ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

নতুন পোষাক নেই বলে নতুন বই থেকে বঞ্চিত হলো ওরা!

ঘটনাটি সিলেটের এক সরকারি প্রাইমারি স্কুলের। স্কুলটির নাম উমরশাহ তেররতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সারাদেশের সর্বত্র যখন গতকাল আমাদের শিশু, কিশোররা নতুন বই নিয়ে ঘরে ফিরলো, ঠিক সেই আনন্দময় দিনে এই স্কুলের কিছু শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করা হলো এই আনন্দ থেকে। এই স্কুলটির কিছু শিক্ষার্থীকে নতুন বই দেয়া হয়নি খুব জঘন্য একটা কারণে, তাদের নতুন পোষাক ছিল না, এটাই দোষ!

আওয়ামীলীগ সরকারের সেরা উদ্যোগগুলোর একটি বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে বই বিতরণ করা। এই বই বিতরণের ঘটনাকে অভিহিত করা হয় বই উৎসব হিসেবে। বাস্তবিকই এটি আসলেই একটি উৎসবই। নতুন বইয়ের পাতায় অদ্ভুত সুন্দর ঘ্রাণের চেয়ে সুন্দর ব্যাপার খুব কমই আছে। আর বইগুলো পেয়ে শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে যে ঝিলিক দেখা যায়, সেটা তো একেবারে অমূল্য। ঈদের দিনের মতোই একটা আনন্দ থাকে এদিনটায় শিশু কিশোরদের মনে। সারাবছর যেমনই যাক, বছরের প্রথম দিন নতুন ক্লাসে উঠার পর একদম নতুন বই, বাংলা বইয়ে নতুন গল্প, নতুন সব কিছু – এগুলো দেখার কি অসাধারণ আনন্দ এটা অবর্ণনীয়।

কিন্তু, এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে সিলেটের এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। নতুন পোষাক নেই বলে তাদের কাছে বই বিতরণ বন্ধ রাখা হবে এমন নির্দয়তা স্কুলটা না দেখালেও পারত। শিক্ষার গুণগত মান কম বলেই কি এরকম অসাম্য চিন্তাটি এসেছে স্কুলের কতৃপক্ষের কাছে? যার নতুন পোষাক আছে তার মেধা কি একটু বেশি? যার নতুন পোষাক আছে তার জন্য বইয়ে কি আলাদা কন্টেন্ট? নতুন পোষাক যার আছে সে কি পড়াগুলো বেশি তরতরিয়ে বুঝে যাবে? কোনো ভাবেই মেলানো যাচ্ছে না আসলে নতুন পোষাকের সাথে বই প্রাপ্তির সম্পর্ক কোন জায়গায়?

স্কুল থেকে অবশ্য মন্ত্রনালয়কে ফাঁসানো হয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রোকসানা খানম বলেন, “নতুন ড্রেস পরে এসে বই নিয়ে যেতে মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে। তাই পুরনো ড্রেস পরে এলে বই দিচ্ছি না।”

মন্ত্রনালয়ের কোনো নির্দেশনার কাগজ অবশ্য তারা দেখাতে পারেননি। মন্ত্রনালয় থেকে এমন নির্দেশনা আসবে, এটাও বিশ্বাস করছি না আসলে। কেউ পুরানো জামা পড়ে এলে তাকে বই দিও না, এরকমটা মন্ত্রনালয়ের ঘোষণা হতে পারে না। হ্যা, যেহেতু বছরের প্রথম দিন, নতুন বছর, নতুন ক্লাস, নতুন বই – তাই সব নতুনকে স্বাগত জানিয়ে সবাই নতুন পোষাকে এসে একটা উৎসবের মধ্যে বই নেবে এমন একটা ভাইব সৃষ্টির জন্য এরকম বলা হয়ে থাকতে পারে। তার মানে কি এই যে, কেউ নতুন পোষাক কিনতে অসমর্থ হলে তাকে উৎসব থেকে অবাঞ্চিত করে রাখবেন?

