মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

বাবার প্রতি ভালোবাসার টানে বাংলাদেশে এসেছিলেন যে তরুণী!

পর্ব-১:
এ যেন সি‌নেমা‌কেও হার মানায়। তা‌রিখটা ছিল মা‌র্চের ৬, ২০১১। এর ওর কা‌ছে গি‌য়ে শেষ পর্যন্ত আমার কা‌ছে সে‌দিন এসে‌ছিল ব্রি‌টিশ মে‌য়ে নেথা ইসলাম। বয়স ৪০; থাকেন যুক্তরাজ্যে; পেশায় সাইকোথেরাপিস্ট। মানে, মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে মানসিক আবেগঘটিত সমস্যার চিকিৎসা দেন তিনি। কিন্তু অসামান্য এক আবেগ এই মেয়েটিকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ৩৭ বছর ধরে। সেই তাড়না তাঁকে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশে; তাঁর বাবার দেশে। তিনি খুঁজছেন তাঁর বাবা ফকরুল ইসলামকে। আর সে কার‌ণেই এর ওর কাছ থে‌কে খুঁ‌জে আমার কা‌ছে আসা।

আমার মনে এখনো দাগ কেটে আছে নেথার ঘটনা। বাবা‌কে খুঁজছে কিন্ত একটি ছবি ছাড়া আর কিছুই নেই তার কাছে। ঢাকায় এসে একজনের মাধ্যমে নেথা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে কোনো তথ্য ছাড়া তাঁর বাবাকে খোঁজা কঠিন কাজ। তবুও আমি নেথার ঘটনা শুনি। আশ্বাস দেই তাকে নি‌য়ে লিখবো।

কিন্তু ‌নেথা কেন খুঁজছেন বাবাকে? তিন বছরের একটি মেয়ে বাবার কী কী স্মৃতি মনে রাখতে পারে? নেথা বলেছেন, কোনো স্মৃতি নেই। আছে প্রচণ্ড ভালোবাসা, তীব্র আবেগ। ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’ কবি গোলাম মোস্তফার সঙ্গে নেথার ঘোরতর দ্বিমত। তাঁর পিতা জেগে আছেন তাঁর অন্তরে। হৃদয়ের সেই পিতাকে বাস্তবে দেখতে চান, খুঁজে পেতে চান তিনি। বাবার যে ছবিটি তিনি যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে আছেন, তা-ও তো তাঁর যৌবনের। এখন বেঁচে থাকলে দেখতে কেমন হবেন তিনি? আদৌ বেঁচে আছেন কি না? সব প্রশ্নই ভিড় করে মনোবিদের মনে। নিজের এই অভিযাত্রার নাম দিয়েছেন ‘সার্চিং ফর মাই ফাদার’।

লম্বা ও ছিপছিপে গড়নের নেথার চোখজোড়া এমনই, যেন সব সময়ই কিছু না কিছু খুঁজছে। প্রথম আলোর কার্যালয়ে এসে যখন বাবাকে নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর চোখ ছলছল। মায়ের কাছে শুনেছেন, সহজ-সরল আর ভালো মানুষ ছিলেন তাঁর বাবা।

Image Source: prothom alo

ফকরুল ইসলাম ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যের ল্যুটনে গিয়েছিলেন। থাকতেন ১২ হাইফিল্ড রোড, ল্যুটনে। সেখানেই পরিচয় ও প্রণয় এক ব্রিটিশ তরুণীর সঙ্গে। ১৯৬৯ সালে ওই তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। ১৯৭০ সালে জন্ম হয় এই দম্পতির প্রথম সন্তান ওমর ইসলামের। নেথার জন্ম ১৯৭১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। মায়ের মতে, পরের বছরগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালে এসে সম্পর্কে চিঁড় ধরে। একপর্যায়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন ফকরুল ইসলাম। তবে সন্তানদের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। শেষ চিঠিটি ১৯৭৮ সালে লেখা হয়, যাতে দুই ছেলেমেয়ের খোঁজ নিয়েছেন তিনি।

হঠাৎ আতঙ্ক ভর করে নেথার মায়ের মধ্যে—ফকরুল তাঁর ছেলেমেয়েকে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে পারেন। সেই আতঙ্ক থেকেই ওয়েলিয়া গার্ডেন সিটি থেকে ছেলেমেয়েকে নিয়ে মা চলে যান করোওয়ালে। নেথা বলে যান, নতুন এই ঠিকানা জানা ছিল না তাঁর বাবার। সে কারণেই বোধহয়, তাঁর বাবা আর কখনো তাঁদের খোঁজখবর নিতে পারেননি। ছিন্ন হয়ে যায় সব বন্ধন।

