মতামত

হোক কলরব – “নো ভ্যাট অন স্যানিটারি ন্যাপকিন”

তামিলনাড়ুর ছেলে অরুনাচালামের গল্পটা আপনাদের হয়ত জানা বলিউডের সাড়া জাগানো প্যাডম্যানের সিনেমার কল্যাণে। ভদ্রলোক বিয়ে করেছিলেন শান্তি নামের এক তরুণীকে। পরিবারের পছন্দে বিয়ে হলেও, বউকে বিয়ের পরে অরুনাচালামেরও খুব পছন্দ হয়ে যায়। যাহোক, অরুনাচালাম স্ত্রীর প্রতি যত্নবান ছিলেন। বিয়ের কিছুদিন পরেই তিনি খেয়াল করলেন, তার স্ত্রী মাসিকের সময় কোন নিরাপদ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করে পুরনো কাপড় ব্যবহার করে, যা একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত না। তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন কেন সে ভালো স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করে এসব পুরনো কাপড় ব্যবহার করে?

প্রথমে শান্তি শান্তই ছিলেন, অরুনাচালামকে বাড়তি দুশ্চিন্তা দিতে চাননি। কিন্তু অরুনাচালামের জোরালো জিজ্ঞাসু দৃষ্টির কারণেই বলতে বাধ্য হলেন শান্তি- এই প্যাডগুলো অনেক দামী। শান্তির পরিবারের পক্ষে কখনো কিনে দেবার সামর্থ্য ছিল না। তাছাড়া অরুনাচালামকেও সে এখন দামী ব্র্যান্ডের প্যাড কিনে দিতে বলতে পারে না। কারণ তাদের আর্থিক অবস্থাও যে খুব বেশি ভালো না।

তারপরের গল্পটা অরুনাচালাম লিখেছেন যেন নিজের হাতে৷ ঠিক করেছিলেন নিজেই প্যাড তৈরি করবেন। যেহেতু বাজারে এত দাম, তাই নিজেই বানিয়ে স্ত্রীকে উপহার দিবেন। অনেক বুদ্ধি করে প্রথম যে প্যাডটা বানালেন, সেটা শান্তিকে চমতকৃত করলেও শান্তি জানালেন, প্যাডটা পড়ে তার অস্বস্তি হয়েছিল। তাই, অরুনাচালাম আবারো লেগে পড়লেন কাজে। তিনি জানতে পারলেন উচ্চমূল্যের কারণে ভারতে নারীদের খুব নগণ্য অংশই প্যাড কিনতে পারে। তিনি বৃহৎ চিন্তা করলেন। প্যাড বানানোর পর সেগুলো সুলভ মূল্যে সবার কাছে ছড়িয়ে দেয়ারও চিন্তা ছিল তার।

প্যাডম্যান, স্যানিটারি প্যাড, ট্যাবু, পিরিয়ড, সোনম কাপুর, রাধিকা আপ্তে, অক্ষয় কুমার

কিন্তু, স্ত্রীর মাসিক মাসে একবার হয়। তাই প্যাডের গুণগত মান কেমন হবে এই রিভিউ চাইলেও সাথে সাথে পাওয়া সম্ভব ছিল না। অন্যদের কাছেও বলাটা কঠিন, বললেও কেউ নিঃসংকোচে অরুণের এই প্রচেষ্টাকে সাহায্য করতে প্যাডের রিভিউ দিবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। অরুনাচালাম তাই নিজেই বিভিন্ন প্রাণীর রক্ত দিয়ে বা বিভিন্ন সময় রং ব্যবহার করে প্যাডটা ভেজানোর প্ল্যান করলেন! এভাবেই তিনি রাস্তায় চলাচল করা শুরু করলেন, কিন্তু কিছুদিনের ভেতর তার আশেপাশের মানুষ ব্যাপারটা বুঝে ফেলল! যা হবার তাই হলো, সবাই তাকে নিয়ে মজা করা শুরু করলো। একসময় তার স্ত্রী পর্যন্ত তাকে ছেড়ে বাবার বাড়ি চলে গেল।

গল্প দীর্ঘায়িত করার মানে নেই৷ সেই অরুনাচালাম সফল হয়েছিলেন। তিনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। এর স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব অপরিসীম অথচ এর উচ্চমূল্য তাকে ভাবিয়েছিল। তাই অপমান, হাসাহাসি এসবের পরেও তিনি তার লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি৷ তিনি একজন সুপারম্যান, তিনি একজন প্যাডম্যান। তিনি স্বল্পমূল্যের প্যাড বানানোর মেশিন তৈরি করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।

