অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

দ্য হিরোইন অফ দ্য হাইজ্যাক!

জীবন লম্বা নয়, বড় হওয়া চাই। কিভাবে? একজন মানুষ অনেক দিন বাঁচতে পারেন, তারপর তাকে বরণ করে নিতে হয় সকল মানুষের জন্য ধ্রুব পরিণতি- মৃত্যু। এই একমাত্র নিশ্চিত সত্য, যা সকলের জন্য অবশ্যম্ভাবি, কিন্তু এই একমাত্র নিশ্চিত সত্য যা সবথেকে বেশি অনিশ্চিত। কেউ জানেনা, কখন কোথায় কিভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হবে তাকে। একজন মানুষ অনেকদিন বাঁচতে পারে কিন্তু তার জীবন অর্থবহ নাও হতে পারে। আবার অল্পদিন বেঁচেই জীবনকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে অনেকে যে মৃত্যুও তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে। শারীরীকভাবে মৃত্যু হলেও, মৃত্যু পরাজিত হয় তার কাছে। জীবন বড় হয়ে প্রতিভাত হয়। কিন্তু একজন মানুষের জীবন কত বড় হতে পারে?

৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬। করাচি এয়ারপোর্ট, পাকিস্তান। মুম্বাই থেকে ইউ.এস.এ গামী বিমান Pan Am Flight 73 যাত্রাবিরতি করেছে করাচিতে। কিন্তু করাচি ত্যাগ করার পূর্বেই চারজন জঙ্গী আক্রমণ করে বসলো বিমানটিতে, হাইজ্যাক করে নিল বিমানটি। ফিলিস্তিনি এই জঙ্গীরা ছিল ‘আবু নিদাল’ জঙ্গী গ্রুপের সদস্য। যাত্রীদের জিম্মি করে বিমানটি সাইপ্রাসে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল তাদের উদ্দেশ্য। সেখানে যাত্রীদের বিনিময়ে নিজেদের গ্রুপের সদস্যদের মুক্ত করা ছিল তাদের অভিপ্রায়। সেই সাথে বিমানে থাকা আমেরিকান যাত্রীরাও ছিল তাদের টার্গেট, উদ্দেশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলানো। আমাদের কাহিনীর শুরু এখান থেকেই।

বিমান আক্রমণ হওয়ার সাথে সাথে বিমানটির পারসার (প্রধাণ ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট/ এয়ারহোস্টেস) সেটা জানিয়ে দেন ককপিটে থাকা পাইলটদের। জঙ্গীরা ককপিটে পৌছানোর পূর্বেই সেখানে থাকা পাইলট, কো-পাইলট এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার বিকল্প পথ ব্যবহার করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, ফলে ভেস্তে যায় জঙ্গীদের মূল পরিকল্পনা। এয়ারপোর্টে বিমানেই আটকা পড়ে যায় জঙ্গীরা, সাথে ক্রু এবং যাত্রী সহ ৩৮০ জন সাধারণ মানুষ!

পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর জঙ্গীরা পাইলটদের বিমানে ফিরিয়ে আনতে নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষকে, হুমকি দেয় পাইলটরা ফিরে না আসলে একে একে সব যাত্রীদের হত্যা করা হবে। আমেরিকান যাত্রীদেরকে প্রথমে টার্গেট করে তারা। ক্রুদের নির্দেশ দেয় সবার পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে। এবারও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সেই পারসার, বিমানে ক্যাপ্টেন পালিয়ে যাওয়াতে যিনি তখন বিমানের ইন-চার্জ, প্রধাণ কর্মকর্তা। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে তিনি এবং তার ক্রুরা আমেরিকান যাত্রীদের পাসপোর্ট লুকিয়ে ফেলেন যেন জঙ্গীরা আমেরিকান যাত্রীদের আলাদা করতে না পারে। বিমানে মোট ৪১ জন আমেরিকান যাত্রী ছিলেন, ঘটনার শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে দুজন নিহত হন।