নেথা বলেন, ‘বড় হওয়ার পর আমি বারবার বাবার সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। মা কেবল জানিয়েছেন, বাবার বাড়ি সম্ভবত বাংলাদেশের সিলেটে। যুক্তরাজ্যে তিনি গাড়ি চালনায় প্রশিক্ষণ দিতেন। কিন্তু ১৯৭৮ সালের পর বাবার কোনো তথ্য দিতে পারেননি মা। বাধ্য হয়ে আমি বাংলাদেশে চলে এসেছি।’

নেথা বলে চলেন, ‘মা আমাকে বলেছেন, বাবা সব সময় চেয়েছিলেন যোগাযোগ রাখতে। কিন্তু সন্তান হারানোর আতঙ্কে তিনি বাবার সঙ্গে যোগাযাগ রাখতে চাননি। মা হিসেবে তিনি যেটা করেছিলেন, সেটা হয়তো ঠিক ছিল। কিন্তু আমি বাবাকে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে বাংলাদেশে এসেছি। মন বলছে, আমি হয়তো ফিরে পাব বাবাকে।’

‘আমি বাবাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। আমি চাই, আমার এই ভালোবাসার কথা আমার বাবা জানুক। আমি তাঁর খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত এ দেশেই থাকব’, বললেন নেথা।

ইতিমধ্যে নিজের মতো করে কাজে নেমে পড়েছেন নেথা। ‘আমি ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনে গিয়েছিলাম বাবার পাসপোর্ট নম্বর, ঠিকানাসহ যেকোনো তথ্যের খোঁজে। কিন্তু তাদের কাছে এত আগের তথ্য নেই। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি। বাংলাদেশের মানুষের সহযোগিতা আমাকে মুগ্ধ করেছে; অনুপ্রাণিত করেছে।’

বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তায় ইতিমধ্যেই মুগ্ধ নেথা ইসলাম। তাঁর বিশ্বাস, এ দেশের মানুষের মতোই পারিবারিক বন্ধনে অভ্যস্ত তাঁর বাবা। তিনি বলেন, ‘আমার শরীরে বাঙালির রক্ত। এতে আমি দারুণ খুশি।’

বাবাকে খুঁজে না পেলে কষ্টই পাবেন নেথা। তবে তাঁর উদ্যোগকে তিনি স্মরণীয় করে রাখতে চান। নেথা বললেন, ‘বাংলাদেশে এই সফর আমার পুরো জীবনটাই বদলে দিয়েছে। এই অভিযান নিয়ে আমি একটা বই লিখতে চাই। বইয়ের নাম হবে “সার্চিং ফর মাই ফাদার ইন দ্য মাদারল্যান্ড, বাংলাদেশ”। আমি এই বইটা উৎসর্গ করতে চাই বাবাকে।’

২০১১ সা‌লের ৭ মার্চ প্রথম অা‌লোয় প্রকা‌শিত হ‌লো আমার সেই প্র‌তি‌বেদন- বাবার জন্য ভা‌লোবাসা। । পরদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সারাদিন আবেগকন্ঠে ফোন আসে। নিউজটার লিংক এখানে।

পর্ব-২:
কাকতাল দিয়ে শুরু! কামরুজ্জামান রুমানের বাড়ি সিলেটের কুলাউড়ায়। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করছেন।
সকালে প্রথম আলোয় তিনি পড়েন ‘বাবার জন্য ভালোবাসা’র খবর। বাবার খোঁজে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ৪০ বছরের নেথা ইসলাম। সংবাদটি পড়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন রুমান।

বিকেলে রুমান বাসায় ফেরেন। গল্পের ছলে খবরটি শোনাচ্ছিলেন তালুই (ফুফুর বেয়াই) নিজামউদ্দিন আহমেদকে। একপর্যায়ে মেয়েটির বাবার নাম বলতেই চমকে ওঠেন নিজামউদ্দিন। ফকরুল যে তাঁর আপন চাচাতো ভাই! তিনি জানতে চান, মেয়েটির নাম কী? নাম শুনেই তাঁর মনে হয়, এ বুঝি ফকরুলের মেয়ে নীতা। নেথাকে তাঁরা নীতা নামেই জেনেছেন ফকরুলের কাছ থেকে। এরপর তিনি ইন্টারনেটে প্রথম আলোর সংবাদটি পড়েন। তাঁর আর কোনো সন্দেহ রইল না, এই নেথাই তাঁর চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। কারণ, নেথার ভাই ওমর ইসলামের নামও জানতেন তাঁরা। ইন্টারনেট থেকে প্রথম আলোর নম্বর নিয়ে ফোন করেন। কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে।

