে করে আপনি অসহায়-ভেঙে পড়েছেন-আপনার দ্বিতীয় কোন পথ ছিল না। সন্তানের ভেতরে বদলের চিন্তাটা বাসা-সিগারেট-লাইটার দিয়ে নয়, আপনার এক্সপ্রেশন দিয়েই আনতে হবে। প্রবাবিলিটির ম্যাজিক পক্ষ্যে থাকলে আপনার ছেলে লজ্জায় কিংবা সম্মান করে সিগারেট ছেড়ে দিবে। একটা সময় তার কাছে দুধ আর সিগারেটের বেসিক পার্থক্য থাকবে না, সিগারেটের প্রতি যে অদম্য নেশাটা কাজ করত সেটা আর কাজ করবে না। ‘পাঠকের মৃত্য’ গল্পের মত ‘স্বভাবের মৃত্যু’ ঘটবে। হ্যাঁ, মাথায় রাখতে হবে যেকোন কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে। হয় সফল নয় অসফল, মাঝামাঝি কিছু হবে না। চাইলে নিজের তৈরি কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন, সেটা বেস্ট। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রির সবচাইতে মজার দিক হল- আপনি অনেক কৌশল ব্যবহার করতে পারেন, কৌশল না খাটলে ড্রাগ ট্রিটমেন্টের আশ্রয় নেওয়া যায়। থাকতে পারেন একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সুপারভিশনে।

গাঁজা, নেশা, ড্রাগস

কথায় কেন নয়, অভিনয়ে কেন পথে আনবেন? ভালো ভালো কথায় কাউকে পথে আনার সম্ভাবনা বরাবরই অল্প। ধর্মের কথায় সাড়া কম পাওয়া যায় ধর্মগুরুরা জানতেন। অধিকাংশ মানুষ (Large Number Bad) উলটো পথে হাঁটবে এটা খুব স্বাভাবিক, ভাল হবে অল্পকিছু (Small Number Good). কুমড়ো ফুলে খাবার হয়, কেউ কুমড়ো ফুলে আগ্রহ দেখাবে না। গোলাপে কাটা আছে, সুগন্ধে এলার্জির মত ভয়াবহ সমস্যা হতে পারে জেনেও আমরা গোলাপ কিনি। কারণ- মানুষের স্বভাব রঙহীন, শব্দহীন, আলোহীন বস্তুর প্রতি নির্লিপ্ত থাকা। মানুষ কাজ করে ব্রাইটেস্ট-লাউডেস্ট-লারজেস্ট থিউরিতে। পানি এবং মদ দুটো তরলের মাঝে মানুষ ‘পানি’ খায় বাধ্য হয়ে, মদ কেনে পকেটের সব টাকা খরচা করে। সে মদ খাওয়া নিয়েও নানা খরুচে আয়োজন। অথচ পানি বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত (আমাদের প্রত্যেকটি কোষের ৭৫% পানি), মদ খেয়ে কেউ মহাজ্ঞানী কিংবা দীর্ঘায়ু লাভ করেছে এমন অথেনটিক তথ্য নেই।

নীতি কথায় বলবেন- গাঁজা খেলে ‘পুরুষ বন্ধ্যাত্ব’ হয়, এই কথাটা প্রকাশ করবেন। দেখবেন কাজ হবে না, কারণ গাঁজার আড্ডায় দশজনকে পাওয়া যাবে যাদের ২ জনের বউ-বাচ্চাসহ সংসার আছে, অথবা কেউ থাকবে যার বউ সন্তানসহ ডিভোর্স নিয়ে চলে গেছে, কিংবা কেউ থাকবে যে তার প্রেমিকার একবার এবরশন করেছে এবং এই তথ্যটা আড্ডার অনেকেই জানে। শেষে কী দাঁড়াল? বন্ধ্যাত্ব হয় এই বাক্যটা নিয়ে তারা হাসাহাসি করবে৷ হাসাহাসি করার কারণ- ‘গাঁজা খেলে বন্ধ্যাত্ব হবে না’ তা নয়, গাঁজা খেলে সবার বন্ধ্যাত্ব হয় না- এটাই তাদের হাসির কারণ। সিগারেট খেলেও সবার ক্যান্সার হয় না- এই থিউরি থেকেই সবাই স্মোকিং করে।

কাজ আদায়ের কৌশলটা বদলে ফেলতে পারেন। যেকোন খারাপ কিছু বদলে দিতে রিস্ক নিতে পারেন। হুট করে হাঁটা শুরু করা মানে রিস্ক নয়। ভেবে চিন্তা পরিকল্পনা দাঁড় করিয়ে এগোনো মানেই রিস্ক। আর রিস্ক মানেই প্রোবাবিলিটির ম্যাজিক। সমাধান যেমন নাও হতে পারে, তেমনই সমাধান হয়েও যেতে পারে। ‘হতেও পারে’ এতটুকু সম্বল করেও অনেক বড় কিছুও বদলে দেওয়া যায়। Never be afraid to make your first MOVE.

(Photo: Alon/Flickr)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button