১৭ ঘন্টা অবরূদ্ধ করে রাখার পর জঙ্গীরা কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে। কারণ তাদের মূল পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, ছিল না কোন বিকল্প পরিকল্পনা। সেই সাথে বাইরে থেকে যেকোন সময় আক্রমণ হতে পারে। তাই যখন ফুয়েলে সমস্যা হবার কারণে বিমানের বাতি নিভে যায় হঠাৎ করে, তখন আক্রমণ হয়েছে মনে করে তারা দিশেহারা হয়ে এলোপাথারি গুলি ছুড়তে থাকে, গ্রেনেড চার্জ করতে থাকে। বিমানটি পরিণত হয় সাক্ষাৎ নরকে। ঠিক তখনই সেই পারসার দ্রুত বিমানের এমারজেন্সি এক্সিট খুলে দেয়।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে সবাই যেটা করত, বা অধিকাংশের জন্য যেটা করা স্বাভাবিক সেটা হল সাথে সাথেই এক্সিট দিয়ে বের হয়ে যাওয়া। কিন্তু আমাদের আলোচিত এই পারসার সেটা করলেন না, তার বদলে তিনি সব যাত্রী এবং ক্রুদের একে একে ঐ পথ দিয়ে বাইরে বের করে দিলেন এবং নিশ্চিত করলেন সবাই যেন বের হয়ে যেতে পারে, যেখানে তিনিই হতে পারতেন ঐ বিমান থেকে বের হয়ে আসা প্রথম ব্যক্তি!

সবাইকে বের করে দিয়ে যখন তার নিজের সময় আসলো ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে। বিমানে তখন আটকে পড়েছিল তিনটি শিশু। তাদের উদ্ধার করে বের হওয়ার সময় জঙ্গীদের মুখোমুখি হন তিনি, জঙ্গীরা পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে তাকে। শিশু তিনটিকে আড়াল করে নিজে গুলিবিদ্ধ হন এই মানুষটি। পুলিশ যতক্ষণে বিমানটি জঙ্গীদের থেকে উদ্ধার করছে ততক্ষণে তিনি পারি জমিয়েছেন অনেক দূর, জীবনটাকে অনেক বড় করে দিয়ে।

যে মানুষটির কথা বললাম তাঁর নাম নিরজা ভানত, মৃত্যুকালীন সময়ে তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর ৩৬৩ দিন, ঠিক ২৩ তম জন্মদিনের দু দিন আগে তিনি মারা যান। আপনারা অনেকেই এই কাহিনীটি জানেন, যারা ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সোনাম কাপুর অভিনীত ‘Neerja’ চলচ্চিত্রটি দেখেছেন। এই বাস্তব ঘটনা অবলম্বনেই নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। মৃত্যুর পর অসীম সাহসিকতা এবং বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি অসংখ্য মরণোত্তর সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন ভারতের সাহসিকতার জন্য প্রদেয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘অশোক চক্র’, এখন পর্যন্ত তিনিই সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি যে এই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

নিরজা ভানত, Neerja, সোনম কাপুর

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে সম্মানিত করেছে Flight Safety Foundation Heroism Award, Justice for Crimes Award,Special Courage award প্রভৃতি দিয়ে। পাকিস্তান সরকার তাকে প্রদান করেছে Tamgha-e-Insaaniyat সম্মাননা। মরণোত্তর এত সব সম্মাননা আসলে তাঁকে ‘বড়’ করেনি, তাঁকে বড় করেছে তাঁর অসামান্য সাহস, বীরত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ৩৬০টি প্রাণ বাচিয়ে দেয়ার অনবদ্য ভূমিকা। নিরজা ভানতসহ ২০ জন প্রাণ হারায় সেই ঘটনায়। সারা বিশ্বে এই তরুণী ‘দ্য হিরোইন অফ দ্য হাইজ্যাক’ নামে পরিচিত।

কী হয়েছিল সেই চার জঙ্গীর? তাদের একজনকে ব্যাংকক থেকে গ্রেফতার করে এফ.বি.আই, বিভিন্ন চার্জে তার ১৬০ বছরের জেল হয়। বাকি তিনজন জেলে থাকলেও ২০০৮ সালে রাওয়াল্পিন্ডি জেলখানা থেকে পালিয়ে যায়। ২০১০ সালে এক ড্রোন হামলায় এদের একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা। এদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করেছে এফ.বি.আই। এদের বর্তমান অবস্থান অজানা থাকলেও এখনও এরা এফ.বি.আই এর মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে আছে।