অরুনাচালাম বুঝলেও এই সহজ সত্যটি অনেক দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিরা বোঝেন না। অন্য দেশের উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজন নেই যখন আমাদের দেশেই এরকম ঘটনা ঘটছে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ যেখানে সহজলভ্য হবার কথা ছিল, স্বল্পমূল্যে প্রদানের নিশ্চয়তা আসা উচিত ছিল সেখানে কিনা আমাদের দেশে এই পণ্যটির উপর ভ্যাট বসানো হয়! সর্বশেষ বাজেটে স্যানিটারি প্যাড তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় সব কাঁচামালের উপর ৪০ শতাংশেরও বেশি ভ্যাট বসানো হয়েছে। ফলে স্যানিটারি ন্যাপকিনের উচ্চমূল্য আরো বর্ধিত হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক, এই আধুনিক সময়ে এসে সচেতনতার অভাবে নয় শুধু উচ্চমূল্যের কারণে কেউ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছে না — এর চেয়ে হতাশার আর কি হতে পারে!

বাংলাদেশে পিরিয়ড / মাসিক এই শব্দগুলোই এখনো ট্যাবু হয়ে আছে। এই ট্যাবু শহরাঞ্চলে কিছুটা ভাঙছে কিন্তু গ্রামদেশে এখনো তা অতি লজ্জাজনক বিষয় যেন। এই ট্যাবু ভাঙ্গতে হলে অনেক বেশি সচেতনতা ছড়াতে হবে, স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজনীয়তা ও সহজলভ্যতা তৈরি করতে হবে। ২০১৪ সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেসলাইন সার্ভে থেকে জানা যায়, মাত্র ১০ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। আর ৮৬ শতাংশ নারীকে ঋতুকালীন সময়ে ব্যবহার করতে হয় পুরাতন কাপড়, ন্যাকড়া বা তুলা। এর পেছনে অনেকটাই দায়ী স্যানিটারি ন্যাপকিনের উচ্চমূল্য। এই বাজেটে বাড়তি ভ্যাট আরোপ করায়, তা আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এখানে দ্রষ্টব্য, আন্তর্জাতিক মানের স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ ক্ষেত্রে টোটাল ট্যাক্স ইনসিডেন্ট (টিটিআই) ১২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যেখানে ২৫ শতাংশ দিতে হয় কাস্টমস ডিউটি, ৪৫ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয় কর (এআইটি), ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি এবং ৪ শতাংশ এটিভি। এছাড়া বড় দোকান থেকে কিনতে গেলে আরও ৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হয় ক্রেতাকে। এটা গতবছরের পরিসংখ্যান।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের বর্তমান যে বাজার দর বিভিন্ন ব্র‍্যান্ড অনুযায়ী, তা শহরবাসীদের কারো কারো পক্ষে হয়ত এফোর্ড করা সম্ভব তবে সবার পক্ষে নয়। ঢাকা শহরে বিভিন্ন বসতি, নিম্নবিত্ত পরিবার কিংবা গ্রামের দিকে খোঁজ নিলে আপনি জানবেন, অনেকে স্রেফ বাড়তি দামের কারণে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারে না।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর ভ্যাট

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গণদাবির মুখে ভারত সরকারও স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর থেকে কর উঠিয়ে নিয়েছিল গতবছর। দেশটিতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ১২ শতাংশ হারে ট্যাক্স নেওয়া হত। যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বহু সমালোচনা হয়েছে। সিনেমা জগতের তারকা থেকে রাজনীতিবিদ সকলেই এই পণ্যের উপর ট্যাক্সের বিরোধিতা করেছেন। গত মেয়াদে ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় নারী ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মানেকা অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর জিএসটি চালু না করার জন্য আবেদন করেছিলেন।

কংগ্রেস সাংসদ সুমিতা দেব তো অনলাইন পিটিশনে সই সংগ্রহ করে জমা করেন যেন এই পণ্যের উপর কর উঠিয়ে নেয়া হয়। আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের মুখ থেকে এখনো সেভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি এই বিষয়ে। তারাও হয়ত দেশের অধিকাংশ মানুষের মতো পিরিয়ডকে ট্যাবু ভেবে ইস্যুটাকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করছেন। স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর ভ্যাট নয়– রাজনীতিবিদদের কাছে এই জনদাবিটি তাই আমাদেরকেই উপস্থাপন করতে হবে।

এই মুহুর্তে তাই একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত৷ এক্ষেত্রে শিক্ষিত নারীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এই ইস্যুটি নিয়ে তাদের কথা বলতে হবে। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এই খাতে ভ্যাট হার কমানো এবং ভর্তুকি দেয়া যায় কিনা সেই দাবি সামনে আনতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলি, আমাদের এখন এই জরুরী বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button