রকমারিরিডিং রুম

রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক নিয়ে যত প্রোপ্যাগান্ডা ও তার জবাব!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম- বাংলা সাহিত্যের আকাশে দুই নক্ষত্রের নাম। একজন বিশ্বকবি, আরেকজন বিদ্রোহী কবি। দুইজনই তাদের প্রতিভা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। তাদের মধ্যে ছিল গভীর সখ্য; গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে আমাদের এই অঞ্চলে অনেক মানুষের মনে এই দুইজনকে অনেকটা নায়ক-শত্রু ভূমিকায় চিত্রিত করা হয়েছে। এবং শুরুটা এখনকার না বরং তাঁরা জীবিত থাকা অবস্থাতেই- মৌলবাদী হিন্দু এবং মৌলবাদী মুসলিমের দল কেউই তাদের দুইজনের মধ্যে যে অসাধারণ সখ্যতা ও সুসম্পর্ক ছিল, সেটা মেনে নিতে পারে। নানাভাবে চেষ্টা করে গেছে, তাদের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততা আনার জন্য। হয়েছিল নানা ষড়যন্ত্র ও আক্রমণ। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়।

পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকারও ব্যাপক প্রচার করেছিল, তাদের ঠ্যাঙ্গারে বাহিনী ছাত্র সংগঠন এনএসএফ কর্মীদের মাধ্যমে, স্বাধীন বাংলাদেশেও নানা রকম প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে- আমরাও যখন ছোট ছিলাম, তখন জানতাম রবীন্দ্রনাথ নজরুল ইসলামকে হিংসে করতেন, তার ষড়যন্ত্রেই নাকি কাজী নজরুল সাহিত্যে নোবেল পাননি, তার নোবেল নিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! আর নজরুল ইসলামের অসুস্থতার পিছনেও নাকি রবীন্দ্রনাথের হাত ছিলো। আজকে আমরা তথ্য প্রমাণ দিয়ে যাচাই করে নিবো- আসলেই রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিলো!

প্রথমে সাহিত্যে নোবেলের ব্যাপারটা ক্লিয়ার করা যাক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান ১৯১৩ সালে। আর কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর গীতাঞ্জলি কবিতা প্রকাশ করছেন তখন নজরুল ১২ বছরের বালক আর যখন নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন তখন নজরুলের বয়স মোটে ১৪! কাজী নজরুলের প্রথম বই প্রকাশ পায় তারও ৯ বছর পর ১৯২২ সালে! এখন কি যুক্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির সাথে কাজী নজরুলের কোন রকম সম্পর্ক টানা যায়- বোধগম্য নয়। এরকম বিতর্কেরও যে অস্তিত্ব যে থাকতে পারে সেটা চিন্তারও অতীত!

এবার আসা যাক নজরুলের অসুস্থতা নিয়ে। শুনতে হাস্যকর শুনাবে- ছোটবেলায় আমি শুনেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি এক হিন্দু মহিলার সাথে কাজী নজরুলের বিয়ে দিয়েছিলেন, পরে সেই মহিলা নজরুলকে কিছু একটা খাইয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলেছিলো! কাজী নজরুল ইসলাম মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত হন ১৯৪২ সালের ১০ই অক্টোবর। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরলোকই গমন করেন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট! বেচারা রবীন্দ্রনাথ প্রায় এক বছর আগে পরপারে গিয়েও নজরুলের অসুস্থতার ষড়যন্ত্রের দায় থেকে মুক্তি পেলেন না! কী অদ্ভুত! আর হ্যাঁ, কাজী নজরুল প্রমিলা দেবী নামক এক হিন্দু মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন ঠিকই- কিন্তু সেটা আলী আকবর নামক এক বন্ধুর সাথে বাংলাদেশের কুমিল্লায় বেড়াতে এসে। তাঁর হিন্দু রমনী বিয়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের দূরতম কোন সম্পর্ক ছিল না!

যাই হোক, নজরুল বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে প্রচলিত দুইটা বড় অভিযোগ খন্ডানো হলো, এবার আমরা দেখি তাদের মধ্যে সম্পর্ক কীরকম ছিল। 

সহজ কথায় বললে- মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজী নজরুল যেমন পরম ভক্তি করে গেছেন রবীন্দ্রনাথকে, রবীন্দ্রনাথও সেভাবেই উজাড় করে স্নেহ করে গেছেন ৩৮ বছরের ছোট নজরুলকে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সরাসরি দেখা হয়েছিল ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে। তখন নজরুলের বয়স ২২ বছর। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর নজরুল অনেকবারই শান্তিনিকেতনে যেতেন এবং খুবই কোলাহল মুখর ছিলেন। হৈচৈ করে মাতিয়ে রাখতেন বলে তাকে “হৈহৈ কাজী” নামে ডাকতেন রবীন্দ্রনাথ।

