সিনেমা হলের গলি

সমাজের ভ্রান্ত নিয়মের বিরুদ্ধে নারীর লড়াইয়ের কথা বলবে যে সিনেমা

সার্ফিং নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন তানিম রহমান অংশু, এটা জানতাম। পরিচালক হিসেবে তার কাজ বেশ ভালো লাগে, কাজেই আগ্রহ ছিল, কি নিয়ে আসছেন তিনি সেটা নিয়ে। দেশের প্রথম নারী সার্ফারের উঠে আসার গল্প অবলম্বনে হতে পারে সিনেমাটা, এরকম তথ্য জেনেছিলাম আগে। গতকাল সিনেমার ‘এক্সটেন্ডেড ফার্স্ট লুক’ দেখে মোটামুটি থ হয়ে গেলাম, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে দারুণ একটা সিনেমা পেতে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই কোন। সেই সিনেমার নাম ‘ন ডরাই’!

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত হয়েছে সিনেমাটা। ‘ন ডরাই’ শব্দের অর্থ ভয় পাই না। সমাজ-সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সার্ফার হতে চাওয়া এক তরুণীর গল্প এটা। সেই গল্পের শাখা-প্রশাখায় জড়িয়ে আছে আরও অনেকগুলো গল্প। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুনেরাহ বিনতে কামাল এবং শরিফুল রাজ, আরও আছেন সাঈদ বাবু- সিনেমায় তার অন্তর্ভূক্তিটাই ন ডরাই- এর প্রতি আগ্রহটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরও। ইংরেজী ভাষায় সিনেমাটির নাম রাখা হয়েছে ‘Dare to Surf’.

আয়েশা নামের এক তরুণী সার্ফার হতে চায়, ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে চায় সাগরের নীল জলরাশির ওপরে। কিন্ত আমাদের সমাজের অলিখিত নিয়ম তার স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাকে বন্দি করে রাখতে চায় গৃহকোণে। সমাজ-সংসারের বিরুদ্ধে সেই তরুণীর লড়াইয়ের গল্পটাই সেলুলয়েডে তুলে এনেছেন তানিম রহমান অংশু। সিনেমাটা প্রযোজনা করেছে স্টার সিনেপ্লেক্স। দীর্ঘদিন ধরে সিনেমার সঙ্গে জড়িত থাকলেও, সিনেমা প্রযোজনার সঙ্গে সরাসরি সংযোগে নামছে তারা এই প্রথমবার। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্যে এটা সুখবর।

সার্ফিংটাকে নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্যে সিনেমার মূল কলাকূশলীরা টানা কয়েকমাস ধরে কক্সবাজারে থেকে সার্ফিং শিখেছেন, চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে স্থানীয় ভাষাটা আয়ত্বে এনেছেন। এই ডেডিকেশনটা বাংলা সিনেমার বিচারে অভাবনীয়। তামিম রহমান অংশুকে দুটো কারণে ধন্যবাদ দিতে চাই, এক হচ্ছে সিনেমার গল্পটা- এই ইউনিক টপিকে বাংলাদেশে আগে কখনও সিনেমা হয়নি, পাশের দেশ ভারতেও সার্ফিঙের ওপরে সিনেমা আছে কিনা আমার জানা নেই।

আর দ্বিতীয় যে কারণে অংশু ধন্যবাদ পাবেন, সেটা হচ্ছে একদম নবাগত দুই তরুণ-তরুণীর ওপরে ভরসা রাখায়। সুনেরাহ বিনতে কামালের নাম মডেলিং ইন্ডাস্ট্রির বাইরে খুব বেশি মানুষ বোধহয় জানেন না। রেদওয়ান রনির আইসক্রিম সিনেমা দিয়ে অভিষেক হলেও, শরীফুল রাজকেও এখনও প্রায় নতুনই বলা যায়। কারণ আইসক্রীমের পরে দর্শক তাকে পর্দায় পায়নি সেভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারকা খ্যাতিসম্পন্ন কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে নিলে সার্ফিং শেখার জন্যে যে ডেডিকেশনটা সুনেরাহ বা রাজরা দিয়েছেন, সেটা হয়তো কেউ দিতে চাইতেন না।

তিন মিনিটের এক্সটেন্ডেড ফার্স্ট লুক ভিডিওটা মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। বিশেষ করে শেষের দিকে আয়েশার কণ্ঠে সেই সংলাপটা- আঁই সাগরেরে ন ডরাই যে মাইয়াফুয়া, তোর মতো হারামজাদারে আঁই ডরাইয়ুম ন?’ (আমি সাগরকে ভয় পাই না যে মেয়ে, সে কিনা তোর মতো হারামজাদাকে ভয় পাবে?) মোটামুটি গুজবাম্প ছড়িয়েছে, রক্তের অ্যাড্রোনালিন র‍্যাশ বাড়িয়ে দিয়েছে খানিকটা। ভাষা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই, চট্টগ্রামের ভাষা যারা বোঝেন না, তাদের জন্যে সাবটাইটেলের ব্যবস্থা থাকবে।

‘ন ডরাই’ নিয়ে আগ্রহের আরেকটা কারণ শ্যামল সেনগুপ্ত। এই ভদ্রলোক সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছে। তার হাতে এর আগে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত পিংক, দেব অভিনীত বুনোহাঁস সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে, এই সিনেমাগুলো দারুণ প্রশংসিতও হয়েছে। সেই তালিকায় ‘ন ডরাই’ এর সংযোজন হবে, এমনটা আশা করাই যায়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে অক্টোবরে মুক্তি পাবার কথা রয়েছে ‘ন ডরাই’ সিনেমাটির। এমন একটা প্রোজেক্টের জন্যে আগ্রহভরে অপেক্ষা করতেও ভালো লাগে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button