Image Source: prothom alo

নিজামউদ্দিন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। গত ২০ জানুয়ারি তিনি দেশে বেড়াতে আসেন। আর নেথা এসেছেন ৪ ফেব্রুয়ারি। নেথার বাবার পরিবারের এখন যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রায় সবাই থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে এই সময়ে দেশে নিজামউদ্দিনের এই সফরটিও যেন কাকতাল। সন্ধ্যায় নেথাকে মুঠোফোনে জানানো হলো, সম্ভবত তোমার এক আত্মীয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন নেথা। দুজনকে আসতে বলা হলো প্রথম আলোর কার্যালয়ে। সেখা‌নে জড়ো হ‌য়ে‌ছেন আমার অ‌নেক সহকর্মী।

স্বজন আসবে শুনে একটু আগেভাগে এসে অধীর আগ্রহে বসে ছিলেন নেথা। রাত নয়টায় আসেন নিজামউদ্দিন। প্রথম সাক্ষাতে বিস্মিত দুজন। নিজামউদ্দিন ইংরেজিতেই সম্বোধন করলেন, ‘নীতা, কেমন আছ?’ শুরু হয় দুজনের কথোপকথন। নিজামউদ্দিন বলতে থাকেন ফকরুলের গল্প। সাগ্রহে বাবার গল্প শুনতে থাকেন নীতা। কিন্তু বাবা কই? আনন্দের এই মুহূর্তেই তাঁকে জানতে হলো—বাবা নেই। গত হয়েছেন ২৭ বছর আগে, ১৯৮৪ সালে।

চোখ ভিজে যায় নেথার। চোখ ভি‌জে যায় আমা‌দের। ৪০ বছর ধরে যে বাবাকে তিনি মনে মনে খুঁজছেন, মায়ের অনুমতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত চলে এসেছেন বাংলাদেশে। ঢাকায় এক মাস ধরে পড়ে আছেন, যদি কোনোভাবে বাবার সন্ধান পান! শেষ পর্যন্ত তো সে সন্ধান মিলল। কিন্তু বাবা যে নেই! চাচা নিজামউদ্দিনকে প্রশ্ন, ‘কেমন ছিলেন আমার বাবা? কীভাবে মারা গেলেন? তিনি কি আমাদের কথা বলতেন?’

নিজামউদ্দিনের গল্প শেষ হয় না। বলেন, ফকরুল সব সময় নীতা ও ওমরের গল্প বলত। তখন ও শারীরিকভাবে অসুস্থ। পেটে ব্যথা। আলসার জাতীয় কোনো অসুখ বাধিয়েছে। সব সময় বলত, ‘ভাবি (নিজামউদ্দিনের স্ত্রী), আমার ছেলেমেয়ের খোঁজ কইরেন আপনারা।’

নিজামউদ্দিনের স্ত্রী মীনার কাছে ফকরুল সব সময় গল্প করতেন তাঁর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে। মীনাও গতকাল কথা বলেছেন সেই নেথার সঙ্গে, টেলিফোনে। দীর্ঘ আলাপ, হাসি-কান্নার কাব্য।

ভালো কথা, নেথার মায়ের নাম লিন। চাচা নিজামউদ্দিন সে নাম বলে একটা পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হলেন। কারণ, এ দেশে এসে নেথা কাউকেই মায়ের নামটি বলেননি।

নেথা তাঁর পরিবারের আরও অনেক সদস্যের খোঁজ পেয়েছেন। তাঁর বাবা ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তবে তাঁর বাবার পাঁচজন সৎভাইবোন আছেন। তাঁরা হলেন শামসুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম ও তাজুল ইসলাম এবং দুই বোন রেনু বেগম ও সেবু বেগম। ফকরুলের আপন চাচাতো বোন হরফুন নেছা। তিনি পরিবারের সবচেয়ে বড় মেয়ে। নেথার খবর পেয়ে তিনিও যোগাযোগ করেছেন নিজামউদ্দিনের সঙ্গে। জানতে চেয়েছেন নেথা কবে আসবে সিলেটে?

২০১১ সা‌লের ৮ মার্চ প্রকা‌শিত হ‌লো গ‌ল্পের এই পর্ব এখানে।

নেথার বাবার বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার দেউগ্রামে। বাবার কবরও সেখানে। বাবার কবর দেখতে গি‌য়ে‌ছেন নেথা। বাবার জন্য জমানো আছে তাঁর অনেক কথা। পেয়ে‌ছি‌লেন প‌রিবা‌রের স্বজন‌দের দেখাও। বাবার খোঁ‌জে বাংলা‌দে‌শে আসা মে‌য়েটা বাবা‌কে না পে‌লেও ফিরে‌ছিল বাংলা‌দে‌শের প‌বিত্র মা‌টির স্পর্শ নি‌য়ে, যে মা‌টি তার বাবার। যে মা‌টি ১৬ কোটি বাংলাদে‌শীর। যে মা‌টি আমা‌দের। বাংলা‌দেশের।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button