১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হলে হাতে পত্রিকা নিয়ে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চকণ্ঠে ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ গাইতে গাইতে নজরুল ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকতে শুরু করলেন, গুরুদেব তুমি কোথায়, আমি এসেছি। রবীন্দ্রনাথ দোতালা থেকে বললেন কি হয়েছে, এত হৈচৈ কিসের। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বলেন, গুরুদেব আমি আপনাকে খুন করবো। নিচে এসো। তারপর রবীন্দ্রনাথের সামনে উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে থাকেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শুনে কবিতার প্রশংসা করেন এবং নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘সত্যিই তুই আমাকে খুন করেছিস’। এরকমই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো তাদের মধ্যে!

কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইষ্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তার ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ, ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোক ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে।’ কথাশিল্পী মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন নজরুলের এই ভক্তি-শ্রদ্ধার কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বললেন নজরুলের উপস্থিতিতেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেসে বলেছিলেন, যাক আমার আর ভয় নেই তাহলে। নজরুল সঙ্কোচে দূরে গিয়ে বসলেও রবীন্দ্রনাথ সস্নেহে তাকে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। নজরুল নিজেই লিখেছেন, ‘তখন আমার মনে হতো আমার পূজা সার্থক হলো, আমি বর পেলাম।’

নজরুল ইসলাম যৌবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। এ ছাড়া গীতাঞ্জলির সবগুলো কবিতা ও গান তাঁর মুখস্থ ছিল। কমরেড মোজাফফর আহমেদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “নজরুল ইসলাম বহু রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। তিনি কি করে যে রবীন্দ্র সঙ্গীতগুলো মুখস্ত করেছিলেন, তা ভেবে অবাক হই।” এ কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবহিত হওয়ার পর খুবই খুশি হয়ে বলেছিলেন, “আমারই তো মুখস্থ নেই।”

১৯২২-এর ২৫ জুন কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঐ স্মরণসভায় সভাপতি হয়ে গিয়েছিলেন। আর সদ্য দুটি বই বের হওয়া নজরুল বসেছিলেন একদম পিছনে। রবীন্দ্রনাথ তা লক্ষ্য করে নজরুলকে ডেকে পাশে বসিয়েছিলেন। নজরুল সেখানে আবৃত্তি করেছিলেন ‘সত্যকবি’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নজরুলকে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ করায় তখনও কবি-সাহিত্যিকরা ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন।

নজরুলের সম্পাদনায় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯২২-এর ১১ আগস্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার জন্য আশীর্বাদবানী লিখে দেন- “আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু…” ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই আশীর্বাণীটি প্রকাশিত হতো। তারপর নজরুল ইসলাম সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘লাঙল’-এর প্রচ্ছদেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশীর্বচন লেখেন : ‘ধর, হাল বলরাম, আন তব মরু-ভাঙা হল,/বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। সেটি ছিল রবীন্দ্র পরিবারের বাইরে প্রথম কাউকে একটি বই উৎসর্গ করার ঘটনা। নজরুল তখন ধূমকেতুর ১২শ সংখ্যায় (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক একটি প্রতীকধর্মী কবিতা প্রকাশের অপরাধে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে কারারুদ্ধ। কবি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে জেলখানায় বইখানি পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি উৎসর্গপত্রে নজরুলকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করে লেখেন, “জাতির জীবনের বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি কবি নজরুলকে উৎসর্গ করছি।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছাকাছি যেসব কবি-সাহিত্যিক থাকতেন তাদের অনেকেই তখন অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন তাঁর প্রতি। এর জবাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়সহ উপস্থিতজনদের উদ্দেশে বলেন, “আমার বিশ্বাস তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করছে। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করেনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছে মাত্র। কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও এই সুর বাজত!”

পবিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে বইটি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন, “নজরুলকে বলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমগ্র অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো, কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জোগাবার কবিও তো চাই।”

নজরুল বইটি পেয়েই বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে নজরুল নিজেই পড়ে লিখেছেন- “এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। তাঁর এই আশীর্বাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্বজ্বালা, যন্ত্রণা ক্লেশ ভুলে যাই।”

১৯২৮ সালে নজরুল নিজেও তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘সঞ্চিতা’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। বিভিন্ন রচনায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নানাবিধ উল্লেখ থাকলেও সম্পূর্ণ তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো হলো ‘নতুন চাঁদ’ গ্রন্থের ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’ ও ‘কিশোর রবি’ এবং ‘শেষ সওগাত’ গ্রন্থের ‘রবিজন্মতিথি’।

