অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

বিশ্বজুড়ে ইংরেজি বর্ষবরণের যত অদ্ভুত রীতি!

আর মাত্র একটা দিন বাকী, সময়ের খানিকটা হেরফেরে বিশ্বজুড়ে সবগুলো দেশ নানা আয়োজন আর উৎসবমুখর একটা পরিবেশের সঙ্গে বরণ করে নেবে ইংরেজী নতুন বছরকে। চলছে শেষ মূহুর্তের প্রস্ততি। ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়া, অথবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বাহামা কিংবা পালাউ অথবা টুভালু- সবগুলো দেশেই কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করছেন নিজেদের মতো করে আনন্দ আর ফুর্তির সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগতম জানাতে। একেক দেশে একেক রকমের রীতি রেওয়াজ, তবে উৎসবের আনন্দটা একই, একই সকলের মঙ্গল কামনার ধরণটাও। নতুন বছরের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে চলুন জেনে নেয়া যাক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইংরেজী নববর্ষ বরণের প্রস্ততি বা পদ্ধতি সম্পর্কে, কে জানে, হয়তো কোনটার কথা শুনলে চমকেও যাবেন আপনি!

#স্প্যানিশ আঙুরের গপ্পো: স্পেনে ইংরেজী নতুন বছরকে বরণ করা হয় ওদের কিছু পুরনো ঐতিহ্য আর সংস্কারের সঙ্গে মিল রেখে। একত্রিশে ডিসেম্বর রাত বারোটার ঘন্টাটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় নতুন একটা বছরের, আর ঠিক সেই মূহুর্তে স্প্যানিশদের এক হাতে থাকে বারোটি তাজা আঙুর, অন্য হাতে একগ্লাস কাভা(স্প্যানিশ মদ)। বলা হয়ে থাকে, নতুন বছরে সুস্বাস্থ্যের কামনায় এই কাজটা করে স্পেনের অধিবাসীরা। এই বারোটি আঙুর কিন্ত মধ্যরাতের ভেতরেই খেতে হয়।

#ডেনমার্কের ভাঙা প্লেট: অন্যের বাড়ির সামনে মনের সুখে কাঁচের থালা-বাসন আছাড় মেরে ভাংছেন, অন্য সময়ে বা অন্য কোন দেশে হলে জেল-জরিমানা হতোই আপনার। কিন্ত দেশটা যখন ডেনমার্ক, আর সময়টা যখন নিউ ইয়ার্স এভ, তখন প্রতিবেশীরা আপনার হাতে গ্লাস-প্লেট ধরিয়ে দিয়ে নেমন্তন্ন করে নিয়ে যাবেন ওদের বাড়ির সামনে, এগুলো ভাঙার জন্যে! বিচিত্র হলেও সত্যি, সারাবছর ধরে ব্যবহৃত বা পুরনো হয়ে যাওয়া বাসন-কোসন ফেলে না দিয়ে জমিয়ে রাখে ডেনমার্কের লোকজন, থার্টি ফার্স্ট নাইটে সদর দরজার সামনে আছাড় মেরে ভাঙার জন্যে। অন্যান্য দেশে এটাকে দুর্ভাগ্যের লক্ষণ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলেও, নতুন বছর শুরুর সময়ে ডেনমার্কে এটা অবশ্যপালনীয় প্রথা!

#ব্রাজিলের সৈকতে সাতটি ডুব: উৎসব অনুষ্ঠানের জন্যে সবচেয়ে উর্বর জায়গা সম্ভবত সাম্বার দেশ ব্রাজিল। রিও’ডি জেনিরোর কোপাকাবানা বীচ সেই রাতে পরিণত হয় উৎসবক্ষেত্রে। আলোর ঝলকানীতে বাহারী পোষাক পরিহিত পর্যটক আর স্থানীয় মানুষেরা একসঙ্গে মিলেমিশে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। এখানেও স্থানীয় কিছু বিশ্বাস প্রচলিত আছে। আসছে বছরে সৌভাগ্য নিশ্চিত করার জন্যে সমুদ্রে সাতবার ডুব দেয় অনেকে। এটাকে মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে বিশ্বাস করে এখানকার মানুষজন। ব্রাজিলের এই ইংরেজী নববর্ষের উৎসবে যোগ দিতে প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসে লাখো মানুষ। বছরের শেষ সপ্তাহটা দারুণ ব্যস্ততায় কাটে এখানকার এয়ারলাইন্স আর হোটেল কর্মীদের।

#এস্তোনিয়ার আজব ডিনার: একরাতে ক’বার খেতে পারবে আপনি? একবার, দু’বার, বড়জোর তিনবার? কিন্ত থার্টি ফার্স্ট নাইটে এস্তোনিয়ার মানুষজন বারোবারও ডিনার করে! অদ্ভুত না? সাত, নয় এবং বারো সংখ্যা তিনটিকে এস্তোনিয়ানরা শুভ মনে করে, আর একারণেই সাত, নয় বা বারোবার তারা ডিনার করে বছরের শেষ রাতে। তবে প্লেটে থাকা সবকিছু খেতে হয় না, কিছুটা রেখে দেয়া হয় মৃত আত্মাদের উদরপূর্তির জন্যে। এতে নাকি মঙ্গল বর্ষিত হয়- এস্তোনিয়ানদের ধারণা এমনই!

