মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

অনুপ্রেরণার গল্প নয়, ভেঙে পড়ার গল্প শুনুন!

মেডিকেল কলেজে যে ক’জন অলস ছাত্র ছিল, আমি তাদের একজন। সারারাত আইটেমের হুলস্থুল প্রিপারেশন নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে না উঠে ক্লাশ মিস করতে আমার ভাল লাগত। শুরুতে এমন ছিলাম তা নয়। আমিও সকাল সাড়ে ছয়টায় ঘুম থেকে জেগে জোব্বা সাইজের এপ্রোন পরতাম। এরপর হুপহাপ ধুপধাপ করে নাক টানতে টানতে ক্লাশে যেতাম। ক্লাশের ভেতর বই খুলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তাবৎ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতাম। বন্ধুদের সাথে আড্ডার একমাত্র টপিক থাকত জটিল জটিল সব প্রশ্ন। আমি ছিলাম প্রথম সারির বিশজন পরিশ্রমী ছাত্রদের একজন। প্রথম দশজন ভালো করাদের মধ্যে। আমার দিন শুরু হত ফজরের নামাজ পড়ে, মশারীর তলায় লেপে মুড়ে বই খুলে। ক্লাশ থেকে সোজা হোস্টেলে ফিরে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে নিয়মিত গোসল করতাম। এরপর বই খুলে আসর পর্যন্ত পড়তাম। আসরের নামাজ পড়ে ঘুমুতাম। মাগরিবের নামাজ পড়ে রাত সাড়ে বারোটা অবধি টেবিলে বসে বিছানায় মনুষ্য কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়াশোনা করে ক্লান্ত হয়ে একসময় ঘুমিয়ে যেতাম। টানা ছয় মাস পড়াশোনার পর আমার জনৈক ঢাকা মেডিকেল কলেজ পড়ুয়া বন্ধু আমাকে বলল, ‘এভাবে জীবন চলে না। বৈচিত্র্যহীন জীবন। তুই দুনিয়ার সকল রূপ ও রস থেকে বঞ্চিত। অপার রহস্যময় দুনিয়ায় অটিস্টিক হয়ে বেড়ে উঠছিস।’

পর দিন আমি জাগলাম দুপুর দুইটায়। প্রথমবার ক্লাশ মিস করলাম। তার পরদিন আবার ক্লাশ মিস করলাম। ক্লাশের উপস্থিতি কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসল। শিক্ষকদের কেউ কেউ আমাকে দেখলে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কে বা কাহারা?’ আমি নামতে নামতে শেষ দশজন অলসের কাতারে চলে আসলাম। শিক্ষকদের ধরাধরি করে পরীক্ষায় বসতাম। তবুও আমি আনন্দিত। ক্লাশ মিস করতে আনন্দ, ঘুমুতে আনন্দ। সারারাত হুলস্থুল পড়ে সকালের আইটেম মিস করতে ঐশ্বরিক আনন্দ। কলেজের মেধাবীদের সাথে যোগাযোগ কমতে শুরু করল। তাদের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করতে পারি না। তাদের কথাবার্তায় স্পষ্ট অবজ্ঞা। আমি অভিমানী মানুষ। অভিমান করলে সেই পথে ফেরানো কঠিন। কেউ কেউ কথা বলতে চেষ্টা করত। এড়িয়ে চলতাম। আমি একা হয়ে গেলাম। ব্লগ থেকে বের হয়ে ফেসবুকে লিখতে শুরু করলাম। দুনিয়ার সবাই আমার বন্ধু হয়ে গেল অথচ ক্লাশের মেধাবীরা কেউ আমার বন্ধু নয়।

একদিন অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, কেউ কেউ বেশ আগ্রহ নিয়ে আমার কাছে আসে। আনন্দচিত্তে আলাপ করে। দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আনন্দ নিয়ে চলে যায়। এরা সবাই আমার মতো। ক্লাশ কম করে। রেজাল্ট শীটে কোনোমতে তাদের নাম আসে। তাদের জীবন কেটে যায় সরলদোলকের মত এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে। এই পাশ- এই ফেইল। এই পরীক্ষা দিতে পারবে- এই পারবে না টাইপ দোদুল্যমান অবস্থা। একদিন এরা সবাই আমার বন্ধু হয়ে গেল। আমার মন খারাপ হয়, এদের সাথে থাকলে মন ভালো হয়ে যায়। তাদের মন খারাপ হয়, আমার কাছে আসলে তাদের মন ভালো হয়ে যায়। তারা হয়তো অনিময়িত। আমার অনিয়মিত পড়াশোনার কোন যৌক্তিক কারণ না থাকতে পারে কিন্তু এদের হয়তো কোন না কোন কারণ আছে। কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। কেউবা সত্যিকার অর্থেই ডিপ্রেশনে ভুগছে। শত অপ্রাপ্তির মাঝেও এরা আমার মত নিম্নসারির ছাত্রের কাছে আসে। তাদের সাথে চলাফেরায় বৈচিত্র্য আছে, আনন্দ আছে। আমার মত মানুষের জন্য তাদের বুকভর্তি ভালোবাসা আছে।