নিরজা ভানত ছিলেন একজন মডেল। মডেলিং এর সাথে সাথে Pan Am- এ এয়ারহোস্ট হিসেবে যোগদেন তিনি। মায়ামি থেকে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে আসেন পারসার হিসেবে। নিরজার মৃত্যুর পর হেড ট্রেনার নিরজার বাবাকে এক চিঠিতে লেখেন-

“The courageous manner in which she lived was very evident in the courageous manner in which she died. Shielding 3 small children from danger was a bold, daring and brave act that so dignified Neerja’s personality. She was a wonderful human being. All those who were concerned with her Miami training, including the ‘local mother’, have expressed similar assessment of Neerja.”

নিরজার বাবা ছিলেন ‘দি হিন্দুস্থান টাইমস’ এর একজন সাংবাদিক। নিরজার মৃত্যুর পর এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় তিনি লিখেছিলেন- “এক বছর আগে ও আমাকে বলেছিল ‘বাবা আমি তোমাকে একদিন গর্বিত করব’। আমার মেয়ে তার কথা রেখেছে।”

বর্তমান এই অস্থির সময়ে যখন আমাদের দেশসহ সমগ্র পৃথিবীই মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের ভয়াল থাবার নিচে ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে- তখন নিরজা ভানতের আত্মত্যাগ, সাহসিকতা আমাদেরকে সাহস যোগায়। ঠিক এরকম সাহস, এরকম বীরত্ব এবং দায়িত্বশীলতাই এই মুহুর্তে আমাদের বেশি দরকার। নিরজা ভানত তাই মৌলবাদের বিরূদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের প্রতিনিধি, উদাহরণ, অণুপ্রেরনা। তিনি পারতেন দরজা খুলে সবার আগে বেড়িয়ে যেতে, এতে তার জীবন হয়তো আরও কিছুদিন লম্বা হত, কিন্তু বড় হতো না। তিনি বড় হয়েছেন, অন্যের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়ে মৃত্যুকে জয় করেছেন।

প্রথমে পাইলটদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তিনি জঙ্গীদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছেন, এরপর বাঁচিয়েছেন আমেরিকান যাত্রীদের, এরপর বিপদের চরম মুহুর্তে এমারজেন্সি এক্সিট খুলে নিজে না গিয়ে বাকিদের বের করে দিয়েছেন, সবশেষে তিনটি শিশুকে বাচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিনি। তাঁর সামগ্রিক কাজের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই আগাগোড়া তিনি মাথা ঠান্ডা রেখে অসীম সাহসকে অবলম্বন করে ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জন্য কাজ গুলো করে গেছেন। চারজন সশস্ত্র জঙ্গী পরাজিত হয়েছে ২৩ বছরের একটি তরুণীর কাছে। ঠিক যেমন আমাদের দেশের তরুন প্রগতিশীল লেখকদের কাছে পরাজিত হয় মৌলবাদী শক্তি।

একটি তথ্য জানিয়ে রাখি- এই কাহিনী নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র Neerja পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে! যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সামনের দিকে এগোতে হয়। মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের যে অন্ধকার থাবা আমাদেরকে আষ্ট্রেপৃষ্ট্রে বেঁধে রেখেছে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের নিরজা ভানত্‌ হওয়ার বিকল্প নেই। যার যার অবস্থান থেকে নিজের সর্বোচ্চ সাহস নিয়ে প্রতিহত করতে হবে এই অন্ধকারকে। জীবন লম্বা না হলেও, বড় হয়তো হবে।

শেষ করব নিরজা ভানত্‌কে নিয়ে লেখা হরিন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতার কিছু লাইন দিয়ে-

You have become historic
And made heroism heroic!
Your valour even hallows
Great martyrs on the gallows’
Even Death itself, 0 Sweet!
Must befalling at your feet!
To you the salutation, Neerja!
Of the whole nation.

ঠিক তাই … Even Death itself, 0 Sweet!…Must befalling at your feet! 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button