এই শিশুগুলোর মানসিক অবস্থা আমিই টের পাচ্ছি এখানে বসে, আমার সব বন্ধু বই নিয়ে আনন্দ উৎসব করছে, তাদের হাসিমুখ আর আমি নতুন জামা জোগাড় করতে পারিনি বলে আমাকে বই দেয়া হয়নি। আমার মূল্য নেই, শিক্ষার গুরুত্ব নেই, গুরুত্ব নতুন জামায়! এরকমটা যদি এই শিশুরা ভাবে তাহলেও বলার কিছু থাকবে না। গতদিন বই না পেয়ে কত শিক্ষার্থী কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে গেছে সেটা কি স্কুল কতৃপক্ষ খেয়াল করেছিলেন? এই শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ দিনমজুরের সন্তান। এরা পড়ালেখায় আগ্রহ এখনো ধরে রাখছে, পড়ছে এটাই তো আনন্দের সংবাদ। এদের সহযোগিতা না করে এদেরকে মানসিকভাবে যে কষ্ট দেয়া হলো এটা কি স্কুল বুঝতে পারছে এখন?

স্কুল যে সচেতনভাবে এই শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে দিয়েছে শ্রেণীগত বিভেদ এবং স্মরণ করিয়ে দিয়েছে আজন্ম লালিত দারিদ্র্য – এটার মানসিক প্রভাবটা এই শিশুগুলোকে বয়ে বেড়াতে হবে অনেকদিন ধরে। আমি এই অবস্থাগুলো দেখেছি, স্কুলে পড়বার সময় দেখেছি শিক্ষকরা কিভাবে বিভেদ তৈরি করেন। অবস্থান অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা ভাবে ট্রিট করেন। যার বাবা সরকারের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা তার জন্য একরকম আচরণ, যার বাবা সাধারণ তার জন্য একরকম। শিক্ষকদের এসব আচরণ, স্কুলের এসব আচরণ শিক্ষার্থীদের জন্য ভীষণ অপমানজনক এবং ক্ষতিকর।

পোষাক দিয়ে বিবেচনা করে এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বই থেকে বঞ্চিত রাখাও একটা অপমান! যে উৎসব সারাদেশে সব শিক্ষার্থী শামিল হয়েছে, সেই উৎসব থেকে তাদের বঞ্চিত করে স্কুল খুব বাজে দৃষ্টান্ত দেখালো, তাও একটা লেম কারণে! শেখ সাদীর সেই গল্পটা মনে পড়ে যায়। যে গল্পে ফকিরের পোষাক পরে দাওয়াতে গিয়ে কোনো সমাদর পায় না কিন্তু একই মানুষ রাজপোষাকে গিয়ে দাওয়াতে বসে তুমুল আপ্যায়ন পায়। শেখ সাদী তখন খাবার না খেয়ে জামার পকেটে ঢুকায়। অবাক হয়ে শেখ সাদীকে কেউ জিজ্ঞেস করে ঘটনা কি?

শেখ সাদী বলে এই আপ্যায়ন, খাবার তো আমার প্রাপ্য না, আমার পোষাকের প্রাপ্য। কারণ, পোষাকের গুণেই তো এত খাতির পাচ্ছি এখন! এসব গল্প স্কুলেই শেখানো হয়। এখনকার দিনে শেখানো হয় কিনা জানি না, কিন্তু, এই গল্প সিলেটের সেই স্কুলের টিচারদের সহ দেশের বিভিন্ন মানুষ যারা পোষাক দিয়ে বিবেচনা করে মানুষকে সম্মান- অসম্মান করার সিদ্ধান্ত নেয় তাদের ভাল করে পড়ানো উচিত। বার বার পড়ানো উচিত। পোষাক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানবিক স্বত্তা থেকে গুরুত্বপূর্ণ না অবশ্যই! আমাদের মানবিকবোধ উন্নত হোক, সবারই…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button