#স্কটল্যান্ডের আলোর মিছিল: স্কটল্যান্ডের রাজধানী শহর এডিনবার্গে তিন দিনব্যাপি নববর্ষ উদযাপনের শুরুটা হয় ত্রিশে ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। সেদিন প্রায় আট হাজারেরও বেশী ফুর্তিবাজ মানুষ শুধু টর্চ জ্বালিয়ে মিছিল বের করেন, যেটাকে রিভার অব লাইট বা রিভার অব ফায়ার নামে ডাকা হয়। মনের ভেতরের অন্ধকারকে দূর করাটাই এই প্রতীকি মিছিলের উদ্দেশ্য বলে ধরা হয়। শহরের রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করে এই মিছিল, কাল্টন হিল থেকে পার্লামেন্ট স্কয়ার পর্যন্ত সবটুকুই। নতুন বছর শুরু হবার সময়টাকে স্বাগত জানানো হয় ড্রাম বাজিয়ে, রাস্তায় উপস্থিত মানুষজন সবাই ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ মিউজিকের তালে তালে নেচে গেয়ে হুল্লোড় করে। শেষরাত পর্যন্ত চলে এই বাদ্য-বাজনা, সেই রাতে রাজধানীর বাইরে আয়োজন করা হয় হ্যালোইনের মতো উৎসবের। বছরের প্রথম দিনটি সেখানে সরকারী ছুটি।

#জাপানের ঘণ্টাধ্বনি: সূর্যোদয়ের দেশ বা ভূমিকম্পের দেশ, যে নামেই ডাকা হোক, জাপানেই নববর্ষের প্রথম প্রহরটা পা রাখে সবার আগে। রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধিস্ট টেম্পল থেকে ১০৮ বার ঘন্টা বাজানো হয় একটানা। সেখানকার স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস আর ধর্মীয় রীতি মেনেই এই সংখ্যাটাকে বেছে নিয়েছে তারা। তাদের মতে, বেঁচে থাকার জন্যে মানুষের আবশ্যকীয় প্রত্যাশা বা চাহিদার সংখ্যা এতগুলো, একারণেই ১০৮ বার ঘন্টা বাজিয়ে স্রষ্টার কাছে এই চাহিদাগুলো পূরণের প্রার্থনা করা হয়।

#যুক্তরাজ্যের কালোচুলো পুরুষ: লণ্ডনে ট্রাগলফার স্কয়ারে নববর্ষের প্রাক্কালে জমায়েত হয় লক্ষাধিক মানুষ। বিগবেন ঘড়ির ঘন্টাধ্বনির তালে তালে স্বাগত জানানো হয় নতুন বছরকে। কুসংস্কার সেই সূদুর বিলাতেও আছে, এই অঞ্চলে বলা হয়ে থাকে, নতুন বছরের প্রথম মধ্যরাতের পর যে পুরুষ বাড়িতে প্রথম পা রাখে, সে নাকি সেই পরিবারের জন্যে সৌভাগ্য নিয়ে আসে। একারণে পুরুষেরা নিজেদের বাড়িতে টাকা, রুটি, মদ এবং মাংস নিয়ে আসে, যাতে সারাবছর এগুলোর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে এই আশায়। তবে সব পুরুষকে কিন্ত সৌভাগ্যের প্রতীক ধরা হয় না। যাদের চুল কালো, কেবল তাদেরকেই সৌভাগ্যবান হিসেবে দেখা হয়। সোনালী বা লালচুলো পুরুষের দাম নেই তখন!

#যুক্তরাষ্ট্র- টাইমস স্কয়ারের জনস্রোত: শিকাগো বা ওয়াশিংটন নয়, যুক্তরাষ্ট্রে নববর্ষ উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার। এখানে একসঙ্গে প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোক অংশগ্রহণ করে, এদের বেশীরভাগই আবার প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী। এটাই সম্ভবত ইংরেজী নববর্ষের সবচেয়ে বড় জমায়েত। নতুন বছর শুরুর দশ সেকেন্ড আগে থেকে টেন-নাইন-এইট-সেভেন করে কাউন্টডাউন শুরু হয়, বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই খুশীর জোয়ার নেমে আসে টাইমস স্কয়ারে। বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গীকে জড়িয়ে ধরে বা চুমু খেয়ে এই মূহুর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখে সবাই।

#ফ্রান্স- পুরনো মদ চলবে না: ফ্রেঞ্চরা জাতি হিসেবে খানিকটা ব্যতিক্রম। ইংরেজী নববর্ষ পালনেও সেটার ছাপ দেখা যায়। তাদের বিশ্বাস, নতুন বছরে পুরনো মদ খাওয়া পাপ। কোনভাবেই পুরনো মদগুলো নতুন বছর আসা অবদি ঘরে রাখা যাবে না। আবার এগুলো ফেলে দেয়া বা নষ্ট করাও যাবে না। আর তাই বছরের শেষ কয়টা দিন এগুলো খালি করার নেশায় ডুবে থাকে অনেক ফ্রেঞ্চ। বছরের শেষ দিনগুলো মাতাল হয়েই কাটিয়ে দেয় কিছু মানুষ!

#প্যারাগুয়ের রান্না, পোল্যান্ডের ‘ভেজিটেরিয়ান’: প্যারাগুয়ের অধিবাসীদের কেউ কেউ বিশ্বাস করে, নতুন বছরের শেষ পাঁচদিন হচ্ছে ঠান্ডা খাবার খাওয়ার দিন। এই পাঁচদিন ওদের চুলোয় আগুণ জ্বলে না, একেবারে নতুন বছরে নতুন রান্না করা গরম খাবার খেয়েই নববর্ষ উদযাপন করেন তারা। আবার পোল্যান্ডের কিছু তরুণী বর্ষবরণের রাতে খরগোশের মতো পোশাক পরে সাজে, ওরা খরগোশের মতো লাফিয়ে হাঁটার চেষ্টা করে, ডাটা শাকসবজী চিবিয়ে খায় খরগোশের মতো করে। তাদের বিশ্বাস, খরগোশের মতো শাকসবজী চিবিয়ে নতুন বছরে পা দিলে নাকি বছরটা ভালো কাটবে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button