শেষ মুহুর্তে এসে হলেও আমি নিজেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। আমার দীর্ঘ ছয় বছরের মেডিকেল কলেজ জীবনের একদিন বিকেলে আমি ধরে ফেললাম, সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিংগুলো আসলে নেগেটিভ আপগ্রেডেশন মেনে চলে। আপনি কখনোই বিল গেটস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বিল গেটস হতে পারবেন না।

আপনি অনিয়মিত হলে ক্লাশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটার কাছে যাবেন। তার উপদেশ এত উচ্চস্তরের যে আপনি কখনোই মানতে পারবেন না। আপনি দিক বদল করে ক্লাশের সবচেয়ে অনিয়মিত ছাত্রের কাছে যাবেন। সে আপনাকে শিখিয়ে দিবে কীভাবে ভয়ানক চাপ মাথায় রেখেও ভারহীন থাকা যায়। ক্ষুধায় যন্ত্রণা পেলে চলে যান দরিদ্র প্রতিবেশির কাছে। আপনার ক্ষুধা নিয়ে দুঃখবিলাস ব্যাপারটা হারিয়ে যাবে। ইন্টারনেট ভর্তি কোটি কোটি অনুপ্রেরণার গল্প। কে বদলে গেছে এসব পড়ে? আপনি বরং ভেঙে পড়ার গল্প শুনুন, অভাবের গল্প শুনুন, কষ্টের গল্প শুনুন। আপনি দুইভাবে বদলে যাবেন। আপনার মাথায় দুটো শিক্ষা খেলা করবে।

১। এত কষ্টে-অভাবে-ক্ষুধায়-অপ্রাপ্তিতেও কীভাবে নির্লিপ্ত থাকা যায়!
২। এত কষ্ট-অভাব-ক্ষুধা-অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা কীভাবে দূর করে ফিরে আসা যায়!

নেগেটিভ আপগ্রেডেশন কীভাবে কাজ করে?

এক তরুনী আমাকে বলল, “আমার বাবা মা আমাকে ভালোবাসে না।” আমি নানান ধরণের উপদেশ দিয়ে তাকে বোঝাতে পারি, তার বাবা-মা আসলেই তার ভালো চায়। সে কিছুক্ষণ বুঝবে। একটা সময় আবার ভুলে যাবে। আমি তাকে নেগেটিভ আপগ্রেডেশন শুরু করলাম। বললাম,

-তোমার বাবা-মা আসলেই বাজে লোক।
সে চমকে যায়। আমি বলেই যাই,
-তোমার বাবা স্বার্থপর। তোমার মা আত্মকেন্দ্রিক।
সে রাগ দেখিয়ে বলল,
ফাইজলামি করেন? 
-না। ফাইজলামি কেন করব? তারা তোমাকে বিপদে ফেলছে।
সে আরো রেগে যায়।
-না। তারা আমাকে কেন বিপদে ফেলবে?
-বিপদে ফেলবে। তোমাকে হেনস্থা করবে।
-না। তারা আমাকে হেনস্থা করবে না।
-করবে…করবে…করবে।
-করবে না। আপনি বাজে লোক। ফাউল পরামর্শ দেন।
-আমি বাজে লোক নই। তোমার বাবা-মা বাজে লোক।
-আর একটা কথা নয়।
-অবশ্যই কথা আছে।
-নেই নেই নেই।
আমি উচ্চস্বরে বলি,
-আছে…আছে…আছে…।
তরুণী আরো উচ্চস্বরে বলে,
-আপনি বাজে লোক। বাবা-মা সম্পর্কে বাজে ধারণা দিচ্ছেন। আপনাকে বলা ভুল হয়েছে।

তরুণী রাগ করে, আমার প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে ফিরে যায়। আমার ধারণা আমার প্রতি ঘৃণার বিপরীতে সে এখন তার বাবা-মা সম্পর্কে ভালো ভালো জিনিসগুলো খুঁজে পেয়েছে। কিংবা খুঁজে বের করছে। একদিন সে মুগ্ধ হয়ে দেখবে- তার বাবা মা তার ভালো চায়। সত্যিকার অর্থেই ভালো চায়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button