১৯২৩-এর ১৪ এপ্রিল হুগলি জেলে নজরুল অনশন করেন। এই অনশন ভঙ্গ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রেসিডেন্সি জেলের ঠিকানায় নজরুল ইসলামের কাছে টেলিগ্রাম পাঠান। তাতে লেখেন, Give up hunger strike, our literature claims you. জেল কর্তৃপক্ষ টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠায়। পরে অবশ্য নজরুল তাঁর বন্ধু কুমিল্লার বীরেন্দ্রকুমারের মা বিরজা সুন্দরী দেবীর হাতে লেবুর সরবত পান করে অনশন ভঙ্গ করেন।

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সৈনিক নজরুল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের শারীরিক শিক্ষা দেবেন। কিন্তু অস্থির প্রকৃতির বিদ্রোহী নজরুল কোথায়ও এভাবে নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকতে চাননি। এ প্রসঙ্গে নজরুল লিখেছেন, অনেক দিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে (শান্তিনিকেতন) গিয়ে থাকবার কথা বলেছেন। হতভাগা আমি তাঁর পায়ের তলায় বসে মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না। বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।”

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের দার্জিলিংয়ে দেখা হয়। এ সময় নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি তো ইতালি গেছেন, সেখানে কবি দ্যনুনজিও’র সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না?” রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন “দেখা হবে কি করে তিনি যে তোমার চেয়েও পাগল!”

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে যে কী স্নেহ করতেন তার আরেকটি উদাহরণ- রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবিতে নজরুল ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এতে বাধ সাধলে রবীন্দ্রনাথ তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নজরুলকে সঙ্গীত পরিচালনার স্বীকৃতি প্রদান করেন।

নজরুল অনেকবার ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কবিতা, গান ইত্যাদি শুনিয়েছেন এবং তাঁর কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ চাইতেন না যে, নজরুল তাঁর কবি প্রতিভাকে যথার্থ সৃষ্টি কাজে না লাগিয়ে অন্য বিষয়ে নষ্ট করেন। এজন্য নজরুলকে তিনি একদিন (সঙ্গে ছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর) তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচতে নিষেধ করেছিলেন। এই কথায় নজরুল ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। আমার কৈফিয়ত কবিতায় তিনি লেখেন, ‘গুরু কন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচা।’ নজরুল পরে বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর তত্ত্বের কথা। নজরুলের অমিয় প্রতিভা যেন অপচয় না করেন সেজনই তলোয়ারের মত মূল্যবান হাতিয়ার দিয়ে দাঁড়ি কামানোর মত তুচ্ছ কাজে অপচয় করতে বারন করেছিলেন কবিগুরু।

রবীন্দ্রনাথের বয়স আশি বছর পূর্তি হয় ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। তখন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে লিখেন, ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’। সে বছরই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে নজরুল যে গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়েছিলেন তার পরিচয় রবীন্দ্রনাথের পরলোকগমনে তাৎক্ষণিকভাবে রচিত নজরুলের বিভিন্ন কবিতা ও গানে পাওয়া যায়। এই দিন (৭ই আগস্ট, ১৯৪১) কাজী নজরুল ইসলাম আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকে ধারাবর্ণনা প্রচার করেন। তিনি আবৃত্তি করেন ‘রবিহারা’ কবিতা এবং রচনা করেন ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’। এ ছাড়া ‘সালাম অস্তরবি’ এবং ‘মৃত্যুহীন রবীন্দ্র’ নামে দুটি কবিতা রচনা করেন। আর তার এক বছর পর নিজেও অসুস্থ হয়ে চিরতরে নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়।

এত সুন্দর শ্রদ্ধা ও স্নেহমন্ডিত দুই মহামানবের সম্পর্কতে যুগে যুগে কত কালিমাই না লেপনের চেষ্টা হয়েছে। অথচ স্বয়ং তাদের লেখনীতে, জীবনীতে, কর্ম-কান্ডে একে অপরের জন্য গভীর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না! রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক এবং সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে। তাঁরা একে অপরের মূল্যায়ন করেছিলেন যথাযথ ভাবে, তাই তাদের মধ্যে ছিলো একটি ঈর্ষণীয় মধুর গুরু-শিষ্য সম্পর্ক যদিও সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সে যুগের অন্যন্য কবিদের থেকে খুবই ব্যতিক্রম হিসেবে নজরুল ছিলেন রবীন্দ্র প্রভাব থেকে একেবারেই মুক্ত!

তথ্যসূত্র-

১. বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা- ড. সৌমিত্র শেখর
২. রবীন্দ্র স্মরণ রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক- চতুরঙ্গ, দৈনিক জনকন্ঠ, মে ০৭, ২০১৬
৩ গুরু-শিষ্য সম্পর্ক : রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল- হাবিবুর রহমান স্বপন, রাইজিংবিডি, ২৩ মে, ২০১৪
বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ রানা ঘোষ নির্জন